Monday, 16 July 2018

কুরআন সুরা--২ আল_ --বাকারা ২৪৯ থেকে ২৫৩ আয়াত

      বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা—২৪৯ থেকে ২৫৩ আয়াত।]
   ২৪৯) অতঃপর তালুত যখন সসৈন্যে অভিযান করল, তখন সে বলল, আল্লাহ্‌ একটি নদী দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন। অতএব যে উক্ত নদী থেকে পানি পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়, এবং যে ঐ পানি পান করবে না, সে আমার দলভুক্ত। এ ছাড়া যে কেউ তার হাত দিয়ে এক কোষ পানি গ্রহণ করবে সে ও। কিন্তু (যখন তারা নদীর কাছে হাজির হল) তখন তাদের অল্প সংখ্যক ব্যতীত অধিকাংশ লোকই তা থেকে পানি পান করল। যখন সে (তালুত) ও তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ সেটা (নদী) অতিক্রম করল, তখন তারা বলল, আমাদের শক্তি ও সাধ্য নেই যে, আজ জালুত ও তার সৈন্য সামন্তের সাথে জেহাদ করি। কিন্তু যাদের প্রত্যয় ছিল যে, আল্লাহ্‌র সাথে তাদের সাক্ষাৎ ঘটবে, তারা বলল, আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে কত ক্ষুদ্র দল বৃহৎ দলকে পরাজিত করেছ! এবং আল্লাহ্‌ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।
    মর্মার্থঃ—এই জগতের বুক দিয়ে দুটি নদী প্রবাহিত হয়ে চলেছে অনন্তকাল ধরে একটি অমৃতধারার অপরটি গরলধারার। তালুত মানুষকে গরলধারার নদী থেকে জল পান করতে নিষেধ করেন, আল্লাহ্‌র নির্দেশক্রমে। কিন্তু যারা সংসারী জীব তারা গরলধারার নদীর জল পান করতেই ভালবাসে, তারা জেহাদের জন্যে জীবনকে পবিত্রধারার সাথে যুক্ত করতে চায় না। তালুত হচ্ছে আল্লাহ্‌ মনোনীত মানব জাতির অন্তরের রাজা আর জালুত হলো মানব জাতির অন্তরের শয়তানের রাজা। দুই রাজাতে জেহাদ হয়ে চলেছে প্রকৃতির নিয়মে নিজেদের প্রজাদেরকে রক্ষা করার জন্যে। তালুতের সৈন্য সংখ্যা যতই কম হোক না কেন তারা সকলেই ধৈর্যশীল, আর ধৈর্যশীলদের সাথেই আল্লাহ্‌ থাকেন, তাই তাদের জয়  সর্বত্র।
২৫০) তারা যখন (জেহাদার্থে) জালুত ও তার সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হল, তখন তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ধৈর্য দান কর, আমাদের পা অবিচলিত রাখ এবং অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য কর।
   মর্মার্থঃ—যখন বিশ্বাসীরা যারা তালুকের পক্ষ নিয়ে, জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধে সত্যস্তম্ভের উপর গিয়ে দাঁড়ালো, তখনি বিভিন্ন দিক থেকে জালুতের সৈন্যবাহিনীরা তাদের সামনে বিভিন্ন চাকচিক্যময় অস্ত্র- সস্ত্র নিয়ে তাদেরকে মোহিত করার জন্য ছুটে এলো। এই সময়ে সত্যমুখী তালুকের সৈন্যদল ধৈর্য দান করার জন্য এবং সত্যস্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে তাদের পা অবিচলিত রাখার জন্য আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা করতে লাগলো। অবিশ্বাসী, অজ্ঞ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জেদাহ করেই মানুষকে সত্যজ্ঞানে জ্ঞানী হতে হয়। আল্লাহ বা ঈশ্বর সত্যজ্ঞানীদের সাথে থাকেন ও তাঁদেরকে সবদিক থেকে সাহায্য করেন।
   ২৫১) সুতরাং তখন তারা আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় তাদের পরাজিত করল, এবং দাউদ জালুতকে বধ করল, এবং আল্লাহ্‌ তাকে রাজত্ব ও জ্ঞান বিজ্ঞান দান করলেন, এবং যা তিনি ইচ্ছা করলেন তা তাকে শিক্ষা দিলেন। আল্লাহ্‌ যদি মানব জাতির একদলকে অন্য দলের দ্বারা দমন না করতেন, তবে নিশ্চয় পৃথিবী কলুষিত হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ্‌ বিশ্বজগতের প্রতি মঙ্গলময়।
    মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বর বিশ্বজগতের প্রতি মঙ্গলময়। তিনিই পৃথিবীকে কলুষিত মুক্ত করে রাখার জন্য এই জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধের বিধান দেন। একদল এই পৃথিবীকে আবর্জনায় ভরবে অন্য দল তা পরিষ্কার করবে নচেৎ এ পৃথিবীর পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। একদল মিথ্যার যাদু দেখিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করবে, অন্যদল সত্যের মহিমা দিয়ে মানুষকে সৎকর্মশীল রূপে গড়ে তুলবে। সত্যকে দিয়েই মিথ্যাকে দমন করতে হয়। তালুক যখনি জালুককে হত্যা করল, তখনি আল্লাহ তাঁকে রাজত্ব ও জ্ঞান- বিজ্ঞান দান করলেন। আল্লাহ্‌র রাজত্ব ও জ্ঞান- বিজ্ঞান লাভ করলেই মানুষের জ্ঞান চক্ষু খুলে যায়, তখন সে দেখতে পায়, মানুষ সহ প্রতিটি জীব ও বস্তু নিজ নিজ স্বভাব অনুসারে কাজ করে চলেছে, কেউ নিজের ধর্ম অনুসারে পৃথিবীকে আবর্জনায় পূর্ণ করছে, কেউ নিজের ধর্ম অনুসারে সেই আবর্জনা পরিষ্কার করছে। মানুষের মধ্যেও সদায় দুই দলের রাজা বা নেতা দেখা যায়, একদল এই পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়ে প্রবৃত্তিমার্গের পথে আহ্বান করে, অপর দল পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য মানুষকে নিবৃত্তিমার্গের পথে আহ্বান করে। বিশাল কর্মযজ্ঞের বিরাম নেই, এই কর্মযজ্ঞের হোতায় হচ্ছেন সবার প্রতিপালক, তিনি আল্লাহ্‌, ঈশ্বর, গড, পরমেশ্বর প্রভৃতি নাম নিজে মানুষের অন্তরে বাস করছেন।
 ২৫২) এসব আল্লাহ্‌র নিদর্শন; যা আমি সঠিকভাবে তোমাকে পড়ে শোনাচ্ছি এবং নিশ্চয় তুমি রসুলগণের অন্যতম।
  মর্মার্থঃ—মানুষ সবথেকে বেশী কথা বলে নিজের মনের সাথে। এর পিছনে মানুষকে পবিত্র ও সত্যজ্ঞানী করে তোলার এক মহাশক্তি কাজ করে। নিজের মনের সাথে কথা বলতে গিয়ে মানুষের অনেক ধর্মগ্রন্থের কথাও শোনা হয়ে যায়, ধৈর্য সহকারে মানুষ যখন চিন্তা করে ও নিজের মনের সাথে কথা বলে তখন অনেক মহাত্মা, অনেক ফিরিশিতা বা দেবতা তার অন্তরের সাথে যুক্ত হয়ে আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বরের অনেক নিদর্শন তার সামনে হাজির করেন। মানুষ এইভাবে নিজের অন্তরের দিব্যশক্তির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে রসূলগণের মধ্যে অন্যতম হতে পারে, যেভাবে পূর্ববর্তীগণ মানুষের মধ্যে থেকেই রসূলরূপে মনোনীত হয়েছিলেন।
 ২৫৩) এ রসূলগণ, তাদের মধ্যে কাকেও কারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাদের মধ্যে কারও সাথে আল্লাহ্‌ কথা বলেছেন, আর কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। মারইয়াম পুত্র ঈসাকে আমি প্রকাশ্য প্রমাণ দান করেছি এবং তাকে পবিত্র আত্মা ( জিব্রাঈল ফিরিশতা) দ্বারা শক্তিশালী করেছি। এবং যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করতেন, তবে তাদের নিকট প্রকাশ্য প্রমাণ আসার পরে তারা পরস্পরে ঝগড়া বিবাদ (যুদ্ধ) করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে মতভেদ ঘটল, ফলে তাদের কিছু ( লোক) বিশ্বাস করল এবং কিছু লোক অবিশ্বাস করল। আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে তারা যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হত না, কিন্তু আল্লাহ্‌ যা ইচ্ছা তা করেন।    
   মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বরের ইচ্ছা ব্যতিরেকে কোনকিছু ঘটনা ঘটতে পারে না। লক্ষ লক্ষ রসূল আসেন এই পৃথিবীর বুকে তাঁর ইচ্ছায় এবং তাঁর ইচ্ছানুসারে কাজ করে পুনঃ চলে যান নিজের ধামে। তাঁরা কেউ নিজের নাম প্রতিষ্ঠার জন্য বা নিজে ইবাদত বা পূজা পাবার জন্য আসেন না। কেবল আল্লাহ্‌র নির্দেশে সত্যবাণী তুলে ধরেন মানব সমাজে। আল্লাহ্‌ বা ঈশ্বর তাঁদের হৃদয়ের সাথে বিভিন্ন ফিরিশতাদের আত্মা বা দেবাত্মাদের যুক্ত করে দেন, তাঁদেরকে শক্তিশালীরূপে মানব সমাজের বুকে সকলের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরার জন্য।  কিন্তু আল্লাহ্‌র এই শক্তিশালী প্রতিনিধিগণ এসেও সকল মানুষের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠতে পারেন না। এর পিছনেও মহান আল্লাহ্‌র ইচ্ছা কাজ করে। জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ না হয়ে কে নিজ আত্মাকে পবিত্র করবে ও আল্লাহ্‌র সাথে নিজের মনকে যুক্ত করে কথা বলবে এবং তাঁর সাহায্য- সহযোগিতা পেয়ে মুক্ত হবে?
    জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।    

No comments:

Post a Comment