Thursday, 19 July 2018

কুরআন সুরা--২ আল-- বাকারা-- ২৭৪ থেকে ২৭৮ আয়াত

   বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা—২৭৪ থেকে ২৭৮ আয়াত।]
  ২৭৪) যে সকল লোক রাত দিন গোপনে ও প্রকাশ্যে তাদের ধন খরচ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরষ্কার রয়েছে। সুতরাং তাদের কোন ভয়ও নেই এবং তারা কোন দুঃখও পাবে না।
   মর্মার্থঃ—মানব জীবনের সাথে ধন দুই ভাবে যুক্ত। প্রথম ধন হচ্ছে অন্তর্জগতের সাথে যুক্ত পবিত্র জ্ঞান বা প্রজ্ঞা। দ্বিতীয় ধন হচ্ছে বহির্জগতের সম্পদ। প্রজ্ঞাবানেরা বহির্জগতের সম্পদকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যুক্ত করতে চায় না নিজের জীবনের সাথেএই প্রকৃতির মানুষদের দেখা যায় দিন রাত গোপনে ও প্রকাশ্যে মানুষের অন্তর্জগতকে আবর্জনা থেকে পরিষ্কার করে পবিত্র জীবন যাপনের পথ দেখাতে। এদের কাছে বহির্জগতের যেসব ধন- দৌলত থাকে তা জীবনের আবর্জনা ভেবে সৎকাজে লাগাবার পথ খোঁজে এবং সেই পথ পেলেই তা দান করে দিয়ে আবর্জনার বোঝা থেকে জীবনকে মুক্ত করে। দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষের কাছে প্রচুর বহির্জগতের ধন- সম্পদ থাকলেও তা তারা দান করার সময় হিসেব কষে লাভ লোকসানেরতাদের সম্পদ সুদের বাজারে চক্রবৃদ্ধিহারে বৃদ্ধি পায়, সেই বৃদ্ধির কিছু অংশ নিজের নাম- যশ- অহংকার প্রকাশের জন্য দান করে থাকে দীন- দুঃখী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এদের দান অপরকে শোষণ করে শোষণের কিছু অংশ বিতরণ করে মানব সমাজকে বিভ্রান্ত করার জন্য। এখন আল্লাহ্‌র নিকট কে দুঃখিত হবে আর কে পুরস্কৃত হবে তা তিনিই জানেন।
     ২৭৫) যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তির মত দণ্ডায়মান হবে, যাকে শয়তান স্পর্শদ্বারা পাগল করে দিয়েছে। এটা এজন্য যে, তারা বলে, বেচাকেনা তো সুদের মত। অথচ আল্লাহ্‌ বেচাকেনাকে বৈধ ও সুদকে অবৈধ করেছেন; যার কাছে তার প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে তারপর সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা করেছে তা তারই, এবং তার বিষয় আল্লাহ্‌র অধিকারভুক্ত; আর যারা পুনরায় (সুদ) নিতে আরম্ভ করবে, তারাই জাহান্নামবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
      মর্মার্থঃ—সুদ খাওয়া শয়তানী বুদ্ধির ব্যবসা। এই ব্যবসার দ্বারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বের পবিত্র পরিবেশ দূষিত হতে থাকে। ধনী সম্প্রদায়ের ধন বিনা পরিশ্রমে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকে, মধ্যবর্তী সম্প্রদায় এই শ্রেণির মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিকার হয়ে মদ- জুয়া প্রভৃতি নেশাতে আসক্ত হয়ে পড়ে ধনী হবার স্বপ্ন দেখতে দেখতে। আর তৃতীয় শ্রেণির গরীব লোকেরা সুদের ভারে জর্জরিত হয়ে জীবনে বেঁচে থাকারও স্বপ্ন হারিয়ে ফেলে। সুদের ব্যবসা হলো সম্পূর্ণ ফাঁকিবাজি লোভ দেখানো ব্যবসা বৃহত্তর ক্ষেত্রে। কত চিটফাণ্ড এই সুদের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বে গড়ে উঠে শয়তানী বুদ্ধির আশ্রয় নিয়ে, তারপর লাখ- লাখ মানুষকে প্রতারিত করে দু- চার জন মানুষ ধনী সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে উঠে। তাছাড়া বিশ্বের সমস্ত দেশ সুদে একে অপরের নিকট থেকে অর্থ ঋণ নিয়ে উন্নয়ণের নামে শয়তানী বুদ্ধি খাটিয়ে কতিপয় নেতা- মন্ত্রী ধনী হচ্ছে এবং সেই দেশ- রাজ্যের অধিবাসীদেরকে সেই সুদের অর্থ দিতে হচ্ছে, এবং দিন দিন সাধারণ মানুষের করের বোঝা বাড়তে থাকলেও সেই ঋণ কোনদিন পরিশোধ হচ্ছে না, সুদ পরিশোধ করতেই উন্নয়নের সব টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানব জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, শয়তানের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
    ২৭৬) আল্লাহ্‌ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ্‌ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসেন না।
    মর্মার্থঃ—প্রকৃত বিশ্বাসী ও জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যে সুদকে নিশ্চিহ্ন ও দানকে বৃদ্ধি করা হলেও, সুদের ব্যবসায় সারা বিশ্বের সমস্ত জায়গায় রমরমিয়ে চলছে অকৃতজ্ঞ মানুষদের অঙ্গলি হেলনে। এই অকৃতজ্ঞ পাপীদের আল্লাহ্‌ ভালবাসতে পারেন না। মায়া সভ্যতা গড়ে তোলার জন্য এই সুদের কারবারে সারা মানব সমাজ যুক্ত হয়ে পড়েছে, এতে থেকে মুক্তির উপায় একমাত্র তিনিই জানেন।
    ২৭৭) যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকার্য করে, নামায যথাযথ ভাবে পড়ে এবং যাকাত দেয়, তাদের পুরষ্কার তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে। তাদের কোন ভয় নেই, আর তারা কোনরকম দুঃখও পাবে না।
   মর্মার্থঃ—নিজের অন্তরাত্মার প্রতি বিশ্বাস রেখে যারা সৎকার্য করে, নামাযের মাধ্যমে অন্তরে সত্যজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা করে, সেই জ্ঞান যাকাত বা দান রূপে অপরকে দেয়, তারাই সফলকাম। তাদের পুরষ্কার তাদের ঈশ্বর বা প্রতিপালকের নিকট থাকবেই। এদের কোন ব্যাপারেই ভয় ও অন্তরে দুঃখ থাকতে পারে নাএরা সদায় মুক্ত পুরুষ তাঁর রাজত্বে।
    ২৭৮) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।
  মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌কে ভয় করে অন্তর্জগতকে শাসন করতে শিখো, তাহলেই আর অতীত লাভ-লোকসান তোমাদেরকে আক্রমণ করতে পারবে না। সুদের যা বকেয়া আছে সে সব চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র জীবন যাপন করার সাধনা কর বিশ্বাসী মানুষ হয়ে, তোমাকে কেউ বিশ্বাস না করলেই তুমি বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠবে সকলের চোখে। সুদের ছোট- বড় সকল কারবারীরা বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে, এখন সারা বিশ্ব তাদের অধীনেই চলছে, আল্লাহ্‌র অবতীর্ণ আয়াতগুলিকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে।
      জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।    

No comments:

Post a Comment