বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা- ২৩৪ থেকে ২৩৮
আয়াত।]
২৩৪) তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ
দিন অপেক্ষা করবে। যখন তারা ইদ্দত (চার মাস দশ দিন) পূর্ণ করবে তখন তারা নিজেদের
জন্য বিধিমত কাজ (বিবাহ) করলে তাতে তোমাদের কোন পাপ হবে না। তোমরা যা কর, আল্লাহ্
সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।
মর্মার্থঃ—এই আয়াত অবতীর্ণ হয় বিধবা নারীদের জীবন ও সামাজিক মান সম্মান
রক্ষার্থে, যাতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি- বিবেক পূর্ণভাবে সততার সাথে কাজ করে
সেইজন্যে। জ্ঞানীরা আল্লাহ্র বিধানকে মান্যতা দিয়ে যেমন অকাল মৃত্যুকে মেনে
নেয়, তেমনি যে বেঁচে থাকে, সে যেন আল্লাহ্কে
ভয় করে, নিজের অন্তর্জগতকে শাসন করার শিক্ষা লাভ করে, পবিত্র পথে পবিত্র জীবন নিয়ে
সমাজে বাঁচতে পারে তার ব্যবস্থা করাই তাদের ধর্ম বা কর্তব্য কর্ম। জ্ঞানীদেরকে
সবার জীবনের ধর্ম সম্পর্কে সজাগ করার জন্যে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
২৩৪) আর তোমরা যদি আভাসে ইংগিতে উক্ত
নারীদের বিবাহ প্রস্তাব কর অথবা অন্তরে তা গোপন রাখ, তাতে তোমাদের দোষ হবে না।
আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করবে। কিন্তু বিধিমত কথাবার্তা ছাড়া
গোপনে তাদের নিকট কোন অঙ্গীকার করো না এবং নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত
বিবাহকার্য সম্পন্ন করার সংকল্প করোনা। এবং জেনে রাখ, আল্লাহ্ তোমাদের মনোভাব
জানেন। অতএব তাঁকে ভয় কর, এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, সহিষ্ণু।
মর্মার্থঃ—মানুষকে নিজের স্বভাব ও চরিত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেওয়ার
নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আত্মসংযমের মাধ্যমে। যাদের নিজের স্বভাব ও চরিত্র নিয়ন্ত্রিত
থাকে অন্তর্জগতের শাসন দ্বারা, তারাই হয় ক্ষমাশীল ও সহিষ্ণু। এদের দ্বারা পরিবার,
সমাজ, রাষ্ট্রে কোনোরূপ অন্যায়, অপরাধ মূলক কাজ হতে পারে না। আল্লাহ বা ঈশ্বর এদের
মনোভাব জানেন। এই জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্যেই এই বিধান, যাতে এই সম্প্রদায়
বিভ্রান্তির মধ্যে না পড়ে বিপদকালে। আর জ্ঞানীদের ধর্ম--কর্মই সমাজের বাকী লোকেরা
অনুসরণ করে। জ্ঞানীদের অধঃপতন হলে সমাজ ধ্বংসের পথে চলে যায়।
২৩৬)
যদি তোমরা সহবাস করার বা মোহর ধার্য করার পূর্বে স্ত্রীদের তালাক দাও, তবে কোন পাপ
হবে না, কিন্তু তাদের যথাসাধ্য উপযুক্ত খরচপত্র দিও, সচ্ছ্বল ব্যক্তি তার সাধ্যমত
এবং অসচ্ছ্বল ব্যক্তি তার সামর্থ্যানুযায়ী নিয়মমত খরচপত্র দানের ব্যবস্থা করবে,
এটা সত্যপরায়ণ লোকের পক্ষে ( অবশ্য) কর্তব্য।
মর্মার্থঃ--- সত্যপরায়ণ মানুষ যা জীবন সত্য তাকেই মান্য করে জীবন পথে এগিয়ে
যায়। অপরের বিশ্বাস- শ্রদ্ধা- ভক্তি- প্রেম কোনটাকেই হীন চোখে দেখে না। নিজের
সাধ্যমত অপরকে সাহায্য- সহযোগিতা করা এবং কোন প্রকার অহংকার প্রদর্শন না করা, এসব
কাজের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে সকলকে নিজের আচরিত ধর্ম শিক্ষা দিয়ে থাকে। নিজে ভাল
না হলে কখনো অপরকে ভাল করা যায় না। যাতে মানব জীবনে তালাক দেওয়ার মতো দুঃখজনক ঘটনা
না ঘটে তার জন্যেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।
২৩৭) এবং যদি স্পর্শ করার পূর্বে স্ত্রীদের তালাক দাও, অথচ মোহর পূর্বেই
ধার্য করে থাক, তাহলে নির্দিষ্ট মোহরের অর্ধেক আদায় করতে হবে। কিন্তু যদি স্ত্রী
অথবা যার হাতে বিবাহবন্ধন সে যদি মাফ করে দেয়, এবং মাফ করে দেয়াই আত্মসংযমের
নিকটতর। তোমরা নিজেদের মধ্যে সদাশয়তার কথা বিস্মৃত হয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কর
আল্লাহ্ তার দ্রষ্টা।
মর্মার্থঃ—নিজের সদাশয় মূর্তির প্রতি লক্ষ্য রেখে জ্ঞানীরা সাবধানে এগিয়ে
চলে, তারা ভালভাবেই জানে আল্লাহ্ তাদের সাথে আছেন এবং তিনি তাদের সব কাজকর্ম
দেখছেন। তাই তারা কখনো অপরকে বঞ্চিত করার কোনপ্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। জীবনে
চলার পথে বিভিন্ন প্রকার দুর্ঘটনা স্বাভাবিক নিয়মে আসবেই, এগুলোকে রোধ করার শক্তি
মানুষের নেই, কিন্তু এগুলোকে মেনে নিয়ে প্রতিকারের বুদ্ধি মানুষকে আল্লাহ্
দিয়েছেন, তাই জ্ঞানীরা সৎ ও পবিত্র বুদ্ধি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করে। মানব জীবনে
তালাক এর মতো সমস্যা আসতেই পারে, এই সমস্যা সমাধানের জন্যেই এই সব আয়াত, জ্ঞানীরা
তা জানে।
২৩৮) তোমরা নামাযের প্রতি যত্নবান
হবে, বিশেষভাবে মধ্যবর্তী (আসরের) নামাযকে সযত্নে রক্ষা করবে এবং আল্লাহ্র
সম্মুখে বিনীতভাবে দাঁড়াবে।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্র সম্মুখে তোমরা
বিনীতভাবে দাঁড়াবে নামাযকে সযত্নে রক্ষা করার জন্যে। এখন প্রশ্ন হলো তোমরা আল্লাহ্কে
পাবে কোথায়—যে তাঁর সম্মুখে দাঁড়াবে ? তাঁকে না পেলে তো কিছুতেই তাঁর কথা মান্য
করে তোমরা নামাযের প্রতি যত্নবান হতে পারবে না। তাই জ্ঞানীরা তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই
তাঁকে দেখেন, তাঁর গুণ ও শক্তির রূপের মধ্যেই তাঁকে দেখেন। যে সব মানুষের মধ্যে
তাঁর গুণ ও শক্তির প্রকাশ- বিকাশ ঘটে তাদের রূপের মধ্যেও তাঁকে দেখেন। তাই
জ্ঞানীরা সত্যমন্দিরের বিগ্রহকে আল্লাহ্ বা ঈশ্বর রূপে পূজা বা ইবাদত করে এবং
তাঁর সম্মুখেই তাঁর নির্দেশ মতো বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে স্তব- স্তুতির দ্বারা তাঁর
প্রশংসা করে।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment