বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল-বাকারা—২০৪ থেকে ২০৮
আয়াত।]
২০৪) এবং মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে, যার
পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে মোহিত করে এবং তার অন্তরে যা আছে সে সম্বন্ধে সে
আল্লাহ্কে সাক্ষী রাখে, কিন্তু আসলে সে তোমার ঘোর বিরোধী।
মর্মার্থঃ—অধিকাংশ মানুষ কেবল নিজের কামনা- বাসনার পিছনে ধাবিত হয়, নিজের
সৎ - সত্য- সুন্দর ও জ্যোতির্ময় রূপের দিকে তাকিয়ে দেখার তারা সময় পায় না। এই সব
মানুষের পার্থিব জীবনের কথা- বার্তা ছাড়া আর দ্বিতীয় কথা অন্তর থেকে জেগে উঠে না,
কেবল এই পার্থিব জীবনের সুখ- স্বাচ্ছন্দের জন্যেই তারা আল্লাহ্ বা ঈশ্বরকে সাক্ষী
রেখে অবিশ্বাসীর ভূমিকা পালন করে অন্তরের মিষ্টি কথা দিয়ে, নিজের স্বার্থ চরিতার্থ
করার জন্য। এদের জীবন সত্য বলে কিছু থাকে না। এদের অন্তর- মন- মুখ কোনটাই সত্যমুখী
বা আল্লাহ্ মুখী নয়। এরা তোমার অর্থাৎ সত্যপথের ঘোর বিরোধী। এদের সান্নিধ্য বড়ই
ভয়ংকর পাপের পথ, যে পথে তারা মানব সমাজকে জাহান্নামগামী রূপে গড়ে তোলে।
২০৫) আর যখন সে (তোমার কাছ থেকে) প্রস্থান করে তখন সে পৃথিবীতে
অশান্তি সৃষ্টি করে এবং শষ্যক্ষেত্র ও জীব জন্তুর বংশনিপাতের চেষ্টা করে, আল্লাহ্
কিন্তু অশান্তি পছন্দ করেন না।
মর্মার্থঃ—এই সব প্রকৃতির লোক বড়ই ক্ষতিকারক জীব। এরা আল্লাহ্র সান্নিধ্যে
( সত্যজ্ঞান লাভের আসরে) আসে এবং মানুষকে নিজের চাকচিক্যতা, পার্থিব জগতের চোখ
ধাঁধানো সম্পদ দেখিয়ে নিজের সঙ্গীদের নিয়ে প্রস্থান করে সত্যজ্ঞানের অঙ্গন থেকে।
এরাই পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, নিজেদের পার্থিব জীবনের চাকচিক্যতার প্রতি
লক্ষ্য রেখে, নিজেদের লাভ- লোকসানের দিকে লক্ষ্য রেখে, নিজেদের জীবনের স্বার্থ
চরিতার্থ করার জন্য। এরা নিজেদের কামনা- বাসনা চরিতার্থ করার জন্য যেমন
শস্যক্ষেত্রের ক্ষতি করে তেমনি জীব জন্তুর বংশনিপাতের চেষ্টা করে বিশ্ব- প্রকৃতির
পরিবেশের পবিত্রতাকে ধ্বংস করে। রক্ত খেলে মানুষের জীবন অপবিত্র হয়ে যায়, এই
সত্যকে অমান্য করেও তারা জীব জন্তুকে হত্যা করে তাদের মাংস খায়, রক্ত ও মাংস যে
একই বস্তু, এই সত্যকে তারা গোপন রেখে সত্যবিরোধী কাজ করে পার্থিব জগতের সুখ ক্রয়
করে এবং পবিত্র জীবনের বিনিময়ে অপবিত্র জীবন ক্রয় করে আল্লাহ্ বিমুখ হয়ে পড়ে।
তারা জানে না যে, আল্লাহ্ বা ঈশ্বর অশান্তি পছন্দ করেন না। আর এই অশান্তি
সৃষ্টিকারীগণই নিজেদেরকে আল্লাহ্র দল বলে প্রচার করে সারা বিশ্বে।
২০৬) আর যখন তাকে বলা হয়, তুমি
আল্লাহ্কে ভয় কর, তখন তার আত্মাভিমান তাকে পাপানুষ্ঠানে লিপ্ত করে। সুতরাং তার
উপযুক্ত স্থান জাহান্নাম এবং নিশ্চয় সেটা অতি মন্দ স্থান।
মর্মার্থঃ—যখন এই সব লোকদের বলা হয়, তোমরা নিজেদের অন্তর্জগতকে শাসন করে
সত্যজ্ঞান লাভ করার জন্য তোমাদের অন্তরের অভিভাবক আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের
অন্তর্জগতকে পবিত্র করে সৎকর্মশীল হয়ে উঠো, তখন তারা কেবল নিজেদের অহংকার প্রদর্শন
করে লোকের চোখে ভাল হয়ে থাকার জন্যে শাস্ত্রের বড় বড় বুলি বলে ও নিজের জ্ঞানের
অহংকার প্রদর্শন করে। এরা প্রকৃতপক্ষে সৎকর্মানুষ্ঠানের পরিবর্তে পাপ অনুষ্ঠান করে
পাপ কাজেই লিপ্ত থাকে। এদের পরিণাম জাহান্নাম, যা পরলোকে জঘন্য স্থান।
২০৭) এবং এমন লোকও আছে, যে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির
জন্য জীবন সমর্পণ করে দেয় এবং আল্লাহ্ তাঁর বান্দাগণের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র।
মর্মার্থঃ—এই পৃথিবীতে এমন লোকও আছে, যারা নিজের জীবনের সাথে আল্লাহ্র জীবন বিনিময় করে,তাঁর সন্তুষ্টির
জন্যে তাঁকেই নিজের জীবন সমর্পণ করে এবং তাঁর প্রেমে মশগুল হয়ে থাকে। এইরূপ
বান্দাদের প্রতি আল্লাহ বড়ই দয়ার্দ্র চিত্ত।
২০৮) হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলাম
ধর্ম গ্রহণ কর এবং শয়তানের ( কুমন্ত্রণা দানকারীর) পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে
তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
মর্মার্থঃ—যারা নিজের জীবনের বিনিময়ে আল্লাহ্র পবিত্র জীবন ক্রয় করে
নিয়েছে, কেবল তারাই তাঁর কাছে বিশ্বাসী এবং তাঁর গুণে গুণাম্বিত হয়ে পবিত্র জীবনের
অধিকারী ও উদার বিশ্ব প্রতিপালকের অধীনস্থ কর্মী বা বান্দা। এই সব বিশ্বাসীগণকে
আল্লাহ্ শয়তানের কবল থেকে মুক্ত থাকার জন্য ইসলাম ধর্ম অর্থাৎ পবিত্র জীবন ধারনের
পথের কথা এখানে ব্যক্ত করেছেন। কুমন্ত্রণা দানকারী মানুষের সংখ্যা এই পৃথিবীতে
প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, এই প্রবৃত্তির মানুষকে এখানে শয়তান বলা হয়েছে এবং মানব
জাতিকে তাদের পদাংক অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ এই সব শয়তান মানুষ বিশ্বাসী
ও আত্ম সমর্পণকারী মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।


No comments:
Post a Comment