বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২
আল- বাকারা—১৯৯ থেকে ২০৩ আয়াত।]
১৯৯) অতঃপর অন্যান্য লোক যেখান থেকে ফিরে, সেখান থেকেই( তওফের জন্য বা
প্রদক্ষিণের জন্য) ফিরে চল। আর আল্লাহ্র কাছে মার্জনা চাও, বস্তুত আল্লাহ্
মার্জনাকারী, পরম দয়ালু।
মর্মার্থঃ—মানুষ কতদিন অন্ধকারে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে? যখন তার
অন্তরে জ্ঞানের উদয় হয়, বিবেক জাগ্রত হয়, তখনি তারা সেই পাপ ও অজ্ঞতার নাগপাশ থেকে
মুক্ত হবার জন্য মুখ ফিরিয়ে সত্যমুখী হয়ে সত্যজ্ঞানের স্তম্ভকে ঘিরে প্রদক্ষিণ
করতে থাকে পাপরাশি চক্রকে পুড়িয়ে ফেলার জন্য। জ্ঞানীরা এই সত্যকে জেনে পাপের পথে
না গিয়ে তাদের সাথেই সত্যজ্ঞান স্তম্ভকে( আল্লাহ্কে ) ঘিরে আল্লাহ্র স্তব-
স্তুতি করতে করতে তা প্রদক্ষিণ করে, তারা জানে যে আল্লাহ্ মার্জনাকারী ও পরম
দয়ালু। কেউ যদি একবার তাঁর সান্নিধ্যে আসে তবে সে যতই পাপী থেকে পাপীতর হোক না
কেন, সে সব পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।
২০০) অতঃপর যখন তোমরা (হজ্বের) অনুষ্ঠানাদি
সম্পন্ন করে নেবে, তখন আল্লাহ্কে এমনভাবে স্মরণ করবে, যেমন তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষকে
স্মরণ করতে, অথবা তদপেক্ষা গভীরভাবে। এমন কিছু লোক আছে যারা বলে, হে আমাদের
প্রতিপালক! আমাদের ( যা কিছু দিতে হয়) পৃথিবীতেই দাও। বস্তুত তাদের জন্য পরকালে
কোন অংশ নেই।
মর্মার্থঃ—হজ্ব করতে গিয়ে পার্থিব জগতের সুখ কামনা করা, এ একটা মনের রোগ।
মানুষ তীর্থ করতে যায় নিজের জীবনকে তীর্থের সাথে বিনিময় করে নিজে তীর্থ হয়ে উঠার
জন্যে। হজ্বে গিয়ে মানুষকে ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠান করতে হয়। এগুলো শেষ হলে আল্লাহ্কে স্মরণ করতে হয়, অতি আপনজন ও নিজের আত্মীয় ভেবে। বিশ্ব আত্মার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে
তুলতে না পারলে আত্মার সংকীর্ণতা দূর হয় না। তাই এই আয়াতে আল্লাহ্কে স্মরণ করতে
বলা হয়েছে পিতৃপুরুষদের যেমন গভীরভাবে স্মরণ করা হয়ে থাকে ঠিক তেমন ভাবে বা তার
থেকেও গভীরভাবে।
২০১) এবং তাদের মধ্যে( এমন কিছু লোক আছে)
যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দাও এবং পরকালেও কল্যাণ দাও
এবং আমাদের জাহান্নামের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।
মর্মার্থঃ—মানুষের জ্ঞান কম হলে, বিশ্বাসও টলমলে হয়। এই সব মানুষ উভয়কুল
রক্ষা করতে গিয়ে কোন কুলই রক্ষা করতে পারে না। আল্লাহ্র আশ্রয়ে থেকে যারা তাঁর
সাথে নিজের জীবন বিনিময় করে নিয়েছে, তাদের তো চাওয়া- পাওয়ার কোন হিসেব থাকে না।
আল্লাহ্ বা ঈশ্বর যেখানে সে সেখানেই, তাই তার কাছে সব জায়গায় কা’বার ন্যায় পবিত্র
তীর্থ স্থান হয়ে যায়। তারা জান্নাতের সুখও যেমন কামনা করে না তেমনি জাহান্নামের
যন্ত্রণাকেও ভয় করে না, তারা কেবল আল্লাহ্কে ভয় করে।
২০২) তারা যা অর্জন করেছে তার প্রাপ্য অংশ
তাদেরই। বস্তুত আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।
মর্মার্থঃ—এই কর্মভূমি ও জ্ঞানপীঠে এসে যে যা অর্জন করবে, সে তাই পরকালের
জন্য সঞ্চয় করে রাখবে ও সেখানে গিয়ে তা পেয়ে যাবে। এখানে কেউ পিছন দরজা দিয়ে সঞ্চয়কৃত ধনদৌলত পাঠাতে পারবে না। আল্লাহ্র হিসাবে কোন
ভুল হয় না, তিনি হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর, তা মনে রেখে ও বিশ্বাস করেই মানুষকে
সৎ ও পুণ্যের কাজে মতি দিতে হয়।
২০৩) তোমরা নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনগুলোতে (মিনা
অবস্থানকালে যিলহজ্ব মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ এ তিন দিন) আল্লাহ্কে স্মরণ কর, আর
যদি কেউ তাড়াতাড়ি করে দুই দিনেই চলে আসে, তবে তার কোন পাপ নেই। আর যদি বিলম্ব করে
তবে তারও কোন পাপ নেই। এ (নিয়ম) তার জন্য, যে সাবধানে চলে। তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, তোমাদেরকে তাঁর কাছে একত্র করা হবে।
মর্মার্থঃ—ধীর- স্থির চিত্তে পবিত্র স্থানে বসে নিজের প্রতিপালকের পবিত্র
নাম মনে মনে নিলেই মানুষের গতি বেড়ে যায় এবং মুহূর্তে সে নিজ প্রতিপালকের ঘরে
পৌঁছে যায়। পবিত্র দিন ও পবিত্র সময়ের সাথে মানব আত্মার একটা সুসম্পর্ক রয়েছে, এই
সব দিনে আল্লাহ্ - এর নাম স্মরণ করা মাত্র তিনি সেই আত্মার সাথে যুক্ত হয়ে যান
এবং সেই আত্মাকে পবিত্র করে তোলেন। এখানে অর্থাৎ পবিত্র হজ্ব তীর্থে এসে যে যেভাবে
খুশী তাঁর নাম স্মরণ করতে পারে এতে কোন পাপ- পুণ্যের ব্যপার থাকে না। আসল কথা হলো আল্লাহ্কে
ভয় করে যে যত অন্তর্জগতকে শাসন করে পবিত্র হতে পারবে এই পার্থিব জগতের আবর্জনা
থেকে সে তত তাড়াতাড়ি সত্যজ্ঞান লাভ করে আল্লাহ্র প্রিয়পাত্র হয়ে উঠবে। এইভাবে
একদিন সকলকে আল্লাহ্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঘরে একত্রিত করা হবে পবিত্র করে তুলে নিয়ে
সত্যজ্ঞানের দ্বারা।
জয়
বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment