বিশ্বমানব শিক্ষা পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২
আল- বাকারা—১৭৯ থেকে ১৮৩ আয়াত।]
১৭৯) হে বোধসম্পন্ন
ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য কিসাস বিধানে ( বিনিময় গ্রহণে) জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা
সাবধান হতে পার।
মর্মার্থঃ—পূর্ববর্তী আয়াতে নরহত্যা নিয়ে
বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তারপরেই আল্লাহ্ এই আয়াতে মানব জাতিকে বোধসম্পন্ন
ব্যক্তি বলে সম্বোধন করেছেন এবং বলেছেন নরহত্যার জন্য যে কিসাসের বিধান দেওয়া
হয়েছে তাতে জীবন রয়েছে। আয়াত যদি প্রাণবন্ত না হয় তবে সেই আয়াত কারো জীবন রক্ষা
করতে পারে না ও কাউকে সুপথ দেখাতেও পারে না। মানবজাতি যাতে সাবধান হয়ে সৎ পথের
দিশারী হয় এবং পাপমুক্ত জীবন নিয়ে সৎকর্মশীল হয়ে উঠে সেই জন্যই এই বিধান। কথায়
কথায় মানুষ মানুষকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেই এবং মশা-মাছির মতো হত্যা করে, সামান্য
স্বার্থের জন্যে। অন্তরে সামান্য বোধশক্তি থাকলেই এই হত্যা হানাহানি মানব সমাজ
থেকে চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। কেউ যেন এই আয়াত স্বল্প মূল্যে ক্রয় না করে।
কোটি কোটি মানুষ পবিত্র কুরআনের আশ্রয়ে থেকেও এই সব মহামূল্যবান আয়াত স্বল্প
মূল্যে ক্রয় করে প্রতিনিয়ত বোধশক্তিহীন হিংস্র পশুতে পরিণত হয়ে চলেছে—তা সারা
বিশ্বের মানব জাতি প্রতিদিন দেখছে।
১৮০) তোমাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের
মধ্যে যখন কারও মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং যদি ধন সম্পত্তি রেখে যায়, তবে পিতা- মাতা ও
আত্মীয়- স্বজনের জন্য অসিয়ত করার ( ন্যায়সঙ্গত বন্টনের) বিধান দেয়া হল। সাবধানীদের
পক্ষে এটা অবশ্য পালনীয়।
মর্মার্থঃ—এই পৃথিবীর স্থাবর- অস্থাবর কোন
সম্পত্তির স্থায়ী মালিক কোন মানুষই হতে পারে না। তাই মৃত্যুর আগেই সমস্ত স্থাবর-
অস্থাবর সম্পত্তি সৎ পাত্রে দান করার জন্যে এই আয়াত। যাতে মৃত্যুর পর এসব সম্পত্তি
নিয়ে কোন অশান্তির সৃষ্টি না হয় পরিবারে- সমাজে ও রাষ্ট্রে। বেশীর ভাগ পরিবারে-
সমাজে- রাষ্ট্রে সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে চির- অশাস্তি লেগেই থাকে, এর ফলে
প্রতিদিন হাজার-হাজার নরহত্যার লীলা দেখে বিশ্ববাসী। যদি মানুষ নিজের মৃত্যুর আগেই
বুঝতে সক্ষম হয় যে এই পৃথিবী কারো স্থায়ী বাসভূমি নয়, আর এখানকার বিষয়-আসয় কিছুই
তার নিজের নয়, তবেই সে সাবধানী হয়ে সত্যজ্ঞানে ভরপুর হয়ে যাবে এবং সমস্ত অশাস্তির
আগুন নিভিয়ে দিয়েই সে মৃত্যুকে বরণ করবে, পরকালের জীবনের জন্যে, এক অনাবিল আনন্দময়
জগত রচনা করে দিয়ে এই পৃথিবীর পরিবেশে।
১৮১) অতঃপর এ (বিধান) শোনার পরও যে এটিকে
পরিবর্তন করে, তবে যে পরিবর্তন করবে তার উপরেই অপরাধ বর্তাবে। নিশ্চয়, আল্লাহ
সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
মর্মার্থঃ—পূর্ববর্তী আয়াতের বিধান শোনার পরেও
যদি মানুষ বিষয় সম্পত্তি নিয়ে, পরিবার- সমাজ- রাষ্ট্রে অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি
করে তবে তো তাদের উপরেই সমস্ত অপরাধ বর্তাবে। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর সর্বশ্রোতা ও
সর্বজ্ঞ, তার কাছে কোন কিছুই লুকাবার পথ নেই, তিনি অপরাধীকে শাস্তি দিতে সিদ্ধহস্ত। আল্লাহ্র এই সত্য আয়াত শোনার পরেও কেনো—বিশ্বের বুকে বিষয় –
সম্পত্তি নিয়ে রাষ্ট্রে – রাষ্ট্রে অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হচ্ছে ও নরহত্যার
মিছিল চলছে? বিশ্বের বুকে কি একজনও বোধশক্তিসম্পন্ন
মানুষ নেই?
১৮২) তবে যদি কেউ
অসিয়তকারীর ( সম্পত্তি বন্টনের নির্দেশদাতার) পক্ষপাতিত্ব অথবা অন্যায়ের আশংকা
করে, অতঃপর সে তাদের পরস্পরের মধ্যে ( কিছু রদ বদল করে) সন্ধি করে দেয়, তবে তার
কোন দোষ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্
বা ঈশ্বর, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু হয়ে বিবেকবান ও বোধশক্তিপরায়ণ ব্যক্তির হৃদয়ে
জাগ্রত থাকেন। পরিবার- সমাজ- রাষ্ট্রের দায়িত্ব এদের হাতে থাকলে পক্ষপাতিত্ব অথবা
অন্যায়ের কোন আশংকা থাকে না উত্তরপুরুষদের জন্যে। কিন্তু যদি দেখা যায় এসব পার্থিব
জগতের তুচ্ছ সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্ব অথবা অন্যায়ের আশংকা স্থান
পেয়েছে পবিবার- সমাজ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তবে বিবেকবান ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ যদি
পরস্পরের মধ্যে কিছুটা রদবদল করেও সন্ধি স্থাপন করে শান্তি চুক্তি করে নেই এতে কোন
দোষ হয় না। বরঞ্চ এসব সৎ কাজ পুণ্যের বলে বিবেচিত হয়।
১৮৩) হে বিশ্বাসীগণ!
তোমাদের জন্য সিয়ামের ( রোযার) বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে
দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা আত্মরক্ষা করতে পার।
মর্মার্থঃ— মানবসত্তাকে সদায় পার্থিব জগতের
সম্পদ মুখী দেখে আল্লাহ্ এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। সিয়াম বা রোজার বিধান হচ্ছে সদায়
আল্লাহ্র সমীপে আল্লাহ্ মুখী বা সত্যমুখী হয়ে সূর্যমুখী ফুলের ন্যায় অবস্থান
করার অভ্যাস আয়ত্ত করার বিধান। সূর্যমুখী ফুলের মুখ, সূর্য যখন আকাশের যেকোনে বা
দিকে অবস্থান করে, তখন সেই দিকেই তার মুখ প্রকৃতির নিয়মে চলে যায়। মানবাত্মা অনন্ত
চৈতন্যময় সত্তার সাথে যুক্ত এক প্রাণময় সত্তা। এই সত্তার মুখ বা চেতনা কেনো তবে
তার প্রতিপালক মুখী হবে না? নিশ্চয় মানব সত্তা সূর্যমুখী ফুলের থেকে বেশী
চৈতন্যময়। এই রোজার বিধান মান্য করে মানব সত্তা এই জগতে চললে, সে স্বভাব গুণে
সত্যমুখী হয়ে উঠবে এবং এই বিধান বিশাল আত্মরক্ষার অস্ত্র স্বরূপ অবতীর্ণ হয় মানব
জাতির জন্য।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment