Saturday, 21 July 2018

কুরআন সুরা-- ২ আল-- বাকারা-- ২৮৪ থেকে ২৮৬ আয়াত

       বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [সুরা—২ আল- বাকারা—২৮৪ থেকে ২৮৬ আয়াত।]
  ২৮৪) দ্যুলোকে ভূলোকে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহ্‌র। বস্তুত তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ কর অথবা গোপন রাখ, আল্লাহ্‌ তার হিসাব তোমাদের নিকট থেকে গ্রহণ করবেন। অতঃপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে খুশী শাস্তি দেবেন। বস্তুত আল্লাহ্‌ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
      মর্মার্থঃ--- দ্যুলোকে ভূলোকে যা কিছু আছে সমস্তই আল্লাহ্‌র। এই আয়াত অনুসারে প্রতিটি মানুষ সহ জীবজগৎ ও বস্তুজগতের সকলেই আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বরের। কেউ এমন থাকতে পারে না যে ঈশ্বরের বাইরে রয়েছে। মানুষকে বুদ্ধিমান জীবরূপে সৃষ্টি করার মূলে তাঁর বিশাল উদ্দ্যেশ্য রয়েছে। প্রতিটি মানুষ তাঁর প্রতিনিধি হয়ে দ্যুলোক ও ভূলোকের সবার সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে সর্বত্র শান্তির পরিমণ্ডল গড়ে তুলবে, এটাই তাঁর মূল উদ্দ্যেশ্যমানুষ তাঁর জ্ঞান- শক্তি- গুণে ভরপুর হয়েও তাঁর অবাধ্য হয়ে তাঁরই সাথে যুদ্ধ করছে, এটা দেখেই মানুষের জন্য অবতীর্ণ হতে থাকে লাখ লাখ ধর্মগ্রন্থ। প্রত্যেক মানুষ তো জানে সবকিছুই আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বরের, তবে কেনো তাঁরা প্রতি পদে পদে তাঁকে হত্যা করছে? এই হত্যালীলা কি আল্লাহ্‌কে হত্যালীলা নয়? এই দুষ্কর্ম করতে গিয়েই মানুষ নিজেদের জীবন সত্য থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে প্রতি পদে পদে আল্লাহ্‌র সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিজেদের বাসভূমিকে ভয়ংকর করে তুলেছে নিজেদের জন্য। মানুষের হিংসা- দ্বেষ আছে না প্রেম আছে তা তারা প্রকাশ করুক আর গোপন রাখুক তা তিনি জানেন। তাই তিনিই জানেন কাকে শাস্তি দিবেন বা কাকে ক্ষমা করবেন। ধর্মহীন মানুষদের জন্য জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধ নয়, এ যুদ্ধ কেবল ধার্মিক বিশ্বাসীদের জন্য। তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান, তাঁকে মাপার শক্তি লাভ করার ক্ষমতা ক্ষুদ্র মানব সত্তার আছে কি? যদি না থাকে তবে তাঁর অবতীর্ণ আয়াতের মূল্য দিয়ে কিভাবে তাঁরা সেই আয়াতের আলো দিয়ে নিজের জীবনকে আলোকিত করবে?
 ২৮৫) রসূল, তার প্রতি তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে সে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, এবং বিশ্বাসীগণও সকলে আল্লাহ্‌তে, তাঁর ফিরিশতাগণে, তাঁর কিতাবসমূহে এবং তাঁর রসূলগণে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। (তারা বলে), আমরা তাঁর রসূলদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং পালন করেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ক্ষমা চাই, আর তোমারই কাছে আমরা ফিরে যাব।
       মর্মার্থঃ--- রসূল হচ্ছেন একটা সত্যজ্ঞানের স্রোত, যা মানব দেহের অন্তরে প্রবাহিত হয়ে সেই অন্তরকে পবিত্র করে তোলে, তখন আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বরের আহ্বান রসূল সরাসরি শুনতে পান। এই সত্যজ্ঞান বা অবতীর্ণ আয়াতকে কেন্দ্র করে তখন একটি সত্যজ্ঞানের বলয় তৈরি হয়। এই বলয়ের কেন্দ্র বিন্দুতে থাকেন ঈশ্বর বা আল্লাহ, আর তাঁকে ঘিরে থাকেন বিশ্বাসী বা ভক্ত- জ্ঞানী মানব সত্তাগণ, সমস্ত ধর্মগ্রন্থ, সমস্ত ফিরিশতা বা দেব- দেবতাগণ, সমস্ত রসূল, অবতার সহ জ্ঞানীগুণীজন। এই বলয়ে সকলেই সত্যজ্ঞানী, বিশ্বাসী, উদার হৃদয়ের বিভিন্নরূপধারী সত্তা হলেও মূলত সকলেই এক। এক আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বর ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপাস্য নেই, এই বলয়কে কেন্দ্র করে যারা রয়েছেন তাঁরাই প্রচার করছেন আকাশবাণীর মাধ্যমে, এক মহাজাগতিক শক্তির উপর ভর করে। এই বলয়ে সকলকেই ফিরে যেতে হবে আবার সময়ের মধ্যেই সেখান থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে, এই মাজাগতিক শক্তির বিধানকে কেউ পালটাতে পারবে না।   
    ২৮৬) আল্লাহ্‌ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। ভাল এবং মন্দ যা উপার্জন করবে সে তারই ( প্রতিদান পাবে)। হে আমাদের প্রতিপালক যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে তুমি আমাদের অপরাধী করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর যেমন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিলে, আমাদের উপর তেমন দায়িত্ব অর্পণ করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! এমন ভার আমাদের উপর অর্পণ করো না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের পাপ মোচন কর, আমাদের ক্ষমা কর, আমাদের প্রতি দয়া কর, তুমি আমাদের অভিভাবক! অতএব সত্য প্রত্যখ্যানকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জয়যুক্ত কর।
     মর্মার্থঃ—এই আয়াতটি আল- বাকারা বা পবিত্র বিশ্বজ্যোতিঃ অধ্যায়ের শেষ প্রার্থনা মূলক আয়াতআল্লাহ্‌ বা ঈশ্বর যার যেমন দৈহিক মানসিক শক্তি তাকে তেমন কাজের দায়িত্ব দেন, কারো উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না। এই জন্যেই তিনি মানুষের গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে মানুষকে চারভাগে ভাগ করে দিয়েছেন। প্রথম শ্রেণির মানুষ নিজের সত্যজ্ঞানের দ্বারা সকলের সেবা করবে এবং এই জ্ঞানের দ্বারা সকলকে পবিত্র করে তোলার কাজে জীবন উৎসর্গ করে ফিরে যাবে। দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বরের বিধান অনুসারে পৃথিবীতে রাজ শাসন ধরে রেখে, এখানে সদায় শান্তির পরিবেশ রক্ষা করবে। তৃতীয় শ্রেণির মানুষ এই পৃথিবীর সকলের প্রতি লক্ষ্য রেখে সকলের জন্যেই খাদ্যের সুবন্দোবস্ত করবে। আর চতুর্থ শ্রেণির মানুষ এই পৃথিবীর বুকে সবায়কে  শান্তিতে ও নিরাময়ে থাকার ব্যবস্থার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। চার শ্রেণির মানুষকেই নিজ নিজ কর্ম শেষে ফিরে যেতে হবে সেই বলয়ে। এই চার শ্রেণির মানুষের কাজের তদারকি করবেন ও সমস্ত প্রকার সাহায্য করবেন ফিরিশতাগণ বা দেব- দেবতাগণ তাঁদের অদৃশ্য শক্তি দিয়ে। আল্লাহ্‌র বা ঈশ্বরের বিধানকে অমান্য করার ক্ষমতা কারো নেই। যারা এই সত্য জেনে তাঁর কাছে বিভিন্নভাবে প্রার্থনা জানায়, তাদের সকলের প্রার্থনা তিনি মঞ্জুর করেন।
      জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।   

No comments:

Post a Comment