Tuesday, 28 August 2018

কুরআন সুরা--৫ মায়িদাহ ---৩৬ থেকে ৪৫ আয়াত

    বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো[ সুরা—৫ মায়িদাহ—৩৬ থেকে ৪৫ আয়াত।]
  ৩৬) যারা অবিশ্বাস করেছে, কিয়ামতের দিন( শেষ বিচারের দিন) শাস্তি হতে মুক্তির জন্য পণস্বরূপ পৃথিবীতে যা কিছু আছে, যদি তাদের তার সমস্ত থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও থাকে তবুও তাদের নিকট হতে তা গৃহীত হবে না এবং তাদের জন্য কঠিন শাস্তি বর্তমান।
       মর্মার্থঃ—যারা নিজের জীবনের সাথে আল্লাহ্‌র জীবনকে অর্থাৎ তাঁর অবতীর্ণ আয়াতকে যুক্ত করে নিজের চরিত্র উজ্জ্বল করে তোলে না তারাই অবিশ্বাসী। তারা এই পৃথিবীর ধন- দৌলতের সাথে আরও সমপরিমান ধন- দৌলত দিলেও শেষ বিচারের দিন তা গৃহীত হবে না এবং তাদের শাস্তি মুকুব করা হবে না। এই পৃথিবীতে মানুষ ধন- দৌলত সঞ্চয় করার জন্য আসে না, এই পবিত্র ভূমি সকলের জন্য কর্মভূমি, জ্ঞানপীঠ ও তীর্থভূমি। তাই এখানে মানুষকে এসে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলের সাথে সম্পর্ক তৈরী করে সৎ কর্ম, সত্যজ্ঞান ও পুণ্য সঞ্চয় করে ফিরে যেতে হয়।
     ৩৭) তারা আগুন থেকে বের হতে চাবে, কিন্তু তারা তা থেকে বের হতে পারবে না এবং তাদের জন্য স্থায়ী শাস্তি রয়েছে।
      মর্মার্থঃ—পাপ ও অন্যায় কাজ করলেই মানুষকে ইহলোকে ও পরলোকে আগুন গ্রাস করার জন্য তাড়া করে। এই আগুনের গ্রাস থেকে তারা মুক্ত হবার চেষ্টা করলেও মুক্ত হতে পারবে না। অজ্ঞানীরা মনে করে মরে গেলেই মানুষের আর কিছু থাকে না। কিন্তু জ্ঞানীরা জানে মৃত্যুর পরেই মানব জীবনের আসল কাজ শুরু হয় স্থায়ীভাবে। মৃত্যুর পর মানুষ যে দেহ লাভ করে তা অতি সচেতন ও অতি অনুভূতিশীল।
      ৩৮) পুরুষ কিংবা নারী চুরি করলে তাদের হস্তচ্ছেদন কর, এ তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহ্‌র নির্ধারিত আদর্শ দণ্ড, বস্তুত আল্লাহ্‌ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
       মর্মার্থঃ—জাগতিক সুখের জন্য কেউ যাতে অন্যায় ও পাপ কর্ম না করে সেই জন্যই এই বিধান। আল্লাহ্‌ পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় হয়ে তিনি মানুষকে পবিত্র করে তুলে নিতে চান এবং চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তির আলয়ে আশ্রয় দিতে চান, এই আয়াতের মাধ্যমে নারী ও পুরুষদের এই শুভ সংবাদ দিয়েছেন।
     ৩৯) কিন্তু কেউ অত্যাচার করার পর অনুশোচনা করলে ও নিজেকে সংশোধন করলে আল্লাহ্‌ তাঁর প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
        মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু, শত পাপ, অন্যায় ও অত্যাচার করার পরেও যদি কেউ নিজের ভুল নিজে ধরতে পেরে অনুশোচনা করে ও নিজেকে সংশোধন করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে আল্লাহ্‌র আশ্রয়ে আসে তবে সে উদারমনা হয়ে উঠে এবং তাঁর কৃপা লাভ করে।
      ৪০) তুমি কি জান না যে, আকাশ ও ভূমণ্ডলের সার্বভৌমত্ব আল্লাহ্‌রই, যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন এবং আল্লাহ্‌ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।
     মর্মার্থঃ—আকাশ ও ভূমণ্ডলের সার্বভৌমত্ব আল্লাহ্‌রই, তাঁর লীলা তিনিই জানেন। তিনি কাকে কিভাবে শাস্তি দিবেন ও ক্ষমা করবেন তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য বিষয় নয়। তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান, তাই তিনি সবার অন্তরের কথা জানেন এবং তা জেনেই বিচার করেন।
       ৪১) হে রসূল! যারা মুখে বলে, বিশ্বাস করেছি, কিন্তু অন্তরে বিশ্বাসী নয় ও যারা ইহুদী হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসে তৎপর, তাদের আচরণ যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়। ওরা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল, যে সম্প্রদায় তোমার নিকট আসেনি ওরা তাদের জন্য কান পেতে থাকে। শব্দালো যথাযথ বিন্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তারা সেগুলোর অর্থ বিকৃত করে। তারা বলে, এ প্রকার (বিকৃত) বিধান দিলে গ্রহণ কর এবং তা (বিকৃত) না হলে বর্জন কর। এবং আল্লাহ্‌ যার পথচ্যুতি চান তার জন্য আল্লাহ্‌র নিকট তোমার কিছুই করার নেই। ঐ সকল লোকের হৃদয়কে আল্লাহ্‌ বিশুদ্ধ করতে চান না, তাদের জন্য আছে পৃথিবীতে লাঞ্ছনা ও পরকালে মহাশাস্তি।
     মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌ যাদেরকে পৃথিবীতে লাঞ্ছনা ও পরকালে মহাশাস্তি দিতে চান, তাদের হৃদয়ে তিনি কিছুতেই বিশুদ্ধ জ্ঞানের বাতি প্রজ্বলিত করবেন না। তারা মানুষ হয়েও নিজের ধর্ম জানতে পারবে না ও স্বভাবের পরিবর্তন ঘটাবে না।
      ৪২) তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল এবং অবৈধ উপায়ে লব্ধ বস্তু ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত, তারা যদি তোমার নিকট আসে তবে তাদের বিচার নিষ্পত্তি কর অথবা উপেক্ষা কর, তবে তারা তোমার কোন ক্ষতিকরতে পারবে না, আর যদি বিচার নিষ্পত্তি কর তবে ন্যায় বিচার কর, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ন্যায়পরায়ণদের ভালবাসেন।
      মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌ ন্যায়পরায়ণদের ভালবাসেন কিন্তু অবিশ্বাসীদের তিনি বিশ্বাস করেন না। অবিশ্বাসীরা মিথ্যা কথা শ্রবণ ও তার আলোচনা নিয়েই মশগুল থাকে। বিশ্বাসীদের তাদেরকে উপেক্ষা করায় বিধেয়।
       ৪৩) আর তারা তোমার উপর কিরূপে বিচার ভার ন্যস্ত করবে, যখন তাদের নিকট রয়েছে তওরাত যাতে আছে আল্লাহ্‌র আদেশ? এরপরও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং ওরা বিশ্বাসী নয়।
         মর্মার্থঃ—প্রত্যেক মানুষের কাছেই রয়েছে তার ধর্মগ্রন্থ। এই ধর্মগ্রন্থ থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন তার প্রতিপালককে অবজ্ঞা করছে ও তাঁর দেওয়া বিধান মানছে না? যারা নিজের ধর্মগ্রন্থ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তারাই অবিশ্বাসী, মূলতঃ সমস্ত ধর্মগ্রন্থ-ই এক।
        ৪৪) নিশ্চয় আমি তওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম, ওতে ছিল পথনির্দেশ ও আলো, নবীগণ যারা আল্লাহ্‌র অনুগত ছিল তারা ইহুদীদের তদনুসারে বিধান দিত, জ্ঞান সাধক এবং পণ্ডিতগণও বিধান দিত, কারণ তাদেরকে আল্লাহ্‌র কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল এবং তারা ছিল ওর সাক্ষী। সুতরাং মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর এবং আমার আয়াত নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করো না। আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অবিশ্বাসী।
         মর্মার্থঃ—আল্লাহ্‌র আয়াতের মর্মার্থ না বুঝে যারা তা নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করে তারাই অবিশ্বাসী ও পৃথিবীতে শান্তি বিঘ্নকারী। তওরাতের ন্যায় প্রচুর কিতাব আল্লাহ্‌র নিকট থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এই পৃথিবীতে, প্রত্যেক কিতাবেই রয়েছে পথনির্দেশ ও আলো মানব জাতির জন্য। যারা জ্ঞানী ও বিশ্বাসী মানুষ তারাই কিতাবের মূল্য বুঝে কিতাবের রক্ষকের ভূমিকা পালন করে এবং কিতাবের বিধান দান করে মানব জাতিকে সত্য ও শান্তির পথ দেখায়।
      ৪৫) আর তাদের জন্য ওতে ( তওরাতে) বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং জখমের বদলে অনুরূপ জখম। অতঃপর কেউ তা ক্ষমা করলে ওতে তারই পাপ মোচন হবে। এবং আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই অত্যাচারী।
   মর্মার্থঃ—মানব সমাজের কেউ যাতে অত্যাচারী না হয় সেই জন্য এই বিধান। এই বিধানকে অবজ্ঞা করে কেউ যদি মানুষ হয়ে মানুষের উপর অত্যাচার করে তবে তো তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তাসত্ত্বেও কেউ যদি ক্ষমা করে ওতে ক্ষমাকারীর পুণ্যের সংহতি হবে এবং তার কৃত পাপ সবই মোচন হয়ে যাবে। যারা আল্লাহ্‌ যে বিধান দিয়েছেন সেই অনুসারে বিধান দেন না তারাই অবিশ্বাসী ও অত্যাচারীর ভূমিকা পালন করে।
    জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:

Post a Comment