বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [
সুরা—২ আল—বাকারা- ২১৪ থেকে ২১৮ আয়াত।]
২১৪) তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও পূর্বে যারা গত
হয়েছে তাদের অবস্থা এখনও তোমাদের নিকট পৌঁছায়নি। অর্থসংকট ও দুঃখ দারিদ্র্য তাদের
স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল এবং ( এতদূর বিচলিত হয়েছিল যে,) রসূল
ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহ্র সাহায্য কখন আসবে? জেনে
রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্র সাহায্য নিকটবর্তী।
মর্মার্থঃ—এই জ্ঞানপীঠ বড়ই পবিত্র আবার বড়ই নিষ্ঠুর, এখান থেকে কেউ পিছন
দরজা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে জান্নাতের সুখ ভোগ করার সুযোগ পায় না। এখানে যে মানুষকে কত
জনার কাছে কত রকম পরীক্ষা দিয়ে জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে হয় তার হিসেব নেই।
পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ক্ষুধা- তৃষ্ণা – দুঃখ – দারিদ্র- অসুখ- বিসুখ- প্রাকৃতিক
বিপর্যয় প্রস্তুত থাকে। তাছাড়া তো শয়তানদের উপদ্রব লেগেই
থাকে। তোমরা ভাবছো এসব পরীক্ষায় পাশ না করেই ডিগ্রিবিহীন জান্নাতে চলে যাবে? তোমাদের আগের লোকদের অবস্থার কথা চিন্তা কর, তারা কিভাবে
এই জ্ঞানপীঠ ও কর্মভূমিতে কষ্ট স্বীকার করেছিল এবং আল্লাহ্র কৃপার জন্যে অপেক্ষা
করছিল। আল্লাহ্র সাহায্য নিকটেই দেখতে পাবে যখন তোমরা তাঁকে নিকটের আত্মীয় করে
নিবে। পিতা- মাতা যেমন ছেলে- মেয়ের কষ্ট দেখতে পারে না, তেমনি তিনিও তাঁর
বান্দাদের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না। তোমরা কি তাঁকে পিতা- মাতার ন্যায় নিকট আত্মীয়
করে নিজের সত্য মন্দিরে (ঘরে) স্থান দিয়েছো?
২১৫)
তারা তোমাকে প্রশ্ন করে, তারা কী জিনিস দান করবে? বল, তোমরা যা খরচ কর, তা
পিতামাতা, আত্মীয় স্বজন, অভাবগ্রস্থ, পিতৃহীন এবং প্রবাসীদের জন্য। আর তোমরা যে
কোন সৎকাজ কর না কেন, আল্লাহ্ তা ভালভাবে জানেন।
মর্মার্থঃ—এখানে মনে রাখতে হবে পিতামাতা, আত্মীয় স্বজন, অভাবগ্রস্থ,
পিতৃহীন, অতিথি বা প্রবাসী সকলের সেবা করা বা তাদেরকে দান করার মাধ্যমেই আল্লাহ্র
সেবা করা ও তাঁকে দান করা হয়ে যায়। তাদের থেকে আল্লাহ্কে আলাদা ভাবলেই অংকের
খাতায় আর অংকের উত্তর কোন সূত্র ধরে করেও মিলাতে পারবে না। তোমরা প্রচারের মাধ্যমে
সৎ কাজ কর আর না কর, অন্তরের ভালবাসা দিয়ে যা কর তার খবর সাথে সাথে আল্লাহ্র কাছে
পৌঁছে যায়। তিনি সবার কাজের হিসেব রাখেন, তাই তাঁকে ফাঁকি দিয়ে কে নিজের ধর্মকে
রক্ষা করবে? নিজের মানবিক গুণের দিকগুলির প্রতি লক্ষ্য রেখে যত সৎ কাজ করবে ততই
তুমি নিজের আল্লাহ্কে তোমার সত্য মন্দিরে বা মসজিদে দেখতে পাবে এবং তাঁর দেওয়া
সম্পদ দান করে শেষ করতে পারবে না।
২১৬)
তোমাদের জন্য জেহাদের বিধান দেয়া হল। যদিও তা তোমাদের কাছে অপছন্দ; কিন্তু তোমরা
যা পছন্দ কর না সম্ভবত তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর সম্ভবত তা
তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ্ জানেন, তোমরা জান না।
মর্মার্থঃ—ধীর- স্থির চিত্তে সত্যকে জেনে সত্যকে মানব সমাজে প্রতিষ্ঠা করার
সংগ্রাম হচ্ছে জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধ। এই বিধান প্রাচীন, চাকচিক্যময় এই জগতে মানুষ
নিজের হৃদয়- মন্দিরকে সত্য মন্দিরে পরিণত করার জন্য জেহাদ বা ধর্ম যুদ্ধকে পছন্দ
করে না। এই জগতের সুখ- স্বাচ্ছন্দ প্রতিটি মানুষ কামনা করে। এই কামনা –বাসনার
আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তারা নিজের সৎ- সত্য- সুন্দর ও জ্যোতির্ময় হৃদয় মন্দিরকে
আবর্জনায় পরিপূর্ণ করে তোলে। ফলস্বরূপ আর নিজের জীবন সত্য, জীবন দর্শন, নিজের
স্বচ্ছ জীবন দর্পণে দেখতে পায় না। মানুষ নিজের জীবনের জন্য যা কল্যাণকর তা কিছুতেই
করতে চায় না, আর যা অকল্যাণকর সেই কাজে প্রবৃত্তি বশে ঝাপিয়ে পড়ে পদে পদে অশান্তি
সৃষ্টি করে নিজেদের অমঙ্গল নিজেরাই ডেকে আনে। ধর্মযুদ্ধ বা জেহাদে অংশ গ্রহণ না
করলে কেউ নিজের জীবন পবিত্ররূপে ধরে রাখতে সক্ষম হয় না এবং নিজের ধর্মও রক্ষা করতে
পারে না, তাই এই জগতের অধিকাংশ মানুষ ধর্মহীন হয়ে জীবন কাটাই ও পরিশেষে নরক ভর্তি
করার জন্যে এগিয়ে যায়। এই সত্য কেবল মানুষের অন্তরের আল্লাহ্ বা দেবতা জানেন,
দেহধারী অহংকারী ধর্মহীন মানুষ জানে না।
২১৭) পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে
তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, বল, সে সময় যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। তারা সর্বদা তোমাদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে, যে পর্যন্ত তোমাদের (সুপ্রতিষ্ঠিত) ধর্ম থেকে
তোমাদেরকে ফিরিয়ে না দেয়, যদি তারা সক্ষম হয়। তোমাদের মধ্যে যে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ
করে এবং সে সত্যপ্রত্যাখ্যানকারীরূপে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তাদের ইহকাল ও পরকালের
কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায় এবং এরাই জাহান্নামবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
মর্মার্থঃ—স্থান- কাল- পাত্র ভেদে এই বিশ্বে সবার জীবনে পবিত্র মাস
প্রকৃতির নিয়মে ঘুরে ঘুরে আসে। এই পবিত্র মাসে মানুষকে ধীর- স্থির চিত্তে নীরবে-
নিরালায়- নির্জনে কেবল নিজের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে হয় সত্যকে
অন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে। এই সময় মানুষের বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে
কেবল অন্তর্জগতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে যে যত এই
পবিত্র মাসে অন্তর্জগতকে শাসন করে আলোর অভিমুখে এগিয়ে যাবে, সে তত কল্যাণ লাভ
করবে। বাইরের জগতের কামনা –বাসনার চাকচিক্যতা এই পবিত্র মাসেও যুদ্ধ করতে থাকবে
সাধকের সাথে তাকে তার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করার জন্যে। যারা নিজের জীবন সত্যকে জানার
পরেও সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী হয়ে জীবনের স্বাদ উপভোগ করার জন্য স্বধর্ম ত্যাগ করে,
তারা তো ধর্মহীন হয়ে জাহান্নামবাসী হবেই—এতে কোন ভুল নেই। স্বধর্ম ত্যাগ করার
ন্যায় পাপ আর দ্বিতীয় নেই ইহকালে ও পরকালে, যারাই নিজের ধর্ম ত্যাগ করবে, তারাই
ধর্মহীন হয়ে চিরকাল জাহান্নামেই পড়ে থাকবে ও সেখানকার শাস্তি ভোগ করবে।
২১৮) নিশ্চয়, যারা বিশ্বাস করে এবং আল্লাহ্র
পথে ( সত্য, ন্যায়, আদর্শ ও ধর্মের জন্য) স্বদেশ ত্যাগ করে এবং জেহাদ করে ( ন্যায়ের
প্রতিষ্ঠা কল্পে সংগ্রাম করে), তারাই আল্লাহ্র দয়ার আশা রাখে এবং আল্লাহ্
ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
মর্মার্থঃ—যারা নিজের অন্তরের আল্লাহ্ বা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে যে, তিনি
ন্যায়কারী, নিরপেক্ষ, ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু হয়ে সর্বত্র অধিষ্ঠান করছেন এবং তিনি
কোন সংকীর্ণতার মধ্যে থাকেন না, তারাই কেবল তাকে জেনে স্বদেশের ক্ষুদ্র মায়া ত্যাগ
করে সারা বিশ্বকে নিজের বাসভূমি- কর্মভূমি ও জ্ঞানপীঠ ভাবতে পারে নিরপেক্ষ চিত্ত
নিয়ে, এই চিন্তা মানুষের অন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাই তারাই
কেবল জেহাদ বা ধর্মযুদ্ধ করার ছাড়পত্র আল্লাহ্র নিকট থেকে লাভ করে যারা স্বদেশের
ক্ষুদ্র চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ ত্যাগ করে আল্লাহ্র বিশাল ভূমিতে সত্য,
ন্যায়, আদর্শ ও আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চায়, বিশ্ব
প্রতিপালকের আশ্রয়ে থেকে বিশ্বমানব শিক্ষার কর্মী হয়ে।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment