বিশ্বমানব শিক্ষায়
পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা—১৮৪ থেকে ১৮৮ আয়াত।]
১৮৪) ( রোযা)
নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা প্রবাসে থাকলে অন্য
সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। আর যে ব্যক্তির রোযা রাখা দুঃসাধ্য তার পক্ষে (
একটি রোযার পরিবর্তে) একজন অভাবগ্রস্থকে অনুদান করা কর্তব্য। তবুও যদি কেউ নিজের
খুশিতে পুণ্য কাজ করে তবে তা তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর এবং যদি তোমরা উপলব্ধি করতে
পারতে, তবে বুঝতে রোযাব্রত পালনই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসু।
মর্মার্থঃ—এই
মানব জীবনটা সকলের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য এই পৃথিবীর বুকে। এখানে
এসে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা জানতেই জীবন শেষ
হয়ে যায়। সত্যকে জানার জন্য প্রশিক্ষণ না নিলে কেউ সত্যকে জানতে পারে না। রোযাব্রত
হলো মানব জীবনের সেই প্রশিক্ষণ কাল বছরের নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য। এই প্রশিক্ষণ
মানব জীবনে অধিক কল্যাণকর হয় যারা বোধের জগতে অবস্থান করে তাদের ক্ষেত্রে। অধিকাংশ
মানুষ জানে না কেনো তারা রোযা করছে? যদি জানতো তাহলে রোযা থাকাকালীন কেউ নরহত্যার
ন্যায় পাপ করতো না, মিথ্যা কথা বলতো না, উৎকোচ নিতো না ও দিত না। মানুষের এই
বদভ্যাস দূর করার জন্য এবং এই সব মারাত্মক ব্যাধি থেকে মানুষকে মুক্ত করে পবিত্র
জীবন দান করার জন্য রোযাব্রত। রোযাব্রত পালন করেও মানুষের কোন লাভ হবে না, যদি না
তার স্বভাবের পরিবর্তন হয়। পুরানো স্বভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে নূতন স্বভাব যা জীবনের সৎ পথের সাথে যুক্ত তা অন্তরে
সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য রোযাব্রত অবতীর্ণ হয় পবিত্র রমজান মাসে। সত্যকে জেনে ও
সত্যকে মেনে যারা ব্রত উদযাপন করে কেবল তারাই কল্যাণ লাভ করে, বাকীরা যে তিমিরে
ছিল সেই তিমিরেই থেকে যায়, তাদের অন্তরের কোন পরিবর্তন হয় না।
১৮৫) রমজান মাস,
এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী রূপে
কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে অবশ্যই
রোযা রাখে। আর যে রোগী অথবা মুসাফির, (প্রবাসী) তাকে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করতে
হবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যা সহজ (তা) করতে চান, তোমাদের কষ্ট চান না। (
উদ্দেশ্য) যাতে তোমরা নির্ধারিত দিনের রোযার সংখ্যা পূর্ণ করতে পার, আর তোমাদেরকে
সৎপথে চালিত করার জন্য তোমরা আল্লাহ্র মহিমা বর্ণনা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।
মর্মার্থঃ—কুরআন
রমজান মাসে অবতীর্ণ হয় মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যাবার জন্যে, এই সত্য কেউ অস্বীকার
করতে পারবে না। কিন্তু মানুষ যদি জীবনকে কুরআনময় বা আলোময় করে তোলার জন্য চেষ্টা ও
সাধনা না করে তবে কিভাবে তাদের জীবন সৎ পথের দিশারী হয়ে পবিত্র হবে? পবিত্র জীবন
লাভ করার জন্যই রোযাব্রত পালন করা অথচ দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ মানুষ অপবিত্র
অবস্থাতেই থেকে যাচ্ছে, পবিত্রতার কিছুই উপলব্ধি করতে পারছে না। এই আয়াতে নির্ধারিত দিনের রোযার সংখ্যা সকলকে
পূর্ণ করতে বলা হয়েছে, এর অর্থ নির্ধারিত দিনের রোযার সংখ্যার মধ্যে সত্যজ্ঞান লাভ
করে মানুষকে পবিত্র জীবন লাভ করতে হবে। আল্লাহ্ বা ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে একটা নির্ধারিত সময় দেন
পবিত্র হয়ে উঠার জন্য, সেই সময় পার হলেই চলে তার পরীক্ষা, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না
হলে কেউ এখানে পরবর্তী পর্যায়ে যাবার সুযোগ পায় না।
১৮৬) আর আমার
বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে প্রশ্ন করে, তখন তুমি বল, আমি তো কাছেই আছি।
যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। অতএব তারাও আমার ডাকে
সাড়া দিক এবং আমাতে বিশ্বাস স্থাপন করুক, যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে।
মর্মার্থঃ—এই আয়াতে বিশ্ববাসীর মনের ভুল ও অবিশ্বাস আল্লাহ্ ভেঙ্গে
দিয়েছেন এবং নিজে বলেছেন যে – আমি তো সবার
কাছেই আছি এবং সবার ডাকেই সাড়া দিই। এখন কথা হচ্ছে কেউ যদি ঈশ্বরকে না ডাকে তবে কি
তিনি সাড়া দিতে পারেন? যদি মানুষ ঈশ্বরের ডাকে সাড়া না দেয়, তাঁকে বিশ্বাস না করে
তবে কি তিনি মানুষের ডাকে সাড়া দিবেন ও তাদের বিশ্বাস করবেন? তিনি সবার অভিভাবক
হয়ে সহজ সরল ভাবে কি সুন্দর ভাবে বলেছেন—তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমাতে
বিশ্বাস স্থাপন করুক,যাতে তারা ঠিক পথে চলতে পারে। এই আয়াতটি রোযাকে কেন্দ্র করে
অবতীর্ণ হয়। এক সত্যজ্ঞানের স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে সৎ পথের দিশারী হয়ে এই পৃথিবীর
বুকে মানুষকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থাকতে হবে, সত্যজ্ঞানের স্তম্ভ হচ্ছে
আল্লাহ্, তিনি সবার হৃদয় মন্দিরের দেবতা, তাঁর দেওয়া বিধান মেনে চলে জীবন
অতিবাহিত করায় হচ্ছে সৎ পথ। মানব জীবনে ঈশ্বরের সমীপে থাকা, তাঁর সাথে কথা বলা,
তাঁর ডাকে সাড়া দেওয়া, নিজের অন্তরের সব কথা তাঁকে বলা, তাঁর সাহায্য- সহযোগিতা
নিয়ে সৎ কর্ম করা, নিজেকে তাঁর বন্ধু, বান্দা ইত্যাদি সম্পর্কের আত্মীয়রূপে গড়ে
তোলার প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্যই এই রোযার বিধান। এই সত্য না জেনে- শুনে যদি কেউ
ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আবদ্ধ হয়ে রোযাব্রত পালন করতে যায় তবে তো সে নিজের আত্মাকে সেই
গোঁড়ামিতেই আবদ্ধ রেখে অন্ধকার জগতেই থেকে যাবে। মানুষকে মনে রাখতে হবে পবিত্র
কুরআনের কোন আয়াত ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আবদ্ধ নয়, সবই জ্ঞানের আলোতে আলোকিত, মানুষকে
সৎ - সত্য- সুন্দর ও জ্যোতির্ময় রূপে গড়ে তোলার জন্য।
১৮৭) রোযার রাতে
তোমাদের জন্য স্ত্রীসম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের
পোশাক। আল্লাহ্ জানতেন যে, তোমরা আত্মপ্রতারণা করছ। তাই তো তিনি তোমাদের প্রতি
সদয় হয়েছেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করেছেন। অতএব এখন তোমরা পত্নীদের সঙ্গে সহবাস
করতে পার এবং আল্লাহ্ তোমাদের জন্য যা (সন্তান) লিখে রেখেছেন তা কামনা কর। আর
তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হতে ঊষার শুভ্র রেখা স্পষ্টরূপে
তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত পর্যন্ত রোযা পূর্ণ কর। আর তোমরা মসজিদেই
ইতেকাফরত অবস্থায় স্ত্রী সহবাস কর না। এগুলো আল্লাহ্র সীমারেখা, সুতরাং এর ধারে
কাছে যেও না। এভাবে আল্লাহ্ মানুষের জন্য তাঁর নিদর্শনাবলী সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত
করেন, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলতে পারে।
মর্মার্থঃ—এই
আয়াতে মানুষকে পাশবিক প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে মানবিক গুণের প্রকাশ বিকাশ ঘটানোর
প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পত্নীরা কেবল ভোগের বিষয় বস্তু নয়, আবার স্বামীরাও
কেবল স্ত্রীদেরকে দৈহিক বা রতিসুখ দিয়ে পরিতৃপ্ত করার জন্য নয়। উভয়ে উভয়ের জ্ঞানের
পোশাক, এই পোশাক না পড়ে যারা কেবল দৈহিক উত্তেজনা বশতঃ একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে
সহবাস করে তারা তো পাশবিক প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে এই মিলনের সত্যজ্ঞান থেকে বঞ্চিত
থেকেই যায়। রোজাব্রত পালন করে দেহ- মন- প্রাণ – আত্মা এক সত্যবিন্দুতে যখন অবস্থান
করে তখন মানুষের দেহের সমস্ত কোষ চৈতন্যময় হয়ে যায়, এই অবস্থায় মানুষের রক্ত-
বীর্যে অমৃতের ধারা প্রবাহিত হয়, নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধারা প্রবাহিত হয়। এই
অবস্থায় স্বামী- স্ত্রী যেমন আত্মাকে কামনা করে প্রার্থনা করবে আত্মাস্বরূপ পুত্র-
কন্যার জন্য তারা আল্লাহ্র নিকট থেকে তাই পাবে। সেই জন্যেই এখানে সহবাসকে বৈধ বলে
স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রোযাব্রত একটা জীবনের প্রশিক্ষণ পর্ব যা সারা জীবনের
প্রক্রিয়া। যা শুরু করা হয় আকাশের চন্দ্র ও সূর্যকে কেন্দ্র করে ও তাদের পথ ধরে। তাই
মনে রাখতে হবে আকাশে চন্দ্র- সূর্য যতদিন থাকবে ততদিন রোযাব্রত প্রক্রিয়া
স্বাভাবিকভাবেই জীবনকে ঘিরে চলতে থাকবে, কোন অবস্থাতেই এই ব্রত বন্ধ হবে না, যদি
মানুষ সত্যজ্ঞানী হয়ে সৎ পথে এগিয়ে চলে। পানাহারের ব্যাপারে অবশ্যই মানুষকে পাশবিক
প্রবৃত্তিকে ত্যাগ করে পবিত্র ও পরিমিত আহারে অভ্যস্থ হতে হবে, এটাও রোযাব্রত
পালনের প্রশিক্ষণ মানব জীবনকে পবিত্র করে গড়ে তোলার জন্য। যারা আল্লাহ্র আয়াতকে
স্বল্প মূল্যে ক্রয় করে, তারা কেউ এসব তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে না।
১৮৮) এবং তোমরা একে অন্যের ধন অন্যায়ভাবে গ্রাস
করো না এবং মানুষের ধনসম্পদের কিয়দংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে
বিচারকগণকে উৎকোচ দিও না।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্
বা ঈশ্বর যা দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থেকে সত্যজ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে নাযাম অন্তরে
সুপ্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত মানুষ সৎ পথে চলার অধিকার পায় না। মানুষের মন আর অন্তরের
কথা এক না হলে, সৎ পথে চলার অধিকার সে লাভ
করতে পারে না। আর সৎ পথের পথিক না হলে মানুষ
কামনা- বাসনা থেকে মুক্ত হতে পারে না। এই জগতের সম্পদের প্রতি লোভ মানুষকে
প্রতিপদে পদে ধাওয়া করে। তাই যেকোন শয়তানী বুদ্ধি খাটিয়ে মানুষ একে অপরের ধন নিজের
অধীনে নিয়ে আনতে সদায় তৎপর। যত মামলা মকর্দমা সবকিছুর মূলে মানুষের অসৎ প্রবৃত্তি
কাজ করে। মানুষকে অসৎ প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করার জন্যেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। একজন
উৎকোচ নিচ্ছে ও একজন তা দিচ্ছে, এর প্রভাব গোটা দুনিয়ার মানব সমাজের উপর গিয়ে পড়ছে
ও সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, এই সত্য না জানা পর্যন্ত কেউ এই অন্যায় কাজ করা থেকে
মুক্ত হবে না।
জয় বিশ্বমানব
শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।


No comments:
Post a Comment