বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো।[ সুরা—২ আল- বাকারা—২৫৪ থেকে ২৫৮ আয়াত।]
২৫৪) হে বিশ্বাসীগণ! আমরা যা তোমাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তোমরা দান কর সেদিন
(শেষ বিচারের দিন) আসার পূর্বে, যেদিন ক্রয় বিক্রয়, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে
না। অবিশ্বাসীরাই সীমালংঘনকারী।
মর্মার্থঃ—এ জীবন ক্ষণস্থায়ী, কবে
এই দেহ ছেড়ে চলে যেতে হবে, তা কেউ জানে না। তাই যে যেটুকু জ্ঞান লাভ করেছে নিজ নিজ
প্রতিপালকের আশ্রয়ে থেকে, নিজের অন্তরের বিশ্বাসকে জাগ্রত করে, তা দান না করতে পারলে সেই জ্ঞানের পবিত্র রূপ
জীবনে ফুটে উঠবে না। এ দেহ চলে গেলে আর জ্ঞানের ক্রয়- বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্থাৎ
জ্ঞানের আদান- প্রদানের মাধ্যমে কোন সৎ বন্ধুও গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। দেহ থেকে
চেতনা চলে গেলে সেই চেতনার পবিত্ররূপ দেওয়া আর কারও সুপারিশক্রমেও দেওয়া সম্ভব হয়ে
উঠবে না। তাই সত্যকে অস্বীকার করে যারা এই জগতে জীবন অতিবাহিত করে তারাই
অবিশ্বাসী, অবিশ্বাসীরাই আল্লাহ্র বিধান লঙ্ঘন করে সীমালংঘনকারী দলে পরিণত হয় ও
পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে।
২৫৫) আল্লাহ্ তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, অনাদি। তাঁকে
তন্দ্রা অথবা নিদ্রা স্পর্শ করে না; আকাশ ও পৃথিবীর যা কিছু আছে সমস্তই তাঁর। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের (মানুষের) সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত আছেন। যা
তিনি ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা (মানুষেরা) আয়ত্ত করতে পারে না।
তাঁর আসন আকাশ ও পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত, আর ওদের ( আকাশ পৃথিবীর ) রক্ষণাবেক্ষণে
তিনি ক্লান্ত হন না, তিনি অতি উচ্চ, মহামহিম।
মর্মার্থঃ-- আল্লাহ্ বা ঈশ্বর তিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য
নেই, কারণ তিনি চিরঞ্জীব, অনাদি হয়ে আকাশ ও পৃথিবীর সবার অন্তর- বাহির জুড়ে রয়েছেন
এবং দৃশ্য ও অদৃশ্য শক্তি যা কিছু আছে
সমস্তই তাঁর এবং সকলেই তাঁর শক্তির সাথে যুক্ত হয়ে তাঁরই নির্দেশক্রমে কাজ করে
চলেছেন। তাই তাঁকে তন্দ্রা অথবা নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না। তাঁর বিধান পরিবর্তন
করার জন্য কে তাঁকে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে? মানুষের ক্ষমতা সীমিত, তাই
তাঁর ইচ্ছা ব্যতিরেকে তাঁর জ্ঞান- বিজ্ঞানের রাজত্বের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে
না, তেমনি তাঁর কৃপা ছাড়া কেউ তাঁর আয়াতের মর্মার্থ উপলব্ধি করতেও সক্ষম হয় না।
তাঁর আসন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী জুড়ে, তাই প্রতিটি বস্তুর মধ্যেই তাঁর আসন বা বেদী,
তিনি এই সত্যবেদী রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন নিজের উচ্চ, মহামহিম রূপে স্থির থেকে,
তাই তাঁকে কেউ ক্লান্ত করতে পারে না, তাঁর কর্ম জগতে।
২৫৬) ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর
জরবদস্তি নেই, নিশ্চয় সুপথ প্রকাশ্যভাবে কুপথ থেকে পৃথক হয়েছে। সুতরাং যে তাগুতকে
( অর্থাৎ যাবতীয় বিভ্রান্তিকর উপায় উপকরণকে) অস্বীকার করবে ও আল্লাহর প্রতি
বিশ্বাস করবে, নিশ্চয় সে এমন এক শক্ত হাতল ধরবে যা কখনও ভাঙবে না। আল্লাহ্
সর্বশ্রোতা, জ্ঞানময়।
মর্মার্থঃ—এই আয়াতে আল্লাহ্
স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন মানুষের ধর্ম নিয়ে যে বাড়াবাড়ি চলছে তা নিয়ে। ধর্মের
ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই, এই কথা আল্লাহ্ নিজের মুখে কুরআনে ব্যক্ত করেছেন,
কিন্তু দেখা যাচ্ছে মানুষ এটা নিয়েই বেশী জবরদস্তি করছে এবং জোড় করে প্রাণের ভয়
দেখিয়ে ইসলাম ধর্মে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে ধর্মান্তরিত করেই চলেছে, সীমালঙ্ঘন
করে। প্রত্যেক মানুষের জন্যই রয়েছে দুটি পথ—একটি সুপথ অপরটি কুপথ। আর প্রত্যেক
মানুষের অন্তরে রয়েছে তার অভিভাবক। যারা নিজের অন্তরের আল্লাহ্ বা ঈশ্বরকে
বিশ্বাস করে, তারাই সফলকাম হয়ে এমন এক শক্ত হাতল ধরে আছে, যা কখনও ভাঙবে না। কারণ
কেউ যদি সর্বশ্রোতা ও জ্ঞানময় সত্তার আশ্রয়ে থাকে তবে তবে তার কিসের অভাব, কিসের
ভয় আর কিসের দুর্বলতা? সে তো সদায় পবিত্র হয়ে নব নব জীবন লাভ করতেই থাকবে, তাঁর
বিশাল জ্ঞান রাজত্বে।
২৫৭) আল্লাহ্ তাদের অভিভাবক যারা
বিশ্বাস করে। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকে নিয়ে যান। আর যারা সত্য
প্রত্যাখ্যান করে বিভ্রান্তকারীরা তাদের অভিভাবক। এরা তাদেরকে আলোক থেকে অন্ধকারে
নিয়ে যান। ওরাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
মর্মার্থঃ-- আল্লাহ্ বা ঈশ্বরকে যারা নিজের জীবনের অভিভাবক
বলে মান্য করে চলে তাদের জীবন হয় আলোকময়। তিনি নিজের ভক্ত- বান্দা- দাস- শিষ্য-
সন্তান এক কথায় তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যেতেই
থাকেন তাঁর বিভিন্ন যানের মাধ্যমে। আর যারা বিভ্রান্তকারীদের অভিভাবক করে জীবন পথে
চলে তারা আলোক থেকে অন্ধকারের পথে পাড়ি দেয় জাহান্নামে যাবার জন্য। ইচ্ছা করে সত্য
জানার পরেও কেউ যদি জাহান্নামে যায়, তবে তো তাকে জাহান্নামবাসী হয়ে চিরকাল সেখানেই
থাকতে হবে। নব নব জান্নাতের জীবনের স্বাদ তারা কেউই পাবে না।
২৫৮) তুমি কি সে ব্যক্তির ( নমরুদের) কথা ভেবে দেখনি, যে ইব্রাহিমের সাথে
তার প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, যেহেতু আল্লাহ্ তাকে রাজত্ব
দিয়েছিলেন; যখন ইব্রাহিম বলল, তিনি আমার প্রতিপালক যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু
ঘটান, সে বলল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইব্রাহিম বলল, নিশ্চয় আল্লাহ্
সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় করান, তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদয় করাও। তখন সে (
নমরুদ) হতবুদ্ধি হয়ে গেল; এবং আল্লাহ্ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন
না।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ বা ঈশ্বর
অহংকারী, কদাচারী, অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎ পথ দেখান না ও সেই পথে পরিচালিত করেন
না। এই সত্য মানব জাতিকে জানাবার জন্যই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। কুরআন হলো মানব জীবনের
অন্তরের আলো। এই ধর্মগ্রন্থে প্রাচীন ইতিহাসের যে সব ছোঁয়া রয়েছে তা কেবল মানব
জাতিকে সৎ ও কল্যাণের পথে নিয়ে যাবার জন্যে। অহংকারী ও অত্যাচারী মানব জাতি
আল্লাহ্ থেকেও বেশী শক্তিবান এটা প্রচার করে মানব জাতিকে নিজের পদতলে ধরে রাখতে
চায় এবং আল্লাহ্কে ভয় করে যাতে কেউ নিজের অন্তর্জগৎ পবিত্র রাখতে না পারে, সেই
ব্যবস্থা সমাজের বুকে নিজের শাসন কায়েম করে করে, তারা নিজেদের আল্লাহ্ রূপে তুলে
ধরে এবং পরিশেষে তারা তাঁর উপহাসের পাত্র হয়।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment