বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—৪ নিসা—৬৬ থেকে ৭৫ আয়াত।]
৬৬) আর যদি তাদেরকে আদেশ দিতাম যে, তোমরা নিহত হও অথবা আপন গৃহ ত্যাগ কর
তবে অল্পসংখ্যকই তা মান্য করত। এবং যা করতে তাদের উপদেশ দেয়া হয়েছিল যদি তারা তা
করত তবে তাদের নিশ্চয়ই ভাল হতো এবং চিত্তস্থিরতায় তারা দৃঢ়তর হত।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ সবার জন্যই মঙ্গলময়, তিনি যা উপদেশ দেন তা মেনে চললে
কোন মানুষের অমঙ্গল হতে পারে না। তিনি কাউকে হত্যা করার যেমন উপদেশ দেন না তেমনি
তাঁর পথে গিয়ে কেউ নিহত হোক সেটাও চান না। তিনি কাউকে গৃহত্যাগ করতেও যেমন উপদেশ
দেন না তেমনি কাউকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করার কথাও বলেন না। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক
লোক তাঁর উপদেশ ও তত্ত্বজ্ঞানের উপর ভর করে চলে। যদি মানুষ তাঁর দেওয়া উপদেশ ও
তত্ত্বজ্ঞানকে মান্য করে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম করতো তবে তারা সকলেই
নিজের চিত্তকে স্থির করে চোদ্দপুরুষকে মুক্ত করতে সক্ষম হতো এবং সকলেই আল্লাহ্র
আলোর বর্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র গৃহ থেকে বের হয়ে বৃহৎ গৃহ আলোকিত করতো।
৬৭) আর তখন আমি আমার নিকট থেকে তাদেরকে নিশ্চয় মহাপুরষ্কার প্রদান করতাম।
মর্মার্থঃ—যারা সংকীর্ণ চিত্ত থেকে মুক্ত হয়ে ব্যাপ্তির উদ্দেশ্যে যাত্রা
করে তাদের জন্যেই আল্লাহ্র মহাপুরষ্কার অপেক্ষা করে, তা তিনি এই আয়াতে নিশ্চিত
করে দিয়েছেন।
৬৮) এবং তাদেরকে নিশ্চয় সরল পথে পরিচালিত করতাম।
মর্মার্থঃ—মানুষ যত সঙ্কীর্ণ মন থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহ্র মনের সাথে যুক্ত
হবে ততই সে বক্র পথ থেকে মুক্ত হয়ে সরল পথে গমন করতে থাকবে সাফল্যের সাথে।
৬৯) আর যে কেউ আল্লাহ্ এবং রসূলের অনুসরণ করবে(
শেষ বিচারের দিন) আল্লাহ্ যাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন সে তাদের সঙ্গী হবে; যেমন
সত্যবাদী, শহীদ ও সৎকর্মশীল! এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী।
মর্মার্থঃ—যারা আল্লাহ্ ও রসূলের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকে, তারা পরকালেও উত্তম
সঙ্গীদের সাথেই থাকবে, এরা সকলেই সত্যবাদী, শহীদ ও সৎকর্মশীল হয়ে এই পৃথিবীর বুকে
কাজ করে গেছে। এদের জন্য আল্লাহ্র এক পবিত্র অক্ষয় বলয় রয়েছে যা এই পৃথিবী থেকে
কয়েক লক্ষ গুণ সবদিক থেকে বড়।
৭০) এটা আল্লাহ্র অনুগ্রহ। বস্তুত আল্লাহ্ই
জ্ঞানে যথেষ্ট।
মর্মার্থঃ--- আল্লাহ্র এই অনুগ্রহ লাভ না করলে কেউ তাঁর জ্ঞানের সীমা
উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে না এবং কল্পনাও করতে পারবে না তাঁর রাজত্বের পরিধি কত
বিশাল। তিনিই কেবল জানেন তাঁর জ্ঞানের বিশালত্বের কথা।
৭১) হে বিশ্বাসীগণ! সতর্কতা অবলম্বন কর, অতঃপর দলে দলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর
হও অথবা একসঙ্গে অগ্রসর হও।
মর্মার্থঃ—যদি আল্লাহ্ ও তাঁর বিশালত্বকে বিশ্বাস করে বিশ্বাসীর পদে বসে
থাকো তবে সব অহংকার তাঁর চরণে সমর্পণ করে নিজের চিত্তকে স্থির কর। তারপরে দলে দলে
ভাগ হয়ে তাঁর সত্যবাণী সকলকে জানাতে থাকো, এতেই তোমাদের উৎসাহ বেড়ে যাবে সৎ
কর্মানুষ্ঠান করার জন্য। সৎ কর্মানুষ্ঠান একসঙ্গে হোক আর দলে দলে ভাগ করেই হোক যত
করবে ততই তোমাদের মঙ্গল।
৭২) আর তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে গড়িমসি করবেই। তোমাদের কোন বিপদ হলে
সে বলবে, আল্লাহ্ আমার প্রতি অত্যন্ত দয়া করেছেন যে, আমি তাদের সঙ্গে উপস্থিত
ছিলাম না।
মর্মার্থঃ—সৎ কর্মানুষ্ঠান করতে গিয়ে বিভিন্ন মনোভাবের লোককে দেখবে পাবে।
তাদের যা স্বভাব সেই অনুযায়ী কথা বলবে, তোমরা সে সব থেকে মুক্ত হয়ে এগিয়ে যাবে
ব্যাপ্তির অভিমুখে।
৭৩) আর যদি তোমাদের উপর আল্লাহ্র অনুগ্রহ হয়, তবে যেন তোমাদের ও তাদের
মধ্যে কোন সম্বন্ধই ছিল না এভাবে বলে, হায়! যদি তাদের সাথে থাকতাম তবে আমিও বিরাট
সাফল্য লাভ করতাম।
মর্মার্থঃ—যারা ভাল কাজে অংশ গ্রহণ করে না, তারা জীবনে সাফল্য লাভ করতেও
পারে না। তাদেরকে অপরের জীবনের সাফল্য দেখে কেবল আফসোস করতে হয়।
৭৪) অতএব যারা পরকালের বিনিময়ে
পার্থিব জীবন বিক্রয় করে তাদের আল্লাহ্র পথে সংগ্রাম করা উচিত। বস্তুত যে আল্লাহ্র
পথে সংগ্রাম করে সে নিহত হোক অথবা বিজয়ী হোক, তাকে আমি শীঘ্রই মহাপুরষ্কার দান
করব।
মর্মার্থঃ—পার্থিব জীবনের সুখ- দুঃখ ক্ষণিকের স্বপ্ন মাত্র। তাই যারা
সত্যকে জেনে পরকালের জন্য পার্থিব জীবনকে তুচ্ছ মনে করে, তা বিক্রয় করে মূল্যবান
পরকালের জন্য সম্পত্তি ক্রয় করতে থাকে তাঁরাই জ্ঞান দ্বারা অজ্ঞানকে ছেদন করে
আল্লাহ্র আলোর রাজত্বের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এরা আল্লাহ্র পথে সংগ্রাম করতে
গিয়ে নিহত হোক বা বিজয়ী হোক, তাদের কোন দুঃখ নেই, তাদেরকে আল্লাহ্ মহাপুরষ্কার
দান করবেন।
৭৫) তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহ্র পথে
এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের জন্য সংগ্রাম করবে না? যারা বলেছে, হে আমাদের
প্রতিপালক! এ অত্যাচারী শাসকের দেশ হতে আমাদের অন্যত্র নিয়ে যাও এবং তোমার নিকট
হতে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার নিকট হতে কাউকে আমাদের সহায় কর।
মর্মার্থঃ—অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করলে তা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে
থাকে। আর এই অত্যাচারের শিকার হয় সমাজের অসহায় নরনারী ও শিশু। জ্ঞানীরা যদি এই
দেখেও ঘরে নিরবে নিশ্চিন্তে বসে থাকে তবে তারাও অত্যাচারীদের সমর্থক হয়ে যায়। তাই
অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে জ্ঞানীদের সংগ্রাম জীবন্ত করে ধরে রাখা একান্ত প্রয়োজন।
জ্ঞানীদের কণ্ঠ জীবন্তরূপে অবস্থান করলে সমাজের কেউ কারো প্রতি অত্যাচার করতে
সক্ষম হবে না। সেই সাথে কোন মানুষ নিজেকে অসহায় ভাববে না।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment