বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [
সুরা—২ আল- বাকারা—২১৯ থেকে ২২৩ আয়াত।]
২১৯) লোকে তোমাকে মদ জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, বল, উভয়ের মধ্যে আছে
মহাপাপ এবং মানুষের জন্য ( যৎকিঞ্চিত) উপকারও আছে, কিন্তু ওদের পাপ, উপকার অপেক্ষা
অধিক। লোকে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে (আল্লাহ্র পথে) তারা কী খরচ করবে? বল, যা
উদ্বৃত্ত! এভাবে আল্লাহ্ তাঁর সকল নিদর্শন তোমাদের জন্য প্রকাশ করেন যাতে তোমরা
চিন্তা কর।
মর্মার্থঃ— এ জগতে মদ ও জুয়া নামক বস্তু মানুষের সমস্ত মানবিক গুনগুলি হরণ
করে নেয়। মদ খেলে মানুষের নিজের জ্ঞান- বুদ্ধি আর কাজ করে না, ফলে মদ খাওয়া
মহাপাপ। একইভাবে জুয়ার নেশায় মানুষ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়, তবুও তা ছাড়তে
পারে না লোভে। তাই এটাও মানুষকে মহাপাপের পথে নিয়ে যায়। এর যৎসামান্য
উপকারিতা বলতে এই সবের ব্যবসায় করে দেশের কিছু লোক ও সরকার লাভবান হয়, মানুষকে পাপ
পথের দিকে ঠেলে দিয়ে। যারা বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল তারা কখনো এই দুই রাস্তা দিয়েও
চলে না। যখন মানুষের অর্থ বেশী হয়ে যায় অথবা অর্থের প্রতি লোভ বেড়ে যায় তখনি
মানুষের অসৎ সঙ্গের প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়। এদের উদ্বৃত্ত সম্পদ সৎ পথে ব্যয় করার
মতো বুদ্ধি থাকে না। এই উদ্বৃত্ত সম্পদ যদি তারা জ্ঞান ফেরীর পথে বা আল্লাহ্র পথে
ব্যয় করতে শুরু করে, তবে তাদের সম্পদ গুনিতক হারে বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ্র আয়াত সবই
সত্যস্বরূপ নিদর্শন, এই আয়াতগুলি নিয়ে মানুষ যত চিন্তা করবে ততই মদখোর মাতালের
ন্যায় সত্যপান করার জন্য উদগ্রীব হয়ে যাবে, তেমনি জুয়ার টাকার যেমন কোন হিসাব থাকে
না তেমনি এই পথে অঢেল সম্পদ আসতেই থাকবে আল্লাহ্র রাজত্ব থেকে, এই সম্পদ ব্যয় করে
শেষ করতে কেউ পারবে না। আল্লাহ্র জগতের মাতাল ও জুয়ারীকে সহজে কেউ চিনতে পারে না,
একমাত্র তিনিই তাদের জানেন।
২২০) ইহকাল ও পরকাল সম্বন্ধে। লোকে তোমাকে
পিতৃহীনদের সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করে; বল, তাদের উপকারের চেষ্টা করাই উত্তম। আর যদি
তোমরা তাদের সাথে মিলে মিশে থাক, তবে তো তারা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ্ জানেন কে
হিতকারী ও অনিষ্টকারী। আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে তোমাদের কষ্টে ফেলতে পারতেন। নিশ্চয়
আল্লাহ্ প্রবল পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়।
মর্মার্থঃ--- ইহকালের সুখের কথা চিন্তা করতে হয় পরকালের কথা ভেবে, তেমনি
নিজের ভাগ্যের বিচার করতে হয় পিতৃহীন- অসহায়দের দিকে তাকিয়ে। কে তোমাকে বিত্তশালী
করেছেন – কেনো করেছেন- নিশ্চয় এর পিছনে কোন এক মহানশক্তির বিশাল অভিপ্রায় লুকিয়ে
রয়েছে, গভীর চিন্তা করে নিজেকেও পিতৃহীন, অসহায়দের মতোই ভেবে, তাদেরকে ভাই রূপে
গ্রহণ করে তাদের সঙ্গে তাদের মতো যারা জীবন কাটায় তারাই বুদ্ধিমান। কে অনিষ্টকারী
আর কে হিতকারী তা প্রচারের আলোয় আসুক আর না আসুক আল্লাহ্ সব জানেন। তিনিই
পরাক্রমদাতা ও প্রজ্ঞাদাতা হয়ে হিতকারী মানুষের অন্তরে জাগ্রত থাকেন। তাই নিজের
মনের কথা আগে নিজে গভীরভাবে ভাববে, তারপর তা জীবন সত্যের সাথে যুক্ত করবে, তাহলেই
দেখবে তোমার জীবনে সৎ পরামর্শদাতার অভাব হবে না, তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও
প্রজ্ঞাময় হয়ে কত রূপে, কত ভাবে তোমাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন তখন তা
প্রতিপদে পদে উপলব্ধি করতে পারবে।
২২১)
এবং মুশরিক রমণী যে পর্যন্ত না বিশ্বাস
করে তোমরা বিবাহ করো না। অবিশ্বাসী নারী তোমাদের চমৎকৃত করলেও ধর্মে বিশ্বাস না
করা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষের সাথে তোমাদের কন্যার বিবাহ দিওনা, মুশরিক পুরুষ
তোমাদের চমৎকৃত করলেও ধর্মে বিশ্বাসী ক্রীতদাস তা অপেক্ষা উত্তম। ওরা তোমাদেরকে
আগুনের দিকে আহ্বান করে এবং আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিজ অনুগ্রহ ও ক্ষমার দিকে আহ্বান
করেন। তিনি মানুষের জন্য আপন নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা তা
থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
মর্মার্থঃ—যাদের চিন্তাশক্তি কম তারাই অজ্ঞ বা মুশরিক। এরা কিভাবে নিজের
অন্তরের দিব্যশক্তির উপর বিশ্বাস রাখবে? এরা রূপে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, এরা কিছুতেই
নিজের স্বভাবের পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। পুরুষ বা নারী এই ভাবধারার হলে তাদের
সন্তান সন্ততিও একই ভাব ধারার হবে প্রকৃতির নিয়মে। আবার একটা ক্রীতদাস সে যদি
উন্নত চিন্তাধারার হয় তবে সে বিশ্বাসী হয়ে উঠবে নিজের জ্ঞান- বুদ্ধি –বিবেক বলে।
তাই উন্নত বংশধরের কথা মাথায় রেখে ছেলে- মেয়ের বিবাহ দিতে হয় পিতা-মাতাকে। অজ্ঞরা
কখনোই মানুষকে সত্যের পথে নিয়ে যেতে নিয়ে যেতে পারে না তাদের বংশধরদের। একমাত্র
বিশ্বাসী ও জ্ঞানী সম্প্রদায়ের মানুষ আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের সাথে নিজের জীবন বিমিময়
করে তাঁর অবতীর্ণ করা নিদর্শনসমূহের অর্থ উপলব্ধি করে অনুগ্রহ ও ক্ষমার অধিকারী
হয়ে উঠে। এই সব লোকের বাইরের জগতের চাচিক্যতা থাকুক আর না থাকুক অন্তর্জগতের
পবিত্রতা বিশাল। এই অবতীর্ণ হওয়া আয়াত থেকে মানুষ
শিক্ষা গ্রহণ করে সংকীর্ণতা থেকে ব্যাপ্তির অভিমুখে যাত্রা করতে পারে এবং মুশরিক
জীবনের কালিমা থেকেও মুক্ত হতে পারে।
২২২) লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, তা অশুচি।
সুতরাং রজঃস্রাবকালে স্ত্রীসঙ্গ বর্জন করবে, এবং যত দিন না তারা পবিত্র হয়, তাদের
নিকট ( সহবাসের জন্য) যেও না। অতঃপর যখন তারা (উত্তমরূপে) পরিশুদ্ধ (পবিত্র) হবে,
তখন তাদের নিকট ঠিক সেইভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ্ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন।
নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাপ্রার্থীগণকে এবং যারা পবিত্র থাকে তাদের পছন্দ করেন।
মর্মার্থঃ—পবিত্রতায় মানুষের ধর্ম। এই পবিত্রতা রক্ষার জ্ঞান না থাকলে
মানুষ বাইরে- অন্তরে কোন স্থানেই নিজের পবিত্রতা রক্ষা করতে সক্ষম হয় না। স্বামী-
স্ত্রীর সম্পর্ক পবিত্র জ্ঞানের পোশাকের সম্পর্ক, তারা একে অপরের জ্ঞানের পোশাক,
তা আল্লাহ্ আগেই জানিয়েছেন। পশু থেকে অনেক উন্নত জীব মানুষ , তাই তার স্বভাবে যেন পশুত্বভাব না দেখা যায়,
এই জন্যেই এই জ্ঞানের আয়াত অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর ক্ষমাপ্রার্থীগণকে এবং
যারা পবিত্রতার পথ ধরে জীবন সত্যকে জেনে সৎ কর্ম করেন তাদেরকে পছন্দ করেন। জীবন
সত্যকে না জানলে স্বামী- স্ত্রী কেউই নিজের ঘরের পবিত্রতা রক্ষা করতে পারে না।
২২৩) তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র
( স্বরূপ) অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পার। তোমরা
তোমাদের জন্য (মুক্তির জন্য) কিছু করো এবং আল্লাহ্কে ভয় করো। আর জেনে রাখ যে,
নিশ্চয় তোমরা আল্লাহ্র সম্মুখীন হবে এবং বিশ্বাসীগণকে সুসংবাদ দাও।
মর্মার্থঃ-- স্ত্রীগণ স্বামীদের
শস্যক্ষেত্র। এই শস্যক্ষেত্রে যেমন বীজ পড়বে তেমনি ফসল ফলবে। আগে তোমরা তোমাদের
মুক্তির জন্য কিছু করো, অর্থাৎ আল্লাহ্কে ভয় করে অন্তর্জগৎ শাসন করে পবিত্র
জ্ঞানের দ্বারা জীবনকে পবিত্র করে তোলো, তাহলেই দেহের রক্ত- বীর্য শোধন হয়ে যাবে।
শোধিত বীজ না পড়লে কিভাবে চাষী ভাল ফসল আশা করতে পারে? আত্মার বন্ধু পুত্র- কন্যা।
নিজের আত্মাকে নিজের পুত্র –কন্যারূপে দেখবে, এই আত্মার সাথে সরাসরি আল্লাহ্
যুক্ত, তিনিই তাঁর সম্মুখে সকলকে এইভাবেই উপস্থিত করেন, যদি বিশ্বাসীগণ তাঁর
অবতীর্ণ হওয়া আয়াতগুলিকে অনুসরণ করে জীবন পথে চলে, তবেই এই সত্য উপলব্ধি করতে পারবে এবং জ্ঞান
চক্ষু দিয়ে আল্লাহ্কে দেখতে পাবে। বিশ্বাসীগণের জন্য এর থেকে বড় সুসংবাদ আর কি
থাকতে পারে?
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের
আলোর জয়। 
No comments:
Post a Comment