বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা- ১৯৪ থেকে ১৯৮
আয়াত।]
১৯৪) পবিত্র মাসের বদলে পবিত্র মাস এবং সকল পবিত্র জিনিষের জন্য এরূপ
বিনিময়। সুতরাং যে তোমাদেরকে আক্রমণ করবে তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ করবে এবং
তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ্ সাবধানীদের সাথে থাকেন।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের রাজত্বে বাস করে যারা তাঁর অনুশাসন মেনে চলে
না তাদের জন্যে বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ ধেয়ে আসে। এই সব অপবিত্র লোক পবিত্র মাসের
ব্যাপারে কিছুই বুঝে না, পবিত্র বস্তুর ব্যপারেও কিছুই বুঝে না। পবিত্র দেহ- মন-
প্রাণ- আত্মা না হলে কেউ পবিত্র সত্তার ধারে কাছে যেতে পারে না। তাই মানুষকে
পবিত্র হতে হলে বিনিময়ের জ্ঞানকে অন্তরে জাগ্রত করে সাধন পথে এগিয়ে যেতে হয়। পবিত্র
মাসের সাথে পবিত্র মাসেরই বিনিময় করে সময়ের সাথে তাল রেখে অন্তরকে জ্ঞানের আলোতে
আলোকিত করতে হয়। পবিত্র সময়- মাস- তিথি একবার চলে গেলে সে আর ফিরে আসে না, তাই
সময়ের মধ্যেই সৎ কর্ম সম্পূর্ণ করতে হয় সাধককে। প্রকৃতির বুকে যত রকমের পবিত্র
বস্তু আছে তাদের সাথে নিজের দেহ- মন- প্রাণ ও আত্মার বিনিময় করে তাদের সাথে এক হয়ে
যেতে হয় সাধককে। বাইরের জগতের পবিত্র বস্তুর সাথে সাধকের অন্তর জগতের পবিত্রতার
সম্পর্ক চিরমধুর। সাধনা করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবে প্রকৃতির বুক থেকে সাধকের জীবনে
নানারকম ভয়ংকর আক্রমণ আসবে, এই সব আক্রমণ থেকে সাধককে বাঁচতে হলে অবশ্যই তাকেও তার
থেকে বেশী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করতেই হবে, নচেৎ আত্মরক্ষা করা সম্ভব হবে না।
বিশাল অন্তর্জগতের সাম্রাজ্যে একমাত্র অধীশ্বর আল্লাহ্কে জেনে সাবধানী বা
জ্ঞানীরা কেবল তাঁর অনুশাসনকে ভয় করেন এবং সেই ভয়েই, সময়ের মধ্যেই নিজের কর্তব্য
কর্ম সম্পূর্ণ করেন।
১৯৫) আর আল্লাহ্র পথে ব্যয় কর।
তোমরা নিজেরা নিজেদের সর্বনাশ করো না এবং তোমরা পূর্ণ সাধনা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ্
পুণ্য সাধকদের ভালবাসেন।
মর্মার্থঃ—যে পবিত্র দুর্লভ মানব জীবন পেয়েছো তা আর পাওয়া যাবে কিনা তা জান
না। তাই এই জীবনটা আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের পথেই ব্যয় কর বা উৎসর্গ কর, এর থেকে
জীবনের পবিত্র বিনিময় আর কি থাকতে পারে
সাধকদের জীবনে? নিজের জীবনের বিনিময়ে আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের জীবন লাভ করার জন্যেই
মানুষকে সাধনা করতে হয়, এই পথে পূর্ণ সাধনা করলেই মানুষ পুণ্য তীর্থ হয়ে উঠে এবং
আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের সান্নিধ্যলাভ করে তাঁর প্রিয়পাত্র হয়ে যান। তিনি এইরূপ পুণ্য
সাধকদের খুব ভালবাসেন।
১৯৬) আর আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে হজ্ব ও ওমরা
পূর্ণভাবে সম্পাদন কর, কিন্তু যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তবে সহজলভ্য (পশু)
কুরবানী কর। এবং যে পর্যন্ত কুরবানীর (পশু) তার গন্তব্য স্থানে উপস্থিত না হয়,
তোমরা মস্তক মুণ্ডন করো না। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ পীড়িত হয় অথবা মাথায় যন্ত্রণা
বোধ করে, তবে সে তৎপরিবর্তে রোযা রাখবে, কিংবা দান খয়রাত করবে অথবা কুরবানী দ্বারা
তার ফিদয়া (বিধিসংগত অর্থ প্রদান) দিবে। অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের
মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্বের প্রাক্কালে ওমরা দ্বারা লাভবান হতে চায় সে সহজলভ্য ( পশু)
কুরবানী করবে। কিন্তু যদি কেউ কুরবানীর কিছুই না পায়, তবে তাকে হজ্বের সময় তিনদিন
এবং গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর সাতদিন এই পূর্ণ দশ দিন রোযা পালন করতে হবে। এই নিয়ম
সেই ব্যক্তির জন্য, যার পরিবার পরিজন পবিত্র কা’বার নিকটে বাস করে না। আর তোমরা
আল্লাহ্কে ভয় কর এবং জেনে রাখ, আল্লাহ্ মন্দ কাজের প্রতি ফলদানে অত্যন্ত কঠোর।
মর্মার্থঃ—নিজের জীবনকে আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের সাথে বিনিময় করতে হলে, মানুষকে
অবশ্যই তাঁর বিধান মান্য করে জীবনকে তীর্থ বা হজ্বে পরিণত করতে হবে এবং নিজের পাশব
বৃত্তিগুলিকে কুরবানী দিতে হবে। জীবনকে পবিত্র করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করলেই
মানুষের জীবনে নেমে আসে বিভিন্ন দিক থেকে বাধাবিঘ্ন। এই সব বাধাবিঘ্ন কোথায় কোনদিক
থেকে আসছে তা শাস্ত্রীয় জ্ঞানের উপর ভর করে এবং নিজের জ্ঞান- বুদ্ধি- বিবেককে
জাগ্রত করে জেনে নিয়ে তার প্রতিকার করতে হবে। বাধাবিঘ্নের প্রতিকার না করলে তা
জীবনে আরও ভয়ংকর রূপ নিয়ে আসতেই থাকবে। মাথা থেকে এই সব বাধাবিঘ্নের চিন্তা দূর
হলেই সাধককে মস্তক মুণ্ডন করতে হয়, যাতে আর পুরানো পাপ বা অভ্যাসের কথা তার
পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়কে স্পর্শ না করে। সহজলভ্য কুরবানী অর্থাৎ সহজ সরল জীবন, সহজ সরল
কথা যা আল্লাহ্র অতি প্রিয় তাই কুরবানী দিতে থাকবে, জীবনকে হজ্ব- তীর্থ রূপে গড়ে
তোলার জন্যে। শারীরিক বিভিন্ন অসুবিধা আসতেই পারে এই পথে এগিয়ে যাবার সময়, এই সব
অসুবিধা থেকে মুক্ত থাকার জন্যে রোযার উপর নির্ভর যত নির্ভর করবে ততই শারীরিক
অসুবিধা থেকে নিজেকে মুক্ত দেখতে পাবে। রোযা মানে আল্লাহ্র সমীপে বা সান্নিধ্যে
থাকা। আল্লাহ্র রাজত্বে বাস করছো, এই চিন্তা মাথায় রেখে তাঁকে ভয় করে তাঁর বিধান
মেনে চলো, অন্তর্জগতকে শাসন করার জন্যে, তাহলেই আর তোমাকে কোন বাধা, অজ্ঞান স্পর্শ
করতে আসবে না এই তীর্থক্ষেত্রে। পবিত্র জীবন পেয়েও যারা অপবিত্র, অন্যায় ও মন্দ
কাজ করে এবং মানুষকে এই সব কাজে উৎসাহ দেয়, তাদের প্রতি আল্লাহ্র কঠোর শাস্তি
নেমে আসে এবং তাদের জীবন জান্নাত স্বরূপ
তীর্থক্ষেত্রের পরিবর্তে জাহান্নাম হয়ে উঠে।
১৯৭) সুবিদিত মাসে ( যথা – শওয়াল,যিলকুদ ও যিলহজ্বু)
হজ্ব হয়। যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ্ব করা আবশ্যক বলে মনে করে, সে যেন হজ্বের সময়
স্ত্রী- সহবাস, পাপ কাজ এবং ঝগড়া বিবাদ না করে। আর তোমরা যে সৎ কাজ কর, আল্লাহ্
তা জানেন এবং তোমরা পরকালের পাথেয় সংগ্রহ কর এবং আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে জ্ঞানীগণ! আমাকেই ভয় কর।
মর্মার্থঃ—মানুষের অন্তরের সুপ্রবৃত্তিগুলি
স্থান- কাল- পরিবেশের উপর জাগ্রত হয় আবার ঘুমিয়েও পড়ে। পবিত্র মাস বা সময়ের সাথে
মানুষের মন যুক্ত প্রকৃতির নিয়মে। তাই মানুষকে পবিত্র হজ্বময় বা তীর্থময় জীবন লাভ
করতে হলে আল্লাহ্র বিধান মান্য করেই তা করতে হয়। পবিত্র জীবন লাভ করতে যাওয়ার
প্রাক্কালে স্ত্রী- সহবাস, পাপ কাজ এবং ঝগড়া বিবাদ করলে মন চঞ্চল হয়ে উঠে, তাই
আল্লাহ্র বিধান মান্য করেই পবিত্র জীবন লাভের পথে মানুষকে যেতে হয়। পবিত্র জীবন-ই
একমাত্র সকলের ক্ষেত্রে পরকালের পাথেয়, তাই তা যারা সংগ্রহ করে না, তাদের পরকাল
অন্ধকার। আত্মসংযম দ্বারাই মানুষকে পবিত্র হতে হয় আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের জীবনের সাথে
জীবন বিনিময় করে। তাই জ্ঞানীরা কেবল আল্লাহ্ বা ঈশ্বরকেই ভয় করেন, কারণ একবার
নিজের জীবন বিনিময়ের ফলে যে জীবন ঈশ্বরময় হয়ে উঠেছে, তা যেকোন অন্যায় বা পাপ কাজের
দ্বারা অবিশ্বাসী জীবনে পরিণত হতে পারে।
১৯৮) তোমাদের পক্ষে তোমাদের প্রতিপালকের
অনুগ্রহ কামনায় কোন দোষ নেই। ( অর্থাৎ হজ্বের সময় ব্যবসা বাণিজ্য নিষিদ্ধ নয়) যখন
তোমরা আরাফাত ( একটি বিশাল প্রান্তর) হতে দ্রুত গতিতে প্রত্যাবর্তন করবে তখন
মাশয়ারুল হারামের নিকট পৌঁছে ( অর্থাৎ মুজাদালাফা নামক পাহাড়ে অবস্থান করত)
আল্লাহ্কে স্মরণ করবে এবং তিনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন ঠিক সেভাবে তাঁকে স্মরণ
করবে। যদিও পূর্বে তোমরা বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।
মর্মার্থঃ—এতদিন তোমরা সত্যকে জানতে পারো নি তাই বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত
ছিলে। হস্ত-পদাদি দিয়ে জীবন রক্ষার্থে কর্ম করায় বা প্রতিপালকের অনুগ্রহ কামনায়
কোন দোষ নেই। জীবনকে তীর্থে পরিণত করতে হলে আত্মসংযমের দ্বারা জাহান্নাম প্রান্তর
যা কামনা- বাসনার আগুনে সদায় দাউ দাউ করে জ্বলছে তা দ্রুত গতিতে পার হয়ে ফিরে আসতে
হবে এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে। মানব জীবন একটা পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, এই সত্য জেনে
কেবল আল্লাহ্ বা ঈশ্বরকে স্মরণ করবে, তাহলেই তিনি তোমার জীবনের বিনিময়ে নিজের
পবিত্র জীবন তোমাকে দান করবেন। এই জীবন পেলে আর তোমরা কোন দিন বিভ্রান্তদের
অন্তর্ভুক্ত হবে না।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment