বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [
সুরা—২ আল- বাকারা—২০৯ থেকে ২১৩ আয়াত।]
২০৯) অতঃপর প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও যদি তোমাদের পদখ্বলন ঘটে, তবে জেনে
রাখো যে, আল্লাহ্ মহা পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।
মর্মার্থঃ—প্রকাশ্য জীবন সত্য নিদর্শন স্বরূপ জীবনে আসার পরও যদি মানুষের
মনের অধঃপতন হতেই থাকে, তবে তারা কিভাবে নিজের জীবনের ইসলাম ধর্ম তথা পবিত্র
জীবনের ধর্মকে রক্ষা করবে? পবিত্র হৃদয় মন্দিরে আল্লাহ্ পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়
হয়ে জাগ্রত থাকেন। যারা সত্যকে বিশ্বাস করে নিজের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষা করে চলে,
আল্লাহ্র পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যাবে এই ভয়ে, তবে তাদের আর কিসের ভয়? তাই মানুষকে
নিজের অধঃপতন রোধ করতে হবে নিজের জ্ঞান- বুদ্ধি- বিবেককে জাগ্রত রেখে, তবেই সে
আল্লাহ্র পরাক্রমময় ও প্রজ্ঞাময় রূপ দেখতে পাবে, নিজের জ্ঞান চক্ষুর মাধ্যমে।
২১০) তারা কেবল এ প্রতিক্ষায় আছে যে, আল্লাহ্
মেঘের ছায়ায় ফিরিশতাগণসহ তাদের কাছে উপস্থিত হবেন, তৎপর সব কিছুর মীমাংসা হয়ে
যাবে। সব বিষয় আল্লাহ্রই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ ও ফিরিশতাগণ সর্বত্র আছেন, সকলের সাথে আছেন, এই সত্যকে অস্বীকার
করে বা অবিশ্বাস করে কেউ নিজের চরিত্রের বা স্বভাবের পরিবর্তন ঘটাতে পারে না।
নিজের স্বভাব যদি আকাশের ন্যায় উদার না হয় তবে কেমন করে সেই উদার প্রকৃতির আল্লাহ্
ও ফিরিশতাগণ মেঘের ছায়া থেকে নেমে আসবেন? তাই তাদের প্রতিক্ষা করাই হবে, তাদের
জীবনের কোন মীমাংসা হবে না ইহলোকে। এ ব্যাপারের সব বিষয় আল্লাহ্র নিকট
প্রত্যাবর্তিত হবে।
২১১) বনী ইস্রাঈলকে জিজ্ঞাসা কর, আমি তাদের কত
স্পষ্ট নিদর্শন প্রদান করেছি। আল্লাহ্র অনুগ্রহ উপস্থিত হবার পর কেউ তা পরিবর্তন
করলে, নিশ্চয় আল্লাহ্ মন্দ কার্য্যের প্রতি ফল দানে কঠোর।
মর্মার্থঃ—বনী ইস্রাঈলদের ন্যায় সুসংবাদ দাতাদের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কত সত্য নিদর্শন মানুষকে সৎ পথের
দিশারী করার জন্য আল্লাহ্ বা ঈশ্বর অনুগ্রহ স্বরূপ প্রেরণ করেন, তা হয়তো সকলের চোখে পড়ে না, কারণ এসব মানুষ চোখ থাকতেও অন্ধ, কান থাকতেও
কালা, মুখ থাকতেও বোবা, মন থাকতেও মানসিক রোগী, বুদ্ধি থাকতেও বুদ্ধিহীন ও বিবেক
থাকতেও বিবেকহীন। এইসব সত্য যেকোন পথেই হোক, তিনি সকল মানুষের কাছে যথা সময়ে পৌঁছে দেন। জীবন সত্য লাভ করার পরেও যদি
কোন মানুষ সেই সত্যকে বিশ্বাস না করে তবে তো সে অবিশ্বাসী ও অজ্ঞ হয়েই চিরকাল থেকে
যাবে। অনেকে সেই সত্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে নিজেদের জীবনের সাথে তা যুক্ত করে, এক
বিভ্রান্তময় পরিবেশের সৃষ্টি করে মানব সমাজে। এই সব মন্দ কাজের ফল কঠোর শাস্তি
রূপে ফিরে আসে তাদের জীবনে, এই সত্য জেনেও অধিকাংশ মানুষ নিজের জীবন সত্যকে বিকৃত
করে, জীবনকে খেল-তামাসার বস্তু ভেবে।
২১২) সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য পার্থিব
জীবন সুশোভিত করা হয়েছে। তারা বিশ্বাসীগণকে ঠাট্টা- বিদ্রূপ করে থাকে, অথচ যারা
সংযত হয়ে চলে শেষ বিচারের দিন তারা ওদের ঊর্ধ্বে থাকবে। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা অশেষ
জীবিকা দান করেন।
মর্মার্থঃ—এই
পার্থিব জগতের জীবনকে সুশোভিত করার জন্য যে যত শয়তানী বুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করবে সে
তত দিনে দিনে এই জগতের সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখতে পারবে। এরা সকলেই
সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী হয়ে নিজদের জীবন এই জগতের আবর্জনায় পরিপূর্ণ করে তোলে এবং
বিশ্বাসীদেরকে ঠাট্টা- তামাসার পাত্র মনে করে এবং তাদের দিকে করুণার দৃষ্টি
নিক্ষেপ করে। বিশ্বাসীগণ তাদের চরিত্রের দিকে চেয়েও দেখে না। আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে
যাকে খুশী প্রচুর সম্পদ দান করতে পারেন, কিন্তু তিনি তা করেন না। বিশ্বাসী, উদার,
সত্যজ্ঞানীদের তিনি এই পার্থিব জগতের আবর্জনা থেকে মুক্ত রাখেন, শেষে উচ্চাসনে
বসাবার জন্য।
২১৩) মানুষ (আদিতে) ছিল একজাতি। ( পরে মানুষেরাই
বিভেদ সৃষ্টি করল) অতঃপর আল্লাহ্ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ
করে; এবং মানুষের মধ্যে যে বিষয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল তার মীমাংসার জন্য তিনি
সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেন। যাদের তা দেয়া হয়েছিল, স্পষ্ট নিদর্শনাদি তাদের নিকট
আসার পর তারা শুধু পরস্পর বিদ্বেষবশত বিরোধিতা করত। অতপরঃ যারা বিশ্বাস করে তারা
যে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করত, আল্লাহ্ তাদের সে বিষয়ে নিজ অনুগ্রহে সত্য পথে
পরিচালিত করেন। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন।
মর্মার্থঃ—মানব জাতির মূল এক। তাই তারা একজাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মানুষই
নিজেদের জ্ঞানের বিস্তার ঘটাতে গিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করে। সকল মানুষের জ্ঞান- বুদ্ধি-
বিবেক সমান নয়, তাই সকলের সাথে মানিয়ে চলা যখনি মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় নি তখনি
বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে ও কর্ম এবং গুণের উপর ভিত্তি করে মানুষকে বিভিন্ন জাতিতে
মানুষই ভাগ করেছে নিজেদের স্বার্থে। যখনি মানুষ সত্যকে ভুলে যায় তখনি অশান্তির
সৃষ্টি হয়। অশান্ত পরিবেশকে শান্ত করে গড়ে তোলার জন্যই হয় নবীদের আবির্ভাব। তাঁরা
এসে মানুষকে সতর্ক করেন সত্য নিদর্শন দাখিল করে, বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থকে সামনে
রেখে। কিন্তু মানুষ সত্যকে জেনেও নিজেদের বিদ্বেষ ভাব বজায় রাখে একে অপরের প্রতি।
এটাও আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের ইচ্ছা, তিনি যাকে মনে করেন তাকেই কেবল সহজ সরল সত্য পথে
নিয়ে যান। যারা একে অপরকে অবিশ্বাসী বলে ও একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ ভাব পোষণ করে
তারা সকলেই সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীর দল। এরা কেউ পবিত্র জীবন লাভ করতে সক্ষম হয় নি
সত্যজ্ঞানের পোশাক পরিধান করে।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment