বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [
সুরা—২ আল—বাকারা- ২২৯ থেকে ২৩৩ আয়াত।]
২২৯) এ তালাক দুবার, অতঃপর
স্ত্রীকে হয় বিধিসম্মতভাবে রাখবে, অথবা সদয়ভাবে বিদায় দেবে। আর স্ত্রীগণকে দেয়া
কোন কিছু ফেরৎ নেওয়া তোমাদের পক্ষে উচিত নয়। তবে যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে,
তারা আল্লাহ্র সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না এবং তোমরা যদি আশংকা কর যে, তারা
আল্লাহ্র সীমারেখা (বাস্তবিকই) রক্ষা করে চলতে পারবে না, তবে ( সে অবস্থায়)
স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে ( স্বামী থেকে) নিস্কৃতি পেতে চাইলে তাতে ( স্বামী এবং
স্ত্রীর) কারও পাপ নেই। এ সব আল্লাহ্র সীমারেখা। অতএব তোমরা তা লঙ্ঘন কর না, এবং
যারা আল্লাহ্র ( নির্দিষ্ট ) সীমারেখা লঙ্ঘন করে, তারাই অত্যাচারী।
মর্মার্থঃ—স্বামী হোক আর স্ত্রী হোক, তারা যদি নিজ নিজ প্রতিপালকের বিধান
মান্য করে চলে তবে সংসারে অশান্তি প্রবেশ করবে না, আর শান্তির সংসারে তালাকের
প্রশ্নই উঠে না। যারা আল্লাহ্র সীমারেখা লঙ্ঘন করে কামনা- বাসনার দোলায় দুলে
তারাই সীমারেখা লঙ্ঘন করে অশান্তির সৃষ্টি করে, এই অত্যাচারীদের জন্যই বিধান দেওয়া
হয়েছে যাতে তারা সুস্থ সামাজিক জীবনে ফিরে আসে। অধিকাংশ পরিবারের পুরুষরা মদ ও
জুয়াকে মহাপাপ জেনে তাতে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখনি স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি
সৃষ্টি হয়। তাই এই আয়াত মানব সমাজকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অবতীর্ণ হয়, যাতে তারা
নিজেদের স্বভাবের পরিবর্তন করে জ্ঞানী সন্তানের পিতা- মাতা হতে পারে।
২৩০) অতঃপর উক্ত স্ত্রীকে যদি সে তালাক দেয় তবে
যে পর্যন্ত না ঐ স্ত্রী অন্য স্বামীকে বিবাহ করছে তার জন্য সে বৈধ হবে না। অতঃপর ঐ
দ্বিতীয় স্বামী যদি তাকে তালাক দেয় তবে তাদের পুনর্মিলনে কারও কোন দোষ নেই, যদি
উভয়ে মনে করে যে, আল্লাহ্র নির্দেশ বজায় রেখে চলতে পারবে। এ সব আল্লাহ্র
নির্ধারিত সীমারেখা, জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ্ এসব স্পষ্টভাবে বর্ণনা
করেন।
মর্মার্থঃ—এই আয়াতে স্পষ্টভাবে আল্লাহ্ ব্যক্ত করেছেন জীবন সত্যের জ্ঞান
লাভ না করে কেউ যেন বিবাহ না করে, তাই এখানে বলা হয়েছে, “ জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য
আল্লাহ্ এসব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন”। জ্ঞানীরা নিজের দোষ দেখে এবং সেই দোষ
জ্ঞানের দ্বারা ছেদন করে মুক্ত হয়। তারা নিজের বাড়ী থেকে ক্ষতিকারক জীব ছাড়া কাউকে
তাড়ায় না, তাহলে স্ত্রী সেইরূপ ক্ষতিকারক জীব হয়ে উঠলেই তালাকের প্রশ্ন জাগে নচেৎ
তাদের মনে এই প্রশ্নই জাগতে পারে না।
২৩১) এবং যখনই তোমরা স্ত্রীদের (অস্থায়ী)
তালাক দাও এবং তারা ইদ্দত ( নির্দিষ্ট সময়) পূর্ণ করে, তখন তাদের বিধিমত বহাল কর
অথবা তাদের ভালভাবে বিদায় দাও, তাদেরকে নির্যাতন অথবা তাদের প্রতি বাড়াবাড়ির
উদ্দেশ্যে আটক করে রেখো না। যে ব্যক্তি এমন করে সে নিজের ক্ষতি করে। এবং তোমরা
আল্লাহ্র নিদর্শনকে ঠাট্টা তামাশার বস্তু করো না এবং তোমাদের প্রতি তাঁর অবদান ও
কিতাব এবং বিজ্ঞান যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন ও যা দিয়ে তিনি তোমাদেরকে উপদেশ
দেন তা স্মরণ কর। আর তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ্ সব বিষয়ে
জ্ঞানময়।
মর্মার্থঃ—মানুষের জীবন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে ও সত্য বস্তু দিয়ে
তৈরী। এই সত্যই আমরা বিভিন্ন কিতাব থেকে আল্লাহ্র অবদান স্বরূপ পেয়ে থাকি। এই সব
নিদর্শন ও উপদেশ কোনটায় ঠাট্টা- তামাশার বস্তু নয়। জ্ঞানীরা তা জেনে পূর্ণ বিশ্বাস
করে বিশ্বাসী বা জ্ঞানী হয়ে উঠে আর অজ্ঞানীরা তা ছুড়ে ফেলে দিয়ে সংসার- সমাজ-
রাষ্ট্র সর্বত্র অশান্তির সৃষ্টি করে।
২৩২) আর, তোমরা যখন স্ত্রীদের তালাক দাও (
স্ত্রী বর্জন কর) এবং তারা তাদের ইদ্দত (নির্দিষ্ট সময়) পূর্ণ করে, তখন তাদের আপন
খুশিমত অন্য স্বামী গ্রহণ করতে বাধা দিও না। এরদ্বারা তোমাদের মধ্যে যে কেউ
আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস করে তাদের উপদেশ দেয়া হয়। এটা তোমাদের জন্য শুদ্ধতম ও
পবিত্রতম। বস্তুত আল্লাহ্ জানেন, তোমরা জান না।
মর্মার্থঃ—শুদ্ধতম ও পবিত্রতম জীবন গড়ে তুলে পিতা- মাতার পদ অলংকৃত করার
জন্য জ্ঞানীদের বিবাহিত জীবন। কিন্তু মানুষ এই জীবন নিয়ে কি ছিনিবিনি খেলে তা
আল্লাহ্ জানেন, অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।
২৩৩) এবং মাতাগণ তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর
দুধ পান করাবে, যদি কেউ দুধ পান করার সময় পূর্ণ করতে চায়। পিতার কর্তব্য যথারীতি
তাদের ভরণ পোষণ করা। কাউকে সাধ্যাতীত কার্যভার দেয়া হয় না। কোন মাকে তার সন্তানের
জন্য এবং কোন পিতাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ করা হবে না। এবং
উত্তরাধিকারীগণেরও অনুরূপ বিধান। আর যদি পিতামাতা পরস্পর সম্মতি ও পরামর্শক্রমে
দুবছরের মধ্যেই (শিশুর) দুধ পান ছাড়াতে চায়, তবে তাদের কোন দোষ হবে না। আর যদি
তোমরা তোমাদের সন্তানদের কে ধাত্রীর দুধ পান করাতে চাও, তাতেও তোমাদের কোন দোষ হবে
না, যদি তোমরা তাদের নির্ধারিত প্রদেয় বিধিমত অর্পণ কর। আল্লাহ্কে ভয় কর এবং জেনে
রাখ, তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার দ্রষ্টা।
মর্মার্থঃ—প্রত্যেক মানুষের এই সংসারে একটা পদ আছে এবং সেই পদের দায়িত্ব
কর্তব্য আছে। সবায় যদি নিজ নিজ পদের দায়িত্ব অনুসারে কর্তব্য কর্ম করে তবে সমাজের
একটা শিশুও ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। আগে মানুষকে নিজ নিজ অন্তরের প্রতিপালককে ভয় করে
নিজের অন্তর্জগতকে শাসন করে পরিশুদ্ধ হতে হবে। পবিত্র পরিশুদ্ধ জীবন ছাড়া মানুষ
কিছুতেই লোভ- লালসার মোহ বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে জীবন সত্যকে জানতে পারবে না। আর
জীবন সত্যকে না জানার জন্যই মানুষ নিজের সৎ -সত্য- সুন্দর ও জ্যোতির্ময় রূপ হারিয়ে
ফেলে অপরকে আক্রমণ করে নিজের রূপ ফিরে পাবার প্রতিযোগিতা করছে সংসার, সমাজ,
রাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিশ্বমঞ্চে। তালাক ইত্যাদি ছোট- খাট জীবনের ঘটনা হচ্ছে
বিশাল জীবন মঞ্চের ক্ষুদ্র রূপ, আল্লাহ্ মানুষকে এই সব ছোট ছোট জ্ঞান দ্বারা
জ্ঞানী করে তোলার ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিটি পরিবার বিশ্বপরিবারের ক্ষুদ্র রূপ, এই
ক্ষুদ্র পরিবার যত শান্তির হবে তত তারাতারি বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment