বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো।[
সুরা—২ আল- বাকারা—২৩৯ থেকে ২৪৩ আয়াত।]
২৩৯) যদি তোমরা (শত্রুর) আশংকা কর, তবে পথচারী অথবা আরোহী অবস্থায়, (নামাজ
পড়বে), পরে যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন আল্লাহ্কে স্মরণ করবে, যেভাবে তিনি
তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা (পূর্বে) জানতে না।
মর্মার্থঃ—অধিকাংশ মানুষ জীবন পথে চলতে গিয়ে, সদায় নিজের ক্ষতির আশংকা করে। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর বিশ্বাসীদের, জীবন তো তাঁর জীবনের সাথে যুক্ত। তাহলে এই
অমূলক জীবনের ভয় কেন? তাই এই আয়াতে মানুষের অন্তরের দুর্বলতাকে পরিহার করে সদায়
নিজেকে নিরাপদ অবস্থায় আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের আশ্রয়ে সে রয়েছে, এই বিশ্বাস স্থাপন
করার জন্য উপদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হয়ে যারা তাঁর
আশ্রয়ে থাকে, তারা কখন কোন অবস্থাতেই শত্রুভয় বা মৃত্যুভয় করে না, তারা আল্লাহ্
ছাড়া কাউকে ভয় করে না, তাই তারা কোনোরূপ জীবনের আশংকা করে না, এই শিক্ষায় তিনি
মানব জাতিকে দিয়েছেন, যা তারা পূর্বে জানতো না।
২৪০) এবং তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে
মারা যায়, তারা তাদের স্ত্রীদের জন্য এই অসিয়ত করবে যে, তাদের যেন এক বছর পর্যন্ত
ভরণপোষণ দেয়া হয় এবং গৃহ থেকে বের করে দেয়া না হয়, কিন্তু যদি (স্বেচ্ছায়) তারা
বেরিয়ে যায় তবে নিয়মমত তারা নিজেদের জন্য যা করবে তাতে তোমাদের কোন পাপ নেই।
আল্লাহ্ পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।
মর্মার্থঃ—এই পৃথিবী নারী- পুরুষ সকলের কর্মভূমি ও জ্ঞানপীঠ। এখানে সকলকেই
জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধের মাধ্যমে নিজের জীবন রক্ষা করতে হয়। এই যুদ্ধ থেকে পলায়ন
করলেই মৃত্যুর ন্যায় পাপ তাকে আক্রমণ করে। এখন এই ধর্মযুদ্ধ করতে গিয়েও অনেককেই
দেহত্যাগ করতে হয় প্রকৃতির নিয়মে, শত্রুদের কাছে পরাজিত হয়ে। এই অবস্থাতেও তারা
যাতে নিজের ধর্ম রক্ষা করে তাদের স্ত্রীদের জীবন সুরক্ষিত রাখতে পারে এবং তারা
স্ত্রীদের পাপ থেকে মুক্ত রেখে যেতে পারে সে জন্যই এই জ্ঞানের আয়াত অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ্
পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময় হয়ে সদায় জ্ঞানীদের সাথে থাকেন ও তাদেরকে সঠিক পথে
পরিচালিত করেন।
২৪১)
এবং তালাকপ্রাপ্ত নারীও উত্তমরূপে ভরণপোষণ পাবে, সাবধানীদের জন্য এটা অবশ্য
কর্তব্য।
মর্মার্থঃ—উত্তমরূপে ভরণপোষণ বলতে কেবল বাহ্যিক জগতের সুখ- সাচ্ছন্দময়
জীবনকেই এখানে তুলে ধরা হয়নি। আসল জীবন মানুষের অন্তরে, সেই অন্তরের পবিত্রতায়
হচ্ছে উত্তমরূপে ভরণপোষণ। মানুষের জীবনে যে দুঃখময় ঘটনাগুলি আসে তা তো মানুষকে
জ্ঞান দিয়ে পবিত্র করে তোলার জন্যে। বিচ্ছেদ হচ্ছে মহামিলনের সুর, এক স্বামীর সাথে
বিচ্ছেদ ঘটলো, আর আসল স্বামীর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল
পবিত্র ভরণপোষনের মাধ্যমে। জ্ঞানী ও সাবধানীগণ একবার আবর্জনার বোঝা মাথা থেকে
নামিয়ে ফেলতে পারলে আর দ্বিতীয় বার সেই বোঝা মাথায় তোলে না।
২৪২)
এভাবে আল্লাহ্ তাঁর সকল নিদর্শন স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।
মর্মার্থঃ—দুদিনের মানব জীবনকে যদি মানুষ অপবিত্র করে তোলে তবে কিভাবে তারা
পবিত্রতার স্বাদ পাবে? আল্লাহ্ মানুষের জন্য তাঁর সকল নিদর্শন থরে থরে সাজিয়ে
রেখেছেন চোখের সামনে, যাতে মানুষ সহজেই বুঝতে পারে এবং নিজেকে মৃতদের থেকে আলাদা
করে আল্লাহ্র বান্দা রূপে সরিয়ে রাখতে পারে ও নিজেকে উপলব্ধি করতে পারে তাঁর
চিরকালীন সহচররূপে।
২৪৩) তুমি কি তাদের দেখনি, যারা মৃত্যুভয়ে
হাজারে হাজারে আপন ঘর বাড়ি পরিত্যাগ করেছিল? অতঃপর আল্লাহ্ তাদের বলেছিলেন,
তোমাদের মৃত্যু হোক। পরে তাদের জীবিত করলেন। নিশ্চয়, আল্লাহ্ মানুষের প্রতি
অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনা।
মর্মার্থঃ—মানুষ নিজের দেহ বিনাশের ভয়ে বা মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে আপন ঘর বাড়ি পরিত্যাগ
করে অর্থাৎ স্বধর্ম পরিত্যাগ করে ধর্মহীন হয়ে পড়ে। এখানে আপন ঘর বাড়ি বলতে বুঝানো
হয়েছে মানুষের অন্তর্জগতের সম্পদ জ্ঞান- ভক্তি- শ্রদ্ধা- বিশ্বাস- সততা ইত্যাদি
গুণ, যাদের আশ্রয়ে মানুষের মন- বুদ্ধি-বিবেক-চিত্ত ও অহংকার বাস করে। মৃত্যুভয়ে
মানুষ নিজের এই মানবিক গুণগুলি পরিত্যাগ করলেই গৃহহীন হয়ে পড়ে, তখন এরা সকলেই
আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের কাছে মৃত সত্তা। আল্লাহ্ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; তাই তিনি
মৃতদেরকে বার বার জীবিত করেন ও সুযোগ দেন নিজের গুণের প্রকাশ- বিকাশ ঘটাবার।
কিন্তু অধিকাংশ লোক অকৃতজ্ঞ, তারা সামান্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করতে জানে না।
জয়
বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment