বিশ্বমানব
শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—৩ আলে ইমরান—৬ থেকে ১০ আয়াত।]
৬) তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের
আকৃতি গঠন করেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনি প্রবল পরাক্রমশালী,
প্রজ্ঞাময়।
মর্মার্থঃ—সবার কাছেই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী,
প্রজ্ঞাময় হয়ে রয়েছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ কারো উপাস্য নেই, তিনি যতক্ষণ সাথে
থাকেন ততক্ষণ জীবের চেতনশক্তি কাজ করে। তিনিই তাঁর মহাজাগতিক শক্তিবলে জীবদেহে
রক্তের স্রোত প্রবাহিত করে, রক্তের মাধ্যমেই অমৃতময় বীর্যের সৃষ্টি করেন। এই বীর্য
সহযোগে তিনিই মাতৃগর্ভে মানুষের আকৃতি গঠন করেন নিজের ইচ্ছায়, যে যেমন ভাবধারা
নিয়ে তাঁর সান্নিধ্যে অবস্থান করে সেই ভাবধারার উপর ভিত্তি করে। যে যেভাবে তাঁকে
উপাসনা করে সে সেভাবেই তাঁর নিকট থেকে ফল লাভ করে থাকে।
৭)
তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব ( কুরআন ) অবতীর্ণ করেছেন যার কিছু আয়াত সুস্পষ্ট,
দ্ব্যর্থহীন, এগুলো কিতাবের মূল অংশ; আর অন্যগুলো রূপক; যাদের মনে বক্রতা আছে,
তারা ফেতনা ( বিশৃংখলা) সৃষ্টি ও ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে যা রূপক তার অনুসরণ করে।
বস্তুত আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা সুবিজ্ঞ তারা বলে,
আমরা এটা বিশ্বাস করি। সমস্তই আমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে আগত। বস্তুত বুদ্ধিমান
লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে।
মর্মার্থঃ—বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ
করে এবং তারাই সত্যের সন্ধানে যেখানে যতদূর যেতে হয়, ছুটে যায়। আর যাদের কুটিল মন
তারা সত্যের মধ্যেও মিথ্যাকে খুঁজতে গিয়ে দিশেহারাময় জীবন যাপন করে। এই কিতাবের
সুস্পষ্ট আয়াতগুলি ছাড়াও কিছু রূপক মূলক আয়াত আছে, এই সব আয়াতের প্রকৃত সত্যরূপ একমাত্র
অবতীর্ণ কর্তা ছাড়া কেউ জানেন না। আর এই সব রূপক আয়াত নিয়েই চলে একশ্রেণির মানুষের
প্রতিহিংসা মূলক কার্যকলাপ। কিন্তু যারা সত্যজ্ঞানী ও বিশ্বাসী তাদের কাছে সবই
পবিত্র, পবিত্র সত্তা কর্তৃক অবতীর্ণ কোনোকিছুই অপবিত্র হতে পারে না এবং সেগুলি
কালের কবলে ধ্বংস হতেও পারে না, যে যেমন নিজের জীবনকে মূল্যবান করে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, তার কাছে এই কিতাবের আয়াতের
রূপ তেমন ভাবেই ফুটে উঠবে। যারা তাঁর নিকট থেকে প্রজ্ঞালাভ করে, তাদের কাছে রূপক
উন্মোচিত হয়ে যায় তাঁর কৃপায় এবং সে তখন সেইসব রূপক মূলক আয়াতের সত্যরূপ দেখে
আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে।
৮) হে
আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে বক্র করো না এবং
তোমার নিকট থেকে আমাদের করুণা দাও (দান কর), তুমিই মহাদাতা।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ মহাদাতা, তিনিই করুণা
দান করে মানুষকে সহজ সরল পথে নিজের দিকে আহ্বান করেন। মানুষ যতক্ষণ তাঁকে আশ্রয়
করে থাকে ততক্ষণ সে সহজ – সরল পথেই থাকে। কিন্তু এ জগতে তাঁকে আশ্রয় করে থাকতে দেয়
না পার্থিব জগতের ভয়- কামনা- বাসনা ইত্যাদি ভাব ভাবনা। আল্লাহ্র ধর্ম মানুষকে
সহজ- সরল- মহৎ অন্তরের করে তোলে, পাশাপাশি তাঁর নাম করে যে সামাজিক ধর্মের সৃষ্টি
মানুষ করে, সেই ধর্মের আশ্রয়ে গেলেই মানুষের অন্তরে বক্রতার সৃষ্টি হয় এবং মানুষ
ধর্মহীন হয়ে সহজ- সরল- মহান পথ হারিয়ে ফেলে।
৯) হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি মানবজাতিকে
একদিন একত্রে সমাবেশ করবে, এতে কোন সন্দেহ নেই; নিশ্চয় আল্লাহ্ নির্ধারিত সময়ের
ব্যতিক্রম করেন না।
মর্মার্থঃ—মানবজাতি যেদিন সত্যজ্ঞানের আশ্রয়ে
এসে,এক বিশ্ব প্রতিপালকের ছত্র ছায়ায় আসবে, তখন তাদের অন্তরে আর মিথ্যা ধর্ম নিয়ে
অহংকার থাকবে না। সেই সাথে বিশ্ব প্রতিপালকের নাম- ধাম নিয়েও আর কোন মোহ থাকবে না।
সবায় হয়ে উঠবে তাঁর অধীনে বিশ্বমানব শিক্ষার কর্মী। বিশ্বের সমস্ত ধর্মগ্রন্থ যে
একই সত্য বার্তা মানব জাতিকে দিয়ে চলেছে তখন সব মানুষ জানতে পারবে। এই দিন তাঁর
ইচ্ছায় অতি সন্নিকটে, তিনি মানব জাতিকে একত্রে সমাবেশ করার পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন,
তা বুদ্ধিমান লোকেরা উপলব্ধি করতে পারছে নিশ্চয়।
১০)
যারা অবিশ্বাস করে, তাদের ধনঐশ্বর্য ও সন্তান সন্ততি আল্লাহ্র নিকট কোন কাজে
লাগবে না এবং এ সকল লোকই জাহান্নামের ইন্ধন হবে।
মর্মার্থঃ—যে আল্লাহ্কে বিশ্বাস করে না,
তাকে আল্লাহ্ও বিশ্বাস করেন না। এই সব লোকের অহংকারের ধনঐশ্বর্য ও সন্তান সন্ততি
আল্লাহ্র কোন কাজে লাগে না, এসব অহংকারের মাল দিয়ে জাহান্নামে যে আগুন জ্বলে, সেই
আগুনের খোরাক হয় অবিশ্বাসীদের ধন- মাল- সন্তান- সন্ততির গৌরব। তাই বুদ্ধিমানেরা
জানে ইহজগতের সমস্ত সম্পদের মালিক একমাত্র বিশ্ব প্রতিপালক, তার পথেই এই সব ধন
সম্পদ ব্যয় করায় বৈধ পথ। যদি সেই সব সম্পদ সময়ে সেই পথে ব্যয় করা না হয় তবে তা
কালের কবলে পড়ে নরকের আগুনের ন্যায় জ্বলতে থাকে এবং সেই আগুনে উত্তরপুরুষদের টেনে
এনে ফেলে এবং তাদের জীবনকে নরক যন্ত্রণায় পরিপূর্ণ করে তোলে।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর
জয়।

No comments:
Post a Comment