বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলো।[ সুরা—২ আল—বাকারা—২৫৯ থেকে ২৬৩
আয়াত।]
২৫৯) অথবা সেই ব্যক্তির কথা স্মরণ কর, যে এমন
এক নগরে উপনীত হয়েছিল যা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সে (লোকটি) বলল, মৃত্যুর পর
কিরূপে আল্লাহ্ এটিকে (নগরটিকে) জীবিত করবেন? তখন তাকে আল্লাহ্ একশত বৎসর মৃত
রাখলেন, তারপর তাকে পুনর্জীবিত করলেন। আল্লাহ্ বললেন, তুমি (মৃত অবস্থায়) কতক্ষণ
ছিলে? সে বলল, একদিন অথবা এক দিনেরও কিছু কম। তিনি বললেন, বরং একশত বৎসর (মৃত
অবস্থায়) অবস্থান করেছিলে। আর তোমার খাদ্য সামগ্রী ও পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ্য
কর, সেটা অবিকৃত রয়েছে এবং তোমার গাধাটির প্রতি লক্ষ্য কর। আর ( এগুলো এ জন্য যে),
আমরা তোমাকে মানব জাতির জন্য নিদর্শন স্বরূপ করব। আর (গাধার) অস্থিগুলির প্রতি
লক্ষ্য কর, কিভাবে সেগুলিকে আমরা সংযোজিত করি এবং মাংস দ্বারা ঢেকে দিই। যখন এটি
তার নিকট সুস্পষ্ট হল তখন সে বলে উঠল, আমি জানি যে, আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে
সর্বশক্তিমান।
মর্মার্থঃ—উত্থান- পতন, সৃষ্টি- ধ্বংস, জন্ম-
মৃত্যু এগুলি সবই মানুষের কাছে স্বপ্নের ন্যায়। শত- সহস্র বছর কেটে যায়
চিরনিদ্রায়, তারপর মানুষকে যখন নিদ্রা থেকে তুলে পুনর্জীবন দেওয়া হয় তখন সে সময়ের
জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, মনে করে হয়তো সবে সকাল হয়ে একরাত্রি কেটেছে। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর
সর্বশক্তিমান হয়ে জীব জগত ও জড় জগতকে নিয়ে যে খেলা খেলছেন, এসবই তাঁর মায়ার
বিজ্ঞানের প্রভাব। আমাদের মধ্যে খুব কম লোকই জাতিস্মর হয়ে জীবন লাভ করে। আল্লাহ্
নিদর্শনের জন্যে কাউকে কাউকে জাতিস্মর রূপে সৃষ্টি করেন এবং পূর্ব জন্মের কথা সব
স্মরণে গেঁথে দেন। অধিকাংশ মানুষ নিজের পূর্ব জন্মকে বিশ্বাস করে না, আবার যে তাকে মৃত্যুর পরেও নব
জীবন লাভ করতে হবে সেটাও বিশ্বাস করে না। এই অবিশ্বাসীদের বুদ্ধি গাধার ন্যায়,তাই
গাধার হাড় কিভাবে সারা শরীরে যুক্ত করে সেই হাড়কে মাংস দ্বারা ঢাকা হচ্ছে সেটাও
আল্লাহ্ সেই জাতিস্মরকে দেখালেন। খাদ্য পানীয় সভ্যতা ধ্বংসের সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে
যায় না, তারা পুনঃ প্রাণের সৃষ্টির জন্য অবিকল অবস্থায় থেকে যায়।এই আয়াত থেকেই
মানুষের জ্ঞান লাভ করতে হবে পরকালের উন্নত জীবন লাভ করার জন্যে।
২৬০) আরও (স্মরণ কর), যখন ইব্রাহীম বলল, হে আমার
প্রতিপালক! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর আমাকে দেখাও। তিনি বললেন, তুমি কি এটা
বিশ্বাস কর না? সে বলল, নিশ্চয় ( বিশ্বাস করি) তবে এটা কেবল আমার মনকে প্রবোধ
দেওয়ার জন্য! তিনি বললেন, তবে চারটি পাখি ধর এবং ঐগুলিকে তোমার বশীভূত কর। তৎপর
তাদের এক এক অংশ পাহাড়ে স্থাপন কর। অতঃপর ঐগুলিকে ডাক দাও, তারা দ্রুতগতিতে তোমার
নিকট আসবে। জেনে রাখ যে, আল্লাহ্ প্রবল
পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
মর্মার্থঃ--
আল্লাহ্র নিকট ইব্রাহিম জানতে চান কিভাবে তিনি মৃতকে জীবিত করেন? আল্লাহ্
তাকে চারটি পাখি ধরে তাদের বশীভূত করার পরামর্শ দিলেন, তারপর তাদের এক এক অংশ
পাহাড়ে স্থাপন করে তাদেরকে ডাক দিতে বললেন, এবং সেই ডাক শুনে তারা দ্রুতগতিতে তার
কাছে ছুটে আসবে সেই কথাও জানালেন। এর অর্থ হচ্ছে জ্ঞানীরা জানেন আত্মার সাথে
অন্তঃকরণের সম্পর্ক, এই অন্তঃকরণে চারটি পাখি মন, বুদ্ধি, অহংকার ও চিত্ত আত্মাকে
ঘিরে বাস করে। এই চার পাখিকে বশে রাখা বড়ই দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু একবার বশীভূত হয়ে
গেলে আত্মা অর্থাৎ চেতন শক্তি তাদেরকে যখন যেখানে যে অবস্থায় ডাক দিবে তখন তাদেকে
ছুটে আসতেই হবে। সমস্ত আত্মা বা চেতন শক্তি আল্লাহ্র বশবর্তী, তিনি এই চার পাখীকে
ডাক দিলেই আত্মার সমীপে এসে অন্তঃকরণে যুক্ত হয়ে পাহাড় থেকে উপাদান নিয়ে অর্থাৎ
পঞ্চভূত থেকে উপাদান নিয়ে মৃতকে জীবন দান করেন। তিনি প্রবল পরাক্রমশালী ও
প্রজ্ঞাময়, তাঁর কাছে একাজ অতি সহজ।
মানুষের বুদ্ধি এখানে কাজ করে না কেবল বিশ্বাস-ই তাকে মহৎ করে তোলে।
২৬১)
যারা আপন ধন আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য বীজের মত, যা থেকে
সাতটি শীষ জন্মে, প্রতিটি শীষে থাকে একশত শস্য দানা। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, মহাজ্ঞানী।
মর্মার্থঃ—মানুষের নিজস্ব ধন বলতে কিছুই নেই,
এই সত্য জেনে যারা আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের চরণে নিজেকে সমর্পণ করে, তারাই অহংকার শূন্য
ও চাহিদা শূন্য হয়ে কেবল তাঁর সাথী হয়ে থাকে। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর প্রাচুর্যময়,
মহাজ্ঞানী, তিনি নিজে অভাবমুক্ত অতএব তাঁর চাহিদা কিছুই নেই, তিনিই সকলের চাহিদা
পূরণ করেন। এখন যে যেমন ভাবে নিজের জীবন তাঁকে সমর্পণ করবে সে তেমনভাবেই তাঁর ধনে
ধনী হয়ে উঠেবে। মানুষের জীবনটায় হচ্ছে বড় ধন, এই ধনের ব্যয়ের কথায় এখানে বলা
হয়েছে।
২৬২) যারা আল্লাহ্র পথে আপন ধন ব্যয় করে এবং যা
ব্যয় করে তার কথা বলে বেড়ায় না এবং ( ঐ দানের বদলে কাউকে) কষ্টও দেয় না, তাদের
পুরষ্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।
মর্মার্থঃ—নিজের ধন- প্রাণ অতি গোপনে আল্লাহ্র
পথে ব্যয় না করলে কেউ জীবন সত্যকে জানতে সক্ষম হয় না। আল্লাহ্র পথে সাধনা—সংগ্রামে
সামান্য অহংকার বা প্রচারের আলো প্রবেশ করলেই সেখানের অন্ধকার নেমে আসে। সূর্যের
উদয়ের কথা যেমন সূর্যকে প্রচার করতে হয় না তেমনি আল্লাহ্র পথে কেউ সংগ্রাম বা
সাধনা করছে তা প্রচার করলেই তা ক্ষতিকারক রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয় সাধন মঞ্চে। তাই
যারা নীরবে আল্লাহ্র পথে জীবন ধন ব্যয় করে তারাই ধন্য। তাদের ইহকালে ও পরকালের
জন্য কোন ভয় থাকে না।
২৬৩)
যে দানের পর কষ্ট দেয়া হয় তার চেয়ে মিষ্টি কথা বলা এবং ক্ষমা করা উত্তম। আল্লাহ্
অভাবমুক্ত, পরম সহনশীল।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ বা ঈশ্বর অভাবমুক্ত, পরম
সহনশীল, সেই গুণ দিয়েই মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রতিনিধি রূপে।
আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত সম্পদই তাঁর অধীনে, এই সত্য জেনে মানুষকে দান করতে হয়
কেবল তাঁর প্রতিনিধি হয়ে সমস্ত অহংকার ত্যাগ করে। ফলের বৃক্ষ ফল দান কালে কোন
অহংকার দেখায় না বা কাউকে কষ্ট দেয় না। আল্লাহ্ পার্থিব জগতের সম্পদ দান করার
জন্যই ধনীদের দিয়ে থাকেন, এই জ্ঞান না থাকলে সেই মানুষ দানের পরিবর্তে প্রতিদান
চাইবেই এবং মানুষের মনে আঘাত দিয়ে অবিশ্বাসী করে তুলবে।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর
জয়।

No comments:
Post a Comment