বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা—১৮৯ থেকে ১৯৩
আয়াত।]
১৮৯) লোকে তোমাকে নতুন চাঁদ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে, (কেন তা বাড়ে কমে), বল,
তাহা লোকের (কাজ কারবারের) এবং হজ্বের জন্য সময় নির্দেশক। পিছন দিক দিয়ে ঘরে
প্রবেশ করাতে কোন পুণ্য নেই, কিন্তু পুণ্য আছে কেউ সাবধান হয়ে চললে। অতএব তোমরা
সদর দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ কর, আর তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর, তবেই তোমরা পরিত্রাণ
পাবে।
মর্মার্থঃ—জীবের প্রাণ- মন- আত্মা চাঁদের সাথে যুক্ত, তাই চাঁদের প্রতিটি
তিথির প্রভাব এই পৃথিবীর সকল প্রাণ ও বস্তুর উপর পড়ে। সূর্যের আলো ও তেজ যেমন
প্রতিটি প্রাণ ও বস্তুর উপর ক্রিয়া করে তেমনি চাঁদের কিরণের প্রভাবেই এই পৃথিবীতে
প্রাণের সৃষ্টি হয় আবার প্রাণ শুকিয়ে প্রাণহীন বস্তুতে পরিণত হয়। এই সত্য জেনে
মানুষ যখন মৃত্যুর কথা জেনে- বুঝে সৎ পথে কাজ কারবার করবে তখনি সে হজ্বে যাবার
অধিকার লাভ করবে। তাই চাঁদই হলো মানুষের জীবনের সৎ ও অসৎ, পাপ ও পুণ্যের সময়
নির্দেশক। সত্যকে না জেনে পিছন দিক দিয়ে আল্লাহ্র জ্ঞান- বিজ্ঞানের ঘরে প্রবেশ
করার চিন্তার মধ্যে কোন পুণ্য নেই, পুণ্য আছে সাবধানী বা জ্ঞানীদের চলার পথে। তাই
এই আয়াতে মানুষকে সদর দরজা বা জ্ঞানীদের পথ দিয়ে ঘরে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে।
অন্তরে ভয় না থাকলে কেউ অন্তর্জগতকে শাসন করতে সক্ষম হয় না। আর অন্তর্জগতকে শাসন
করতে না শিখলে কেউ জ্ঞান লাভ করতেও পারে না। মানুষের অন্তর্জগতের অধিকর্তা হলেন
আল্লাহ্ বা ঈশ্বর, এই সত্যকে পূর্ণ বিশ্বাস করে বিশ্বাসী সত্তা হয়ে নিজের
অন্তর্জগতের শত্রুদের সাথে ধর্মযুদ্ধ করতে হবে, এই যুদ্ধে জয়ী না হওয়া পর্যন্ত
কারো পরিত্রাণের উপায় নেই।
১৯০) আর
যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমরাও আল্লাহ্র পথে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ কর,
তবে কারও প্রতি বাড়াবাড়ি করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ বাড়াবাড়িকারীদের পছন্দ করেন না।
মর্মার্থঃ—নিজের অন্তর্জগতের সাথে ধর্মযুদ্ধ করতে গিয়ে বহির্জগতে অনেক
শত্রুর আবির্ভাব দেখতে পাবে। এরাই তোমাকে তোমার অন্তর্জগতের শত্রুদেরও চিনিয়ে দিবে
এবং তাদের সাথেও ধর্মযুদ্ধ করার পথ দেখাবে। ঘরে বাইরে শত্রু, তোমার জীবনকে নাজেহাল
করে দিবে আল্লাহ্র পথে জেহাদ ঘোষণার সাথে সাথে। এই অবস্থায় জেহাদ ঘোষণাকারীকে
কারও প্রতি বাড়াবাড়া করতে আল্লাহ্ নিষেধ করেছেন, তিনি বাড়াবাড়িকারীদের পছন্দ করেন
না। এই সত্য জেনে ধীর- স্থির গতিতে মানুষকে সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে হয়, সত্যমুখী
হয়ে সত্যজ্ঞান লাভ করার জন্য।
১৯১) আর যেখানে পাও, তাদের হত্যা কর এবং
তারা যেখান থেকে তোমাদের বের করে দিয়েছে, তোমরাও সেখান থেকে তাদেরকে বের করে দাও।
ফেৎনা ( দাঙ্গা বা ধর্মদ্রোহিতা) হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর। আর মসজিদুল হারামের
(কা’বা শরীফের) নিকটে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো না, যতক্ষণ না তারা সেখানে
তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তবে তাদের হত্যা
করবে, এটাই অবিশ্বাসীদের পরিণাম।
মর্মার্থঃ—তোমরা যদি সত্যজ্ঞানী, বিশ্বাসী ও সৎ পথের দিশারী হও, তবে যারা
অজ্ঞানী- অজ্ঞ- অবিশ্বাসী তাদেরকে যেখানে পাও হত্যা কর, এর অর্থ সত্যজ্ঞান, অন্তরে
বিশ্বাস ও সৎ পথের দিশারী করে তাদের নব জীবন দান কর। এই আয়াতে হত্যা করার অর্থ নব
জীবন দান করার কথা বলা হয়েছে। ধর্মযুদ্ধ বা জেহাদে মানুষ অংশ গ্রহণ করলেই নব জীবন
লাভ করে। একদল সত্যের পক্ষে থাকে আর একদল সত্যের বিপক্ষে থাকে, ধর্মযুদ্ধ শেষে
সকলেই আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের কৃপা লাভ করে অজ্ঞতার খোলস ত্যাগ করে নব জীবন লাভ
করে। তারা অর্থাৎ অবিশ্বাসী, অজ্ঞানী, অজ্ঞরা কেউ
জ্ঞানের মর্যাদা দিতে জানে না, তাই তারা নিজের ঘর থেকে সত্যজ্ঞান- আল্লাহ্র প্রতি
বিশ্বাস এসবকে নিজের অন্তর ও বাইরের বাসস্থান থেকে বের করে দেয় এবং তাদের ঘরে
বাইরে এমন অন্ধকার পরিবেশ করে রাখে যে, কিছুতেই যেন আলো প্রবেশ করতে না পারে। তাই
এখানে বিশ্বাসী, সত্যজ্ঞানী ও সৎ পথের দিশারীদের বলা হয়েছে, তারা যেখান থেকে
তোমাদের বের করে দিয়েছে, তোমরাও সেখান থেকে তাদেরকে বের করে দাও। এখানে অবশ্যই
মানুষকে জানতে হবে যারা এখন সত্যজ্ঞানী, বিশ্বাসী ও সৎ পথের দিশারী তারাও পূর্বে
সেই অন্ধকার ঘরে ও অজ্ঞানময় পরিবেশেই ছিল, কিন্তু তারা আল্লাহ্র ডাকে সাড়া দিয়ে
সেখান থেকে বের হবার সুযোগ পেয়েছিল। এখন যদি এই সত্যজ্ঞানীরা ধর্মযুদ্ধ করতে এসে
তাদেরকে ঘর থেকে বের না করে দেয় আল্লাহ্র নির্দেশে তবে তারা কেউ নব জীবনের স্বাদ
পাবে না। মানুষকে সৎ, সত্য, সুন্দর ও জ্যোতির্ময় করে গড়ে তোলার জন্য যে ধর্মযুদ্ধ
এর বিরোধীতা করা মানুষকে হত্যা করার পাপ থেকেও গুরুতর বেশী পাপ। এখন কেউ যদি
ধর্মযুদ্ধে সামিল হতে না চায়, পবিত্র নব
জীবন না চায়, তবে তো তার সাথে যুদ্ধ করা যায় না। যদি এই অজ্ঞ, অবিশ্বাসীরা সত্যজ্ঞানীদের
সান্নিধ্যে এসে ধর্মযুদ্ধ করে তবেই তো তাদেরকে হত্যা করে ( অবিশ্বাস, অজ্ঞতা,
অজ্ঞানকে) নব জীবন দান করা সম্ভব হবে, আর যদি না আসে তবে তারা যে তিমিরে ছিল সে
তিমিরেই থেকে যাবে, এটাই তো অবিশ্বাসীদের জীবনের পরিণাম।
১৯২) কিন্তু যদি তারা বিরত হয়, তবে নিশ্চয়ই
আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ বা ঈশ্বর ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু হয়ে মানুষকে ধর্মযুদ্ধে
বা জেহাদে আহ্বান করছেন, এখানে তাহলে নিশ্চয় মানব জাতির মঙ্গল রয়েছে। সত্যজ্ঞান
লাভ করতে গিয়ে যদি এই নশ্বর দেহ চলে যায় তাতেই বা ক্ষতি কি? পুনঃ নব জীবন তো পাওয়া
যাবেই। এই আয়াতে সত্য জানা সত্ত্বেও যারা জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধ থেকে বিরত থাকে, তিনি
তাদের প্রতিও ক্ষমাশীল হয়ে দয়া দেখিয়েছেন।
১৯৩) আর তোমরা তাদের সঙ্গে জেহাদ
করতে থাক, যতক্ষণ না (তাদের) ধর্মদ্রোহিতা দূর হয় এবং আল্লাহ্র দ্বীন (ধর্ম)
প্রতিষ্ঠিত না হয়, কিন্তু যদি তারা বিরত হয়, তবে অত্যাচারীদের উপর ছাড়া ( অন্য
কারো উপর) হস্তক্ষেপ করা চলবে না।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্র দ্বীন বা ধর্ম প্রতিষ্ঠা করায় হচ্ছে মানুষের কর্ম বা
জীবন যুদ্ধ। এই জীবন যুদ্ধকেই জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধ বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ্র দ্বীন
কি? তাঁর দ্বীন হচ্ছে সত্য- সাম্য- ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করে এই পৃথিবীকে
মানুষের মিলনক্ষেত্র- ধর্মক্ষেত্র রূপে ধারণ করে রাখা। মানুষের এই পবিত্র
মিলনক্ষেত্র- ধর্মক্ষেত্রে যখনই অত্যাচারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তখনি জেহাদ বা
ধর্মযুদ্ধের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, মানুষের মানবিক গুণগুলিকে জাগ্রত করে দোষগুলিকে
জ্ঞান অস্ত্রের দ্বারা হত্যা করার জন্য।
জয়
বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment