Sunday, 5 August 2018

কুরআন সুরা--৩ আলে-- ইমরান-- ১৫১ থেকে ১৫৫ আয়াত

বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—৩ আলে- ইমরান—১৫১ থেকে ১৫৫ আয়াত।]
  ১৫১) যারা অবিশ্বাস করে তাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করব, যেহেতু তারা আল্লাহ্‌র শরীক করেছে। যার সপক্ষে আল্লাহ্‌ কোন প্রমাণ পাঠাননি। জাহান্নাম তাদের নিবাস। অত্যাচারীদের আবাসস্থল অতি নিকৃষ্ট।
    মর্মার্থঃ—যারা নিজের অন্তরের অবিশ্বাসকে জ্ঞান দ্বারা ছেদন করতে পারে না তারাই অবিশ্বাসী, ভীতু, পরনির্ভরশীল ও পরমুখাপেক্ষী সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায় নিজের আত্মার প্রতি বিশ্বাস করতে না পারার জন্য নিজের আল্লাহ্‌র প্রতিও অবিশ্বাস পোষণ করে দুর্বল জাতিতে পরিণত হয় এবং পরনির্ভরশীল ও পরমুখাপেক্ষী হয়ে পরে অর্থাৎ নিজ আত্মার ধর্মকে বিক্রি করে আল্লাহ্‌র শরীক বানিয়ে দুঃখের হাত থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা করে। আল্লাহ্‌ নিজ আত্মার ধর্মকে অন্যের ধর্মের সাথে যুক্ত করে মানুষের স্বভাব বিনষ্ট করার জন্য কোন প্রমাণ পাঠান নি। যারা নিজের সৎ -সত্য- সুন্দর- জ্যোতির্ময় আত্মাকে কলুষিত করে জাগতিক কামনা- বাসনাকে শরিক করে তাদের স্থান জাহান্নাম। এই সব লোক আল্লাহ্‌কে বাদ দিয়ে জাগতিক কামনা- বাসনার পিছনে ছুটতে গিয়ে অত্যাচারী হয়ে উঠে নিজের প্রতি ও অন্যের প্রতি, আর এরাই তৈরি করতে থাকে সেই শরীককে অবলম্বন করে অত্যাচারীদের  জন্য অতি নিকৃষ্ট আবাসস্থল জাহান্নাম।
       ১৫২) আর আল্লাহ্‌ অবশ্য তোমাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন, যখন তোমরা আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে তাদের বিনাশ করছিলে, যতক্ষণ না তোমরা সাহস হারিয়েছিলে এবং নির্দেশ সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছিলে এবং যা তোমরা পছন্দ কর তা (জয়) তোমাদের দেখানোর পর তোমরা অবাধ্য হয়েছিলে। তোমাদের কতক ইহকাল চেয়েছিল এবং কতক পরকাল চেয়েছিল। সুতরাং তিনি পরীক্ষা করার জন্য তোমাদেরকে তাদের থেকে ফিরিয়ে দিলেন। তবুও ( কিন্তু) তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং আল্লাহ্‌ বিশ্বাসীদের প্রতি অনুগ্রহশীল।
        মর্মার্থঃ—যখনি মানুষ ধর্মযুদ্ধে বা জেহাদে নিজের জীবন উৎসর্গ করে তখনি তার প্রতিপালক নিজের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন। জেহাদে অংশ গ্রহণ করে আল্লাহ্‌র অনুমতি ক্রমে সকলকেই বীরবিক্রমে অন্যায়- অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই অন্তরে সত্যজ্ঞান ও বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। অনেক সময় বড় বড় যোদ্ধারাও নিজেদের চিত্তকে দুর্বল করে সাহস হারিয়ে ফেলে এবং নিজেদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করে একে অপরের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর  পিছনে আল্লাহ্‌র চাকচিক্যময় জাগতিক সংসার কাজ করে। কেউ এই পথে জীবন উৎসর্গ করে ইহকালের সুখ ঐশ্বর্য ভোগ করার সামগ্রী চায়, কেউ পরকালের জীবনকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে পেতে চায়। তিনি সকলকে পরীক্ষা করার জন্য উভয় পথই খোলা রেখেছেন এবং সকলকেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেন পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়কেও ফিরিয়ে এনে। তিনি সবার প্রতি ক্ষমাশীল ও বিশ্বাসীদের প্রতি অনুগ্রহশীল হয়ে তাঁর আশ্রয়ে সকলকে ধরে রাখেন এবং ধর্মযুদ্ধ বা জেহাদের মাধ্যমে মানুষের সন্ত্রাসবাদী ও অত্যাচারী স্বভাবকে ধ্বংস করে পবিত্র জীবন দান করেন।
          ১৫৩) ( স্মরণ কর)  তোমরা যখন উপরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিলে এবং পিছনে কারও প্রতি লক্ষ্য করছিলে না, যদিও রসূল তোমাদেরকে পিছন দিক থেকে আহ্বান করছিল। ফলে তিনি তোমাদেরকে দুঃখের উপর দুঃখ দিলেন, যাতে তোমরা যা হারিয়েছ অথবা যে বিপদ তোমাদের উপর এসেছে, তার জন্য তোমরা দুঃখিত না হও। তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ তা বিশেষভাবে অবহিত।
        মর্মার্থঃ—মানুষের মনোভাব একাই থাকবো, নিজে ভাল থাকবো, নিজে ভাল খাবো, নিজের সার্বিক উন্নতি করবো আর সকলে আমার পিছনে পড়ে থাক, এই চিন্তা করে অধিকাংশ মানুষ এই বিশ্বের বুকে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে, পিছনে যারা পড়ে আছে তাদের দিকে লক্ষ্য করারও সময় পায় না। একমাত্র বিবেকবান রসূল যারা সবার কথা চিন্তা করেন হাতে আলোর বর্তিকা নিয়ে, তাঁরাই মনে করিয়ে দেন মানব জীবনের কর্তব্য কর্মের কথা। আল্লাহ্‌ এই শ্রেণির মানুষের উপর বিপদের উপর আরো বেশী বিপদ এনে, দুঃখের উপর দুঃখ চাপিয়ে দিয়ে পবিত্র করার ব্যবস্থা করেন। মানুষ যা করে আল্লাহ্‌ তা বিশেষভাবে অবহিত, তাই তাঁর আশ্রয়ে থেকে, নিজের জীবন রক্ষার্থে কাউকে ছেড়ে উপরের দিকে পলায়ন করা জেহাদে কাপুরুষতার লক্ষণ।
        ১৫৪) অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দুঃখের পর নিরাপত্তা প্রদান করলেন, যা তোমাদের এক দলকে তন্দ্রাভিভুত করেছিল এবং একদল প্রাক ইসলামী যুগে অজ্ঞের ন্যায় আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে অবান্তর ধারণা করে নিজেরাই নিজেদের উদ্বিগ্ন করেছিল; এই বলে যে, আমাদের কি কিছু করণীয় আছে? বল, সমস্ত বিষয় আল্লাহ্‌রই অধীন। যা তারা তোমার নিকট প্রকাশ করে না তাদের অন্তরে গোপন রাখে। তারা বলত, যদি এ ব্যাপারে আমাদের কোন কিছু করণীয় থাকত তবে আমরা এখানে নিহত হতাম না। বল, যদি তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান করতে তবুও নিহত হওয়া যাদের অবধারিত ছিল, তারা নিজেদের  শয়ন স্থানে ( মৃত্যু স্থানে) বের হত এবং আল্লাহ্‌ এভাবে তোমাদের অন্তরে যা আছে তা পরীক্ষা করেন ও তোমাদের অন্তরে যা আছে তা পরিশোধন করেন। অন্তরে যা আছে আল্লাহ্‌ সে সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত।
       মর্মার্থঃ—তোমার আল্লাহ্‌ই সব করবেন কিন্তু তোমাকে তাঁর প্রতিনিধি হয়ে জেহাদে অংশ গ্রহণ করতেই হবে, নচেৎ তুমি চিরকাল সত্য থেকে বঞ্চিত থেকে অপবিত্র হয়েই থেকে যাবে। মানুষের অন্ধবিশ্বাস ছিল আল্লাহ্‌ এমন এক শক্তি তিনি সরাসরি এসে মানুষকে সাহায্য করবেন, না হয় শাস্তি দিবেন, তাঁর ইচ্ছার বাইরে মানুষের কিছুই করার নেই। তাই অলস হয়ে ঘরে বসে থাকাটাই হচ্ছে মানুষের ধর্ম। এই পরনির্ভরশীল ও পরমুখাপেক্ষী জাতিকে কি আল্লাহ্‌ জ্ঞান দিবেন ও আলোর ঝর্নায় স্নান করাবেন পবিত্র করে নিজ ঘরে তুলে নেওয়ার জন্য? বাঁচার জন্য সংগ্রাম করতে হবে না তোমাদেরকে ঘরে লুকিয়ে থেকে, বরঞ্চ তোমরা ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে মৃত্যুর সাথে সংগ্রাম করে জয়ী হও এবং পবিত্র জীবন লাভ করে অমরত্ব লাভ কর। আল্লাহ্‌ তোমাদের অন্তরে যা কিছু আছে, সবকিছুর খবর জানেন, তাই তো তিনি তোমাদের অন্তরকে আবর্জনা মুক্ত করে পরিশুদ্ধ করে তুলতে চান। তোমরা তোমাদের অন্তর খুলে দেখতে শিখো তাহলেই দেখতে পাবে কত আবর্জনার স্তূপ সাজিয়ে রেখেছো সেখানে।
        ১৫৫) যেদিন দুদল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল সেদিন যারা পৃষ্ট প্রদর্শন করেছিল, তাদের কোন কৃতকর্মের জন্য শয়তানই তাদের পদখ্বলন ঘটিয়েছিল। আল্লাহ্‌ অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম সহিষ্ণু।
    মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌র ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী, জ্ঞানী ও অজ্ঞানী, সংশয়ী চিত্ত ও মুক্ত চিত্তের মানুষের সম্মেলন প্রতিনিয়ত হতেই থাকে এই প্রকৃতির বুকে। যারা বিশ্বাসী, জ্ঞানী ও মুক্ত চিত্তের মানুষ তাদের কাছে শয়তান ভিরতে পারে না কিন্তু যারা অবিশ্বাসী, অজ্ঞ ও সংশয়ী চিত্তের মানুষ তাদের বুদ্ধিকে ক্রয় করে নেয় শয়তান, তাই তারা সৎ সঙ্গ পেয়েও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। তবুও আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম সহিষ্ণু হয়ে তাদেরকে বার বার সৎ পথের দিশারী হবার সুযোগ করে দেন।
         জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:

Post a Comment