Wednesday, 25 July 2018

কুরআন সুরা--৩ আলে --- ইমরান -- ৪১ থেকে ৪৫ আয়াত

    বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—৩ আলে- ইমরান- ৪১ থেকে ৪৫ আয়াত।]
  ৪১) সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নিদর্শন দাও। তিনি বললেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তিন দিন তুমি ইঙ্গিত ব্যতীত কথা বলতে পারবে না। আর তোমার প্রতিপালককে অধিক স্মরণ করবে এবং সন্ধ্যায় ও প্রভাতে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে।
     মর্মার্থঃ—যাকারিয়া তার প্রতিপালকের নিকট থেকে সাধনার নিগুঢ় রহস্যের কথা জানতে চাইলেন এবং সেই পথে কিভাবে স্থির থাকবেন সে ব্যাপারেও  নিদর্শন দেওয়ার প্রার্থনা করলেন। এখানে সাধনার গোপন তত্ত্ব পরিবেশন করা হয়েছে, তা হলো বাইরের জগৎ থেকে মুক্ত হয়ে অন্তর্জগতে অধিষ্ঠান করা। এখানে তিন দিন ইঙ্গিত ব্যতিরেকে কথা বলতে পারবে না অর্থাৎ সংসার জীবন, কর্ম জীবন ও অধ্যাত্ম জীবনের কথা ইঙ্গিত ব্যতিরেকে প্রকাশ করবে না সাধন জীবনের তিন দিন। সাধকদের জীবন তিন দিনের জন্যে, প্রথম দিন হচ্ছে কর্মদিবস, দ্বিতীয় দিন হচ্ছে হিসাবের দিবস ও তৃতীয় দিন হচ্ছে সাক্ষাৎকার দিবস। তারপরে বলা হয়েছে সন্ধ্যায় ও প্রভাতে তোমার প্রতিপালকের মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করবে, এখানে সাধকের জীবনে যাতে সন্ধ্যা ও প্রভাত না আসে তার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, কারণ যে সাধক বা বান্দা ঈশ্বরের রাজত্বের সাথে যুক্ত থেকে তাঁর মহিমা ঘোষণা করে তারা তাঁর সাথেই থাকে এবং তাঁর রাজত্বে দিন- রাত্রির কোন ভেদ নেই।
       ৪২) ( স্মরণ কর), যখন ফিরিশতাগণ বলেছিল, হে মারইয়াম! আল্লাহ্‌ অবশ্যই তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে নির্বাচিত করেছেন।
        মর্মার্থঃ—কাউকে বিষাক্ত সাপে দংশন করলে সেই দেহ সেই সাপের হয়ে যায় তেমনি কাউকে তার প্রতিপালক দংশন করলে সেই দেহের সব অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের অন্তর- বাহির সব তাঁর হয়ে যায়। তখন তাকে ঘিরে সমস্ত ফিরিশতা বা দেবতাদের কাজ শুরু হয়ে যায়, তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশে। মারইয়ামের জীবনকে ঘিরে সেটাই শুরু হয়েছিল, সেই বার্তা এখানে অবতীর্ণ হয়েছে।
     ৪৩) হে মারইয়াম! তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা ( মাথা নত) কর এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু কর।
      মর্মার্থঃ—মারইয়ামের কাছে ফিরিশতাগণ বার্তা পৌঁছে দিয়ে বিশ্বের সকল নারী জাতিকে তাঁর ন্যায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল রূপে গড়ে উঠার প্রেরণা দিয়েছেন। সকল নারীই যে এক একজন মারইয়াম তা যেন ভুলে না যায়, অনুগত ও অবনত হয়ে জ্ঞানীদের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান লাভ করে পবিত্র জীবন লাভ করায় হচ্ছে জীবনের ধর্ম। মানুষ কিছুতেই নিজের অহংকার বা মোহ জ্ঞান ত্যাগ করে নিজের প্রতিপালকের কাছেও মাথা নত করতে চায় না কিন্তু তার প্রতিপালক এতই দয়ালু যে যদি কেউ একবার অবনত হয়, তবেই তাকে দংশন করে সারা শরীরে এক শিহরন জাগানো আনন্দানুভূতি ঢেলে দেয়। তাই প্রতিপালকের প্রতি অবনত হয়ে, যারা জ্ঞানচর্চা করে তাদের সাথে নির্ভয়ে জ্ঞানচর্চা কর, এতেই অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ এক সত্য বিন্দুতে স্থির থাকবে এবং কোন অপবিত্রতা স্পর্শ করতে পারবে না।
      ৪৪) এটা অদৃশ্যলোকের সংবাদ; যা তোমাকে আসমানী বাণী দ্বারা অবহিত করছি। তুমি তাদের নিকট ছিলেনা যখন তারা তাদের কলম নিক্ষেপ করছিল মারাইয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব কে নিবে সে ব্যাপারে এবং যখন তারা ( এ ব্যাপারে) বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের কাছে ছিলে না।
       মর্মার্থঃ—দৃশ্যলোক অর্থাৎ এই পৃথিবী, আর অদৃশ্যলোক অর্থাৎ এই পৃথিবীর শক্তির ঘর, যা মানুষ দেখতে পায় না কিন্তু সেই ঘরের বিধান মেনে রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করতে বাধ্য হয়সেখানে যখন কারো ভাগ্যলিপি নিয়ে কলম ধরা হয় তখন সে থাকে না এবং যারা লেখার পরে ভাগ্যলিপি পাঠ করে বাদানুবাদ করে তখনও কর্মকর্তা উপস্থিত থাকে না। তবে এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে আসার মুহূর্তে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাকে কি কি কাজ করতে হবে পৃথিবীতে গিয়ে। কিন্তু এখানে জন্ম নিয়ে দেহ ধারণের পর জীব মায়ার অধীনে এসে সব ভুলে যায়। যারা সৌভাগ্যবান তারা কেবল তাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহে ফিরিশতাগণের মাধ্যমে অগ্রিম শুভ সংবাদ পেয়ে থাকে। এই আয়াত মানব জাতির জন্য অবতীর্ণ হয়, যাতে মানুষ তাদের অদৃশ্যলোক ও ফিরিশিতাগণকে বিশ্বাস করে এবং তাদেরকে নিয়ে গবেষণা করে সত্যজ্ঞান লাভ করে।
      ৪৫) ( স্মরণ কর), যখন ফিরিশতাগণ বলল, হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ্‌ নিজের পক্ষ থেকে তোমাকে একটি কথার সুসংবাদ দিচ্ছেন। যার নাম হবে মসীহ, মারইয়াম পুত্র ঈসা। সে হবে ইহকাল ও পরকালে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম।  
     মর্মার্থঃ—এই আয়াত কেবল মারইয়ামের জন্য সুসংবাদ নয় ফিরিশতাগণের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র তরফ থেকে, এ সংবাদ বিশ্বের সকল নারী জাতির জীবনের  জন্যে সুসংবাদ। প্রত্যেক নারীই যদি পবিত্র হয়ে দেবত্বগুণের অধিকারী হয় এবং সে নিজের মনকে আল্লাহ্‌র মনের সাথে যুক্ত করে জ্ঞানসাগরে স্নান করতে থাকে,  তবে কত ফিরিশতাদের সাথে তার সাক্ষাৎ হবে তার হিসেব নেই। এই অদৃশ্যশক্তি সম্পন্ন ফিরিশতাগণও মানব দেহ পাবার আশা করে এই পৃথিবীতে শুভ কাজ করার জন্য। এরা সকলেই আল্লাহ্‌র মনের দাসত্ব করে, তাদেরকে এই জগতের নারীরা ইচ্ছে করলেই নিজের সন্তান রূপে নামিয়ে আনতে পারে এই বার্তায় এখানে অবতীর্ণ হয়েছে। এই পৃথিবীর নারী- পুরুষ উভয়েই কামনা- বাসনার দাস হয়ে সংসার করতে গিয়ে ভুলে গেছে নিজেদের স্বভাবের উন্নতি করার কথা। মানুষের স্বভাবকে অধ্যাত্ম বলে, এই স্বভাবকে মানুষ যত উন্নতমানের করতে পারবে ততই আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের আলোতে গিয়ে স্বরূপবিজ্ঞানের পাতা খুলে আদি- অনাদির জ্ঞান লাভ করে প্রাচীনদের চিনতে পারবে নিজের আত্মীয় রূপে এবং তাঁদের সাহায্য সহযোগিতা লাভ করে জীবনকে ধন্য করতে পারবে।  
      জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                         

No comments:

Post a Comment