Monday, 16 July 2018

কুরআন সুরা-- ২ আল- বাকারা ২৪৪ থেকে ২৪৮ আয়াত

    বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল—বাকারা—২৪৪ থেকে ২৪৮ আয়াত।]
  ২৪৪) তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
    মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌র পথ হচ্ছে, সৎ পথ, সত্যজ্ঞানের পথ। এই পথ ধরে সংগ্রাম- সাধনা করলে মানুষকে প্রতিপদে পদে পরীক্ষা দিতে দিতে এগিয়ে যেতে হয়। আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ হয়ে, তিনি সকলের অন্তরে বাস করছেন, এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করে তাঁর আশ্রয়ে থেকে তাঁর পথ ধরে তাঁকে জানার জন্য এগিয়ে যেতে হয় সবকিছুকে পিছনে ফেলে। তিনি তোমার চিরসাথী হয়ে সাথে আছেন এবং সর্বশ্রোতা হয়ে তোমার সব কথা শুনছেন, সবকথা শোনার পর সর্বজ্ঞ হয়ে সাথে সাথে বিচার করছেন এবং তোমার শক্তির গতি বৃদ্ধি করার জন্য যা করতে হয় তাই করে চলেছেনযারা বুদ্ধিমান তারা এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে অজ্ঞরা এই মহাজাগতিক শক্তির কিছুই বুঝতে পারে না।
 ২৪৫) কে সে, যে আল্লাহ্‌কে উত্তম ঋণ প্রদান করবে? আল্লাহ্‌ তা তার জন্যে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন, এবং আল্লাহ্‌ই জীবিকা সংকুচিত ও সম্প্রসারিত করেন, এবং তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যানীত হবে।
   মর্মার্থঃ—মানব জীবন ঋণে জর্জরিত। পিতৃ ঋণ, মাতৃ ঋণ, নবী ঋণ, ফিরিশতা ঋণ ও মাটির ঋণ বা জন্মভূমির ঋণ পরিশোধ করতে করতে জীবন শেষ হয়ে যায়। তারপর আল্লাহ্‌কে কে উত্তম ঋণ প্রদান করবে? আল্লাহ্‌র কাছেই তো সবায় সবদিক থেকে ঋণী। এই অবস্থায় উত্তম ঋণ তাঁকে সেই মহান দিতে সক্ষম যে নিজের জীবনের সবকিছুই তাঁকে সমর্পণ করে নিজের অধীনে কিছু না রেখে মুক্ত জীবন গ্রহণ করে। এই আবর্জনা মুক্ত জীবন ছাড়া উত্তম ঋণ আর কি হতে পারে তাঁর কাছে? যে ঋণ মুক্ত সেই কেবল অপরকে ঋণ দিতে পারে। এই উত্তম ঋণ আল্লাহ্‌কে কেউ দিতে পারলে তা বহুগুণ বৃদ্ধি অবস্থায় ফেরত তো পাবেই, সেই সাথে তাঁর চিরসাথী হয়ে থাকার সুযোগ পাবে। সবায়কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি কাকে উপযুক্ত করে নিয়ে যাবেন তাঁর যানে চাপিয়ে আর কাকে বেঁধে নিয়ে যানের পিছনে নিয়ে যাবেন, তা তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ জানেন না। তিনি সবার জন্যেই এই পৃথিবীতে জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন, এই জীবিকার ব্যবস্থার মধ্যেও তাঁর বিশাল উদ্দ্যেশ্য কাজ করছে মানুষকে পবিত্র করে তুলে নেওয়ার জন্য। তাই অঢেল জীবিকা পেয়েও যে, কেউ তাঁকে উত্তম ঋণ দিতে সক্ষম হবে, এই ধারণা মানুষের ভুল।
  ২৪৬) তুমি কি মূসার পরবর্তী বনী ইস্রাঈল প্রধানদের দেখনি? যখন তারা নিজেদের নবীকে বলেছিল, আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত কর, যাতে আমরা আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রাম করতে পারি। সে বলল, বোধহয়, যদি তোমাদের প্রতি সংগ্রামের (জেহাদের) বিধান দেয়া হয়, তবে তোমরা সংগ্রাম করবে না? তারা বলল, আমরা যখন আপন ঘর বাড়ি ও সন্তান সন্তুতি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি, তখন আল্লাহ্‌র পথে কেন সংগ্রাম করব না? অতঃপর যখন তাদের প্রতি সংগ্রামের বিধান দেয়া হল, তখন তাদের স্বল্পসংখ্যক ব্যতীত অধিকাংশই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। বস্তুত আল্লাহ্‌ অপরাধীগণ সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।
   মর্মার্থঃ—সৎ রাজার অধীনে থেকেও মানুষ নিজের স্বভাবের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয় না জীবন সত্য জ্ঞানের অভাবে। প্রকৃতির নিয়মে তাদের ঘর- বাড়ী- ছেলে- মেয়ে চলে গেলেও তারা ধর্মযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে নিজের জীবনকে পবিত্র করতে কোনপ্রকার সাধনা- তপস্যা- সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করে না। তাঁরা কেবল আল্লাহ্‌ ও ভাগ্যের দোষ দিয়ে মৃতের ন্যায় সংসারের অন্ধকূপে অপরাধীর ন্যায় পড়ে থাকে। যারা নিজের প্রতিপালককের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে না তারা কিভাবে জেহাদে অংশগ্রহণ করে অপরাধ থেকে নিজেকে মুক্ত করবে? এই অপরাধীদের আল্লাহ্‌ ভালভাবেই জানেন।
 ২৪৭) তাদের নবী তাদের বলেছিল, আল্লাহ্‌ তালুতকে তোমাদের রাজা নিযুক্ত করেছেন। তারা বলল, সে কিরূপে আমাদের উপর কর্তৃত্ব করবে, যখন কর্তৃত্ব করার (জন্য) আমরা তার চেয়ে অধিক যোগ্য এবং তাকে প্রচুর ধন সম্পদও দেয়া হয়নি? নবী বললেন, আল্লাহ্‌ই তাকে মনোনীত করেছেন, এবং তিনি তাকে ( সকল প্রকার) জ্ঞানে এবং দেহে সমৃদ্ধ করেছেন। বস্তুত আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা তাঁর রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।
  মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়। তিনি কাকে রাজা করবেন আর কাকে ফকির করবেন, তা তিনিই জানেন। তিনি কোন অহংকারী মানব জাতিকে পছন্দ করেন না। তাই তাদের জন্যে কোন রাজাও নিযুক্ত করেন না, তিনি তাদেরকে অন্তর্জগতের শাসনের জন্যে যে রাজার দরকার তাঁর সাথেও পরিচয় করে দেন না। এই সব লোক পবিত্র জ্ঞানকে জীবনের সম্পদ বলে স্বীকার করে নিতে পারে  না অন্তর থেকে। তাই আল্লাহ্‌ কার জীবনে কাকে রাজা মনোনীত করবেন, তা তিনিই জানেন, কারণ তিনি অন্তর্যামী, সবার স্বভাব তিনি জানেন এবং স্বভাব অনুযায়ী সবার জন্যেই তিনি শাসক বা রাজা নিযুক্ত করতে ভুল করেন না।
 ২৪৮) তাদের নবী তাদের আরও বলল, নিশ্চয়, তাঁর রাজত্বের লক্ষণ এই যে, তোমাদের নিকট একটি তাবুত আসবে, যাতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শান্তিপত্র এবং কিছু জিনিস থাকবে, যা মূসা ও হারুনের বংশধরগণ রেখে গিয়েছে, ফিরিশতাগণ সেটি বহন করে আনবে। নিশ্চয় এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।
  মর্মার্থঃ—অধিকাংশ মানুষ নবী, ফিরিশতাদের সত্যজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে না। তারা কেবল এই জগতের সুখ দুঃখ দেখতে পায়। অনাবিল শাস্তির জগতের শাস্তিপত্র ও সেই জগতের সম্পদ দেখতে পায় না। এই সব লোককে যতই সত্য নিদর্শন দেখানো হৌক না কেন তাদের অন্তরে কিছুতেই জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালানো সম্ভব হয় না, কারণ তাদের অন্তরে সদায় কামনা- বাসনার ঝড় প্রবাহিত হতে থাকে। সেই ঝড়ে প্রদীপ কোনোপ্রকারে জ্বললেও তা সাথে সাথে নিভে যায়, রাজ সম্পদ দিলেও তখন তা আর অন্ধকারে তাদের পক্ষে দেখা সম্ভব হয় না।
    জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।  

No comments:

Post a Comment