বিশ্ব মানব শিক্ষায় পবিত্র
কুরআনের আলো। [সুরা—২ আল—বাকারা—২৭৯ থেকে ২৮৩ আয়াত।]
২৭৯) যদি তোমরা না ছাড় তবে জেনে রাখ যে, এটা
আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ ( করার সামিল)। কিন্তু যদি তোমরা তওবা
(অনুশোচনা) কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা অত্যাচার কর না এবং অত্যাচারিতও
হয়ো না।
মর্মার্থঃ—সুদ খাওয়া বন্ধ না করলে সমাজে
কেউ নিঃস্বার্থভাবে একে অপরের সুখে – দুঃখে পাশে থেকে সেবা করতে পারবে না।
স্বার্থপর মানুষে দেশ ভরে যাবে, সকলেই কেবল অর্থের পিছনে ছুটবে এবং কেবল অর্থ
উপার্জনকেই জীবনের মূল লক্ষ্য ভাববে। আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের (সত্যজ্ঞানের)
বিরুদ্ধে তারা সারা জীবন যুদ্ধ করতে থাকবে অর্থ- সম্পদ দিয়ে জীবনকে ঢেকে রাখার
জন্য। আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের কাছে যা
জীবনের আবর্জনা, অজ্ঞদের কাছে তা জীবনের সব থেকে বড় সম্পদ। এই আয়াতে আল্লাহ্
সত্যকে জেনে অত্যাচার বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, বিশেষ করে পার্থিব জগতের
আবর্জনার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে যে মানুষের মধ্যে অশান্তি চলছে তা দেখে। তোমরা কেউ
কারো উপর অত্যাচার কর না এবং নিজেরাও অত্যাচারিত হইও না, তাহলেই সবদিকে শান্তির
পরিবেশ গড়ে উঠবে।
২৮০) যদি ( খাতক) অভাবী হয়, তবে তাকে
সচ্ছ্বল হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দাও। আর যদি ঋণ মাপ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও
উত্তম, যদি তোমরা জানতে।
মর্মার্থঃ—ক্ষমা বা মাপ করতে যত শিখবে ততই
অন্তর পবিত্র হতে থাকবে। অন্তর পবিত্র না হলে কেউ জ্ঞান লাভ করতে পারে না। আর
জ্ঞান ছাড়া কারোও মুক্তি নেই ইহকালে বা পরকালে। তাই নিজের শ্রমের ফসল দান কর,
বিক্রি করতে যেও না, তাহলেই দেখতে পাবে সেই ফসল চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকবে।
অভাবী লোককে সময় দাও নিজের জ্ঞান বুদ্ধি দান করে, উৎসাহ দিয়ে তাকে সৎকর্মপরায়ণ করে
তোলো, দেখবে সে নিজেই তোমার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে তোমার পাওনা পরিশোধ করার জন্য তৎপর
হয়ে উঠবে।
২৮১)
আর তোমরা ভয় কর সেই দিনকে, যেদিন তোমরা আল্লাহ্র কাছে ফিরে যাবে। অতঃপর প্রত্যেককে
তার কর্মের ফল পূর্ণভাবে প্রদান করা হবে, আর তাদের প্রতি কোনরূপ অন্যায় করা হবে
না।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের নির্দেশ ছাড়া
এই পৃথিবীতে কেউ দেহধারণ করার সুযোগ পায় না। বিশেষ কোন কাজ শেষ করার জন্য এখানে
মানুষকে দেহধারণ করতে হয় বিভিন্ন পরিবেশে। প্রত্যেকের জন্য সময় ধার্য থাকে, তাই
সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পূর্ণ করে বা না করে ফিরে যেতে হয়। যারা নিজের কাজ সময়ের
মধ্যে সম্পূর্ণ করে ফিরে যায় তাদের কর্মের ফল পূর্ণভাবে প্রদান করা হয়, আর যারা
অবাধ্য হয়ে কাজ শেষ না করেই ফিরে যায় তাদেরকেও শাস্তিস্বরূপ ফল প্রদান করা হয়। যে
যেমন কর্ম করে ফিরে যাবে সে তেমনি ফল পাবে, কারো প্রতি সেখানে কোনরূপ অন্যায় করা
হয় না।
২৮২) হে
বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন একে অন্যের সাথে ঋণ সংক্রান্ত কারবার করবে, তখন তা লিখে
রেখ, এবং তোমাদের মধ্যে কোন লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়, লেখক লিখতে অস্বীকার
করবে না। যেহেতু আল্লাহ্ তাকে শিক্ষা (জ্ঞান) দিয়েছেন, সুতরাং সে যেন লেখে। এবং
ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয় এবং তার প্রতিপালক আল্লাহ্কে ভয় করে। এবং
কিছু যেন কম না লেখায়। কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল হয়, অথবা লেখার
বিষয়বস্তু বলে দিতে না পারে, তবে যেন তার অভিভাবক ন্যায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু বলে
দেয় এবং তোমাদের পছন্দমত দুজন পুরুষকে সাক্ষী সাক্ষী রাখবে, আর যদি দুজন পুরুষ না
থাকে, তবে একজন পুরুষ ও দুজন স্ত্রীকে, ( সাক্ষী করে নেবে) স্ত্রীলোকদের মধ্যে
একজন ভুল করলে তাদের অপরজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। সাক্ষীগণকে যখন ডাকা হবে তখন
যেন অস্বীকার না করে। আর দেনা কম হোক, কিংবা বেশী হোক, মিয়াদ ( নির্দিষ্ট সময়সহ)
লিখতে তোমরা বিরক্ত হয়ো না। আল্লাহ্র নিকট এটা নায্যতর ও প্রমাণের জন্য দৃঢ়তর এবং
তোমাদের মধ্যে সন্দেহ উদ্রেক না হওয়ার নিকটতর। কিন্তু তোমরা পরস্পর যে ব্যবসার নগদ
আদান প্রদান কর তা তোমরা না লিখে রাখলে কোন দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পরের মধ্যে
বেচাকেনা কর তখন সাক্ষী রেখ, লেখক এবং সাক্ষী যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। যদি তোমরা
ক্ষতিগ্রস্ত কর তবে তা তোমাদের জন্য পাপ, তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর। বস্তুত আল্লাহ্ই
তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ্ সকল বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।
মর্মার্থঃ—এই কর্মভূমি ও জ্ঞানপীঠে কেউ পাপ ও
অন্যায় কাজ করার জন্য আসেনি, যাতে কেউ পাপ ও অন্যায় কাজ না করতে পারে বাইরের জগতে
ও অন্তর্জগতে সেই জন্যই এই বিধান। অন্তর্জগৎ ভয় দ্বারা শাসিত থাকলে কেউ বাইরের
জগতে পাপ ও অন্যায় কাজ করতে সাহস পাবে না। বাইরের জগতের কাজের জন্যে বাইরের জগতের
লোককেই সাক্ষী রাখতে হয় আর অন্তর্জগতের কাজের সাক্ষী থাকেন অদৃশ্য জগতের ফিরিশতা
বা দেবতাগণ। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর মানুষকে বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে শিক্ষা দেন এবং
শিক্ষার মাধ্যমে বাইরের ও অন্তরের দুর্বলতাকে দূর করে নিজের শক্তির বলয়ের মধ্যে
আকর্ষণ করতে থাকেন। যে যেমন বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল হবে, তাঁর অবতীর্ণ আয়াত, তার
কাছে তেমন ভাবে আলোকিত হবে।
২৮৩) আর যদি তোমরা প্রবাসে থাক এবং কোন
লেখক না পাও, তবে বন্ধক রাখা বৈধ। আর যদি তোমরা পরস্পর পরস্পরকে বিশ্বাস কর, যাকে
বিশ্বাস করা হয় সে যেন ( বিশ্বাস বজায় রেখে) আমানত প্রত্যর্পণ করে, এবং তার
প্রতিপালক আল্লাহ্কে ভয় করে। আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না, বস্তুত যে তা গোপন
করে, নিশ্চয় তার অন্তর পাপী। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তা সবিশেষ অবহিত।
মর্মার্থঃ—বিশ্বাসীরা সকলকেই নিজের মতোই
বিশ্বাস করে। তাদের অন্তরে অবিশ্বাসের বীজ কেউ
বপন করতে চাইলেও তা অঙ্কুরিত হয় না। তারা প্রবাসে বা বাইরে থাকলেও আল্লাহ্ বা
ঈশ্বরের আশ্রয়েই থাকে এবং সকলকেই নিজের আত্মীয় ভেবেই
বিশ্বাস করে। তারা সাক্ষ্য গোপন করে কোনরূপ প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে না। আল্লাহ্
বা ঈশ্বর তাদের অন্তরে সদায় জাগ্রত থেকে তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, এই
বিশ্বাস নিয়েই তারা এগিয়ে চলে। যারা সাক্ষ্য গোপন করে প্রতারণার আশ্রয় নেয় তারা
পাপের পথে চলতে থাকে বিভ্রান্তকারীদের আশ্রয়ে গিয়ে। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর সকলের কাজের ব্যাপারে অবহিত আছেন, কিন্তু তিনি প্রজ্ঞাবানদের সাথেই থাকেন, তাদের সাহায্যকারী হয়ে। আল্লাহ্র
অবতীর্ণ আয়াত এর মূল্য কত তা কে জানে? যে যেমন মূল্য দিয়ে তা ক্রয় করবে সে তেমন
তাঁর রূপ- ঐশ্বর্য – মাধুর্য – বৈভব দেখতে পাবে।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর
জয়।

No comments:
Post a Comment