বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা—২৬৪ থেকে ২৬৮
আয়াত।]
২৬৪) হে বিশ্বাসীগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট
দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ লোকের মত নষ্ট করো না ঐ লোকের মত, যে নিজের ধন লোক
দেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ্ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তার উপমা একটি শক্ত
পাথরের মত যার, উপর কিছু মাটি থাকে, অতঃপর তার উপর প্রবল বৃষ্টিপাত তাকে মসৃণ করে
রেখে দেয়। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না।
বস্তুত আল্লাহ্ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ বা পরমেশ্বর অবিশ্বাসী
সম্প্রদায়কে সৎ পথে পরিচালিত করেন না। তাহলে মানুষকে সৎকাজ করতে হলে, সৎপরায়ণ হতে
হলে, সৎ পথে উপার্জন করে তা সৎ পাত্রে দান করতে হলে, আগে নিজেকে বিশ্বাসী করে গড়ে
তুলতে হবে। অপরকে কষ্ট দিয়ে যেমন কোন সম্পদ উপার্জন করা পাপ, তেমনি সেই সম্পদ
কাউকে অহংকার প্রদর্শনের জন্য দান করাও পাপ। অধিকাংশ লোক দান- খয়রাত করে নিজের নাম
প্রচারের জন্য, এই সব দানে কোন প্রকার পুণ্য নেই, এগুলো সামান্য বৃষ্টি হলেই মসৃণ
পাথরের গায়ে লেগে থাকা মাটির ন্যায় ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই মানুষকে
ঈশ্বরের আশ্রয়ে থেকে তাঁর দেওয়া দান এমনভাবে দান করতে হয়, তা যেন দান গ্রহীতার
হাতে গিয়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। আল্লাহ্র অণু মাত্র অনুগ্রহও মানুষকে অভাব
মুক্ত করে।
২৬৫) পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য এবং নিজের হৃদয়কে শক্তিশালী
করার জন্য তাদের ধন সম্পদ দান করে, তাদের তুলনা হল কোন উচ্চভূমিতে অবস্থিত একটি
উদ্দ্যান, যাতে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফল দ্বিগুণ জন্মে। যদি মুষলধারে
বৃষ্টি নাও হয় তবে শিশিরই যথেষ্ট। বস্তুত তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের অনুগ্রহ না
পেলে কে তাঁর সম্পদ দান করার অধিকার লাভ করবে? বিশ্বাসীরা জ্ঞানের আলোকে সবকিছু
পরিষ্কার দেখতে পায়, কোথা থেকে তাদের প্রতি অনুগ্রহ আসছে এবং তা বেড়েই চলেছে কার
ইচ্ছায় সবকিছুই তারা অনুভব করে, আল্লাহ্র কৃপায়। তাই তাদের ধন সম্পদ দান করেও শেষ
হয় না, কারণ তাদের ভাণ্ডার আল্লাহ্র ভাণ্ডারে পরিণত হয়ে থাকে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি
বিধানের জন্য। আল্লাহ্ অন্তর্যামী হয়ে সবার অন্তরের কথা জানেন ও সম্যক দ্রষ্টা
হয়ে সব কিছুই দেখেন।
২৬৬) তোমাদের কেউ কি চায় যে, তার খেজুর ও আঙুরের
একটি বাগান থাকুক, যার নিচে দিয়ে নদী প্রবাহিত এবং যাতে সকল প্রকার ফল মূল আছে, আর
সে ব্যক্তি বার্ধক্যে উপনীত হয়, আর তার অসহায় দুর্বল সন্তান- সন্ততি থাকে( এমন
অবস্থায়) তাকে ( ঐ বাগানকে) এক অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিঝড় আক্রমণ করে ও তা জ্বলে যায় (
বিনষ্ট হয়ে যায়) এভাবে আল্লাহ্ তাঁর সকল নিদর্শন তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে
প্রকাশ করেন যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার।
মর্মার্থঃ—ধন সম্পদ প্রচুর আছে অথচ যারা
নিজের সন্তানদের বিশ্বাসী- সত্যজ্ঞানী করে
গড়ে তোলার জন্য খরচ করে না, তাদের সন্তানেরা দুর্বল মস্তিকের হয়। এদের বিশাল সম্পদ
এক ধাক্কায় শেষ হয়ে যায়। পিতা- মাতাকে মনে রাখতে হয় অসহায় দুর্বল সন্তান- সন্ততি
অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিঝড়, বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য। তাই পিতা- মাতার উচিত পরিবারের সকলকে
আল্লাহ্র সম্পদে সম্পদশালী করে গড়ে তোলা।
২৬৭) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং
আমি ভূমি হতে তোমাদের জন্য যা উৎপাদন করে দিই, তা থেকে যা উৎকৃষ্ট তা দান কর। মন্দ জিনিষ দান করার সঙ্কল্প করো না, যেহেতু তোমরা তা গ্রহণ কর না, যদি না তোমরা চক্ষু বন্ধ করে থাক। এবং জেনে
রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।
মর্মার্থঃ— আল্লাহ্ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত
হয়ে সবার অন্তর ও বাহিরের ভূমি চাষ করে
চলেছেন উৎকৃষ্ট ফসল উৎপাদন করে দান করার জন্য। যারা বিশ্বাসী- জ্ঞানী- শ্রদ্ধাশীল
হয়ে তাঁর সাথে সদায় যুক্ত তারা সকলেই তাঁর সম্পদে ধনী। তাঁর দেওয়া সম্পদ সবই
উৎকৃষ্ট। সেই উৎকৃষ্ট সম্পদ দান করা মানুষের পক্ষে মহৎ দান। আর যারা উৎকৃষ্ট জিনিষ
দান করার পরিবর্তে মন্দ জিনিষ দান করার সংকল্প গ্রহণ করে, তাঁরা আল্লাহ্র বিশাল
রাজত্বের সম্পদের কথা অনুভব করতেই পারে না। তারা চোখ থাকতেও চোখ বন্ধ করে অন্ধের
ভূমিকা গ্রহণ করে জাহান্নাম বা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়।
২৬৮)
শয়তান (কুমন্ত্রণাদাতা) তোমাদেরকে দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং জঘন্য কাজে উৎসাহ
দেয়, পক্ষান্তরে আল্লাহ্ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান
করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
মর্মার্থঃ—মানুষের অন্তরে শয়তান ও আল্লাহ্
নিজ নিজ ভূমিকা নিয়ে বাস করে। শয়তান কুমন্ত্রণাদাতা হয়ে মানুষকে সদায় দারিদ্রতার
ভয় দেখায় ও সমস্ত প্রকার অন্যায় ও জঘন্য কাজে উৎসাহ দেয়। অধিকাংশ মানুষ তার
আশ্রয়েই লোভে ও ভয়ে ভীত হয়ে চলে যায়। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ জ্ঞানী, প্রাচুর্যময় ও
সর্বজ্ঞ হয়ে মানুষকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন এবং সৎকাজে
নির্ভয়ে এগিয়ে যাবার উৎসাহ প্রদান করেন। বিশ্বাসী- জ্ঞানীগণ উপলব্ধি করতে পারে
কোনটা শয়তানের এবং কোনটা আল্লাহ্র প্রেরণা কিন্তু অজ্ঞরা তা উপলব্ধি করতে পারে
না।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর
জয়।

No comments:
Post a Comment