বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ অভিযান(৩৪৮) তারিখঃ—২০/ ০৭/ ২০১৮ আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ-- [ বেদ যজ্ঞ
করেই ঘরে ঘরে বার্তা পৌঁছে দাও যে শিক্ষাই হচ্ছে সত্য, শান্তি ও শক্তির প্রকাশ]
বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি থেকে শুরু করে পাঠক্রম
নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সর্বত্র মিথ্যা কথার ছড়াছড়ি। প্রকৃত সত্য যেটুকু
লুকিয়ে আছে তা ধরার মতো বুদ্ধি-কল্পনা –চিন্তাশক্তি বেশীরভাগ মানুষের নেই। নেই
কথাটা বললে ভুল হবে চিন্তা করার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব তাদের জীবনে আসে না। এত বেশী
নকল ও মিথ্যার অনুপ্রবেশ ঘটেছে যে সত্য-মিথ্যার জ্ঞানটুকু মানুষ হারিয়ে ফেলেছে।
সত্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা মানব সমাজের
চিত্র আমরা দেখেছি। আমাদের মায়েরা কোনদিন স্কুলের মুখ দেখেন নি। বাড়ীতে বসে তাঁদের
বাপ-মায়ের কাছে চিঠি লেখা পর্যন্ত জ্ঞানটা হয়তো পেয়েছিলেন। বিশাল সংসারে বৌ হয়ে
এসেছিলেন অল্প বয়সে। সংসারের সকলকে এমন এক ভালবাসার বন্ধনে বেঁধে রাখতেন কেউ ছিটকে
পালাতে পারতেন না। শত অভাব-অভিযোগ তাঁদের কাছে ছিল আনন্দের লড়াই। সংসারে এ
ব্যাপারে কোনদিন কোনরূপ অশান্তি চোখে পড়তো না।ভোর চারটে থেকে রাত্রি নয়টা পর্যন্ত
এমন এক শৃঙ্খলা বাড়ীতে বজায় থাকতো তাতে সকলে সমানভাবে অবসর পেত প্রতিদিন জ্ঞান
চর্চার জন্যে। বৈঠক আসরে চলতো রামায়ণ, মহাভারত-ভাগবত পাঠ। প্রতিদিন বাড়ীর মায়েরা
ভক্তি সহকারে এই পাঠ শুনতে শুনতে অধিকাংশ মুখস্থ করে ফেলতেন। প্রতিনিয়ত এই উৎসাহ
উদ্যমের কথা শুনতে শুনতে তাঁরা এক অফুরন্ত শক্তি লাভ করতেন মনের মধ্যে। মায়ের
বয়সের একটি মেয়েকেও চোখে পড়েনি যার মধ্যে আত্মজ্ঞানের প্রকাশ ঘটেনি। তাঁদের প্রেম-
প্রীতি ভালবাসার মধ্যে এতটুকু খাদ চোখে পড়েনি। তাঁদের ছিল সকলের আলাদা আলাদা সংসার
কিন্তূ বিপদ-আপদে-সুখে- দুঃখে অভাব-অভিযোগে সকলে এক সংসারে পরিণত হতেন। সত্যের
সাধনায় শক্তি কত তা আমাদের মায়েদের দিকে লক্ষ্য করলেই অনুধাবন করা যায়।
শিক্ষা মানুষের বৃত্তিগুলির শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। আমাদের মায়েরা যদি আধুনিক
শিক্ষার আলো পেতেন তবে তাঁদের শক্তি আরও বৃদ্ধি পেতো একথা জোড় গলায় বলা যেতে পারে।
এবার
আপনারা লক্ষ্য করুন বৈজ্ঞানিক যুগের গৃহিণীদের দিকে। ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার থেকে
অধ্যাপিকা সমস্ত প্রকার পদ তাঁরা দখল করে আছেন—খুব আনন্দ ও গর্বের কথা। কিন্তূ
সবকিছু থেকেও তারা আজ নিঃস্ব-অসহায়। তাঁরা যেদিন থেকে নিজেকে বেশী বুদ্ধিমান ও
চালাক ভাবতে শুরু করেছেন এবং ছোট সংসারের কল্পনা করতে শুরু করেছেন সেদিন থেকে নেমে
এসেছে তাঁদের প্রতি অভিশাপ। আধুনিক যুগের শিক্ষার আলো পেয়েও তাঁরা কেন এত সংকীর্ণ
মনা হয়ে পড়লেন? শ্রদ্ধা-ভক্তি-বিশ্বাস কেন তাঁদের হৃদয় থেকে উড়ে গেল? কুন্তী,
সীতা, সতী, সাবিত্রী, দময়ন্তী, গার্গী, মৈয়ত্রী, ভগবতী দেবী প্রমুখ নারী যে দেশে
জন্মগ্রহণ করেছেন—সেই দেশের জলবায়ু কোনদিন দুষিত হতে পারে না। এই দেশের সকল নারীর
জ্ঞান তাঁদের ন্যায়—তাঁদের শক্তিও তাঁদের ন্যায় সর্বাঙ্গে প্রবাহিত হচ্ছে। দেখা
যাচ্ছে কেবল যুগের ব্যবধান। অনুকরণের মাধ্যমেই মানুষকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের
জ্ঞান বুদ্ধি চিন্তা- কল্পনাশক্তির প্রকাশ—বিকাশ ঘটাতে হয়। আমাদের মায়েরা কুন্তী,
সতী,সীতা, সাবিত্রী দ্রুপদী, দময়ন্তী, লীলা, গার্গী মৈয়ত্রীকে ছোট বেলা থেকে
অনুকরণ করে নিজের জীবনকে ত্যাগ ঐশ্বর্য মাধুর্য ইত্যাদির মাধ্যমে গড়ে তোলার স্বপ্ন
দেখতেন। তাঁদের জীবনধারা ছিল তাঁদের নিত্য শিক্ষার সঙ্গী। সেজন্য অল্প বয়সে
সংসারের হাল ধরতে তাঁদের এতটুকূ অসুবিধা হতো না। তাঁদের জীবন হয়ে উঠতো আদর্শ নারীর
জীবন। জ্ঞান-বুদ্ধি- ধৈর্য শক্তি-শ্রদ্ধা-ভক্তি ভালবাসা কোনটার অভাব তাদের ছিল না
সংসার রচনার ক্ষেত্রে। কেবল ছিল না তাঁদের আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া।
বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিও অকুকরণ পদ্ধতি। কিন্তূ দুঃখের
বিষয় এই অনুকরণ সেই সত্যের অনুকরণ নয়। এই অনুকরণ হল নিরস বস্তুতান্ত্রিক যুগের
অনুকরণ। যে সমস্ত অনুকরণের মাধ্যমে মানুষের সৎ বৃত্তিগুলি ঘুমিয়ে পরে অসৎ
বৃত্তিগুলির জাগরণ ঘটে এই শিক্ষা পদ্ধিতে সেইগুলি আদরের সহিত রাখা হয়েছে। আর যে
সমস্ত মহাপুরুষ অবতার পৌরাণিক রাজা প্রমুখদের অনুকরণ করলে মানুষের সৎ বৃত্তিগুলি
জেগে উঠে প্রকৃত মানুষ রূপে নিজেকে প্রকাশ বিকাশ করার উৎসাহ উদ্যম জাগে সেগুলিকে
বস্তাপচা ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে চিরকালের জন্য পাঠক্রম থেকে দূর করা হয়েছে। সত্য
চিরকাল সত্য রূপেই থাকে। এর কোনরূপ মলিনতা আসে না যুগের পরিবর্তনেও।
আমরা যদি শিবাজী, মহাত্মাগান্ধী, ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু প্রমুখ
মহামানবদের জীবনী পাঠ করি তাহলে দেখতে পাব প্রত্যেকের মহৎ হবার পিছনে কোনও না কোন
মহাপুরুষের জীবনের আদর্শের অনুকরণ রয়েছে। পৃথিবীর বুকে কেউ মহৎ হয়ে উঠতে পারে না
আদর্শ মানুসকে অনুসরণ ছাড়া—এটা যুগ যুগ ধরে শিক্ষা জগতে প্রমাণিত হয়ে আসছে। আর রাজনৈতিক
নেতারা বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে পাঠক্রম থেকে মুছে ফেলেছেন আদর্শ মানুষের
জীবনীকে--- কারণ দেশে আদর্শ মানুষের আত্মপ্রকাশ ঘটলে অসৎ নেতাদের গদি থাকবে না।
প্রশ্ন উঠতে পারে আমরা কেন কোন আদর্শ
মহাপুরুষের জীবনকে অনুকরণ করবো? কোন আদর্শ মহাপুরুষের জীবনধারাকে অনুকরণ করে কি
অন্য মানব জীবন সুন্দর ভাবে গড়ে উঠতে পারে?
আমরা মহাত্মা গান্ধীর জীবনী পাঠ করলে দেখতে পাই
তিনি সারা জীবন রাজা হরিশ্চন্দ্রের জীবনকে অনুকরণ করে সত্যের পথ ধরে চলেছিলেন।
তাঁর জীবন পথে কত বাধাবিঘ্ন এসেছে কিন্তূ তিনি কোনদিন সত্যের পথ থেকে বিচলিত হননি।
তারপর আমরা দেখতে পেয়েছি স্বাধীনতা
সংগ্রামীদের। তাঁরা গীতা ও কুরআনকে চিরসাথী করে প্রেরণা পেয়েছেন, শক্তি পেয়েছেন,
সাহস পেয়েছেন—আদর্শ ও সত্যের পথ ধরে এগিয়ে চলার। তাঁরাই তাঁদের জীবনের শিক্ষা
দ্বারা প্রমাণিত করে দেখিয়ে গেছেন শিক্ষা হচ্ছে সত্য, শান্তি ও শক্তির প্রকাশ ঘটায়
মানব জীবনে প্রতিক্ষেত্রে। তাই মানুষকেই গড়ে তুলতে হয় সত্যের মন্দির নিজের বাড়ী থেকে শুরু প্রতিটি
বিদ্যালয়ে এবং দেশের শাসন যন্ত্রালয় ভবন গুলিতে। জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ
অভিযানের জয় ।

No comments:
Post a Comment