বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র
কুরআনের আলো। [ সুরা—৪ নিসা—৭৬ থেকে ৮০ আয়াত।]
৭৬) যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহ্র
পথে সংগ্রাম করে এবং যারা অবিশ্বাসী তারা তাগুতের পথে সংগ্রাম করে, সুতরাং তোমরা শয়তানের
বন্ধুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কর, শয়তানের কৌশল দুর্বল।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্র পথ
পবিত্রতা ও জ্ঞানের পথ। এই পথে নেই কোন আবর্জনা, নেই কোন অন্ধকার, নেই জরা, রোগ-
শোক- মৃত্যুর ভয়। যারা জ্ঞানী ও বিশ্বাসী তারা কখনও এই পথ ছেড়ে অন্যপথে সীমালঙ্ঘন
করতে যায় না। আর যারা অবিশ্বাসী তাদের চিত্ত বড় দুর্বল ও চঞ্চল। এরা সদায়
সীমালঙ্ঘন করার পথেই সংগ্রাম করে নিজেদের কামনা- বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য,
শয়তানী বুদ্ধিকে আশ্রয় করে। বিশ্বাসী ও সত্যজ্ঞানীরা সদায় শয়তানের বন্ধুদের
বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজেদের সততা ও পবিত্রতার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে ধরে রাখার
জন্য। তারা জানে শয়তানের কৌশল বড় দুর্বল, এদেরকে সামান্য আঘাত দিলেই তারা বিলীন
হয়ে যাবে চিরকালের জন্য।
৭৭) তুমি কি তাদের দেখনি
যাদের বলা হয়েছিল, তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর ( যুদ্ধ বন্ধ কর) এবং যথাযথভাবে
নামায আদায় কর এবং যাকাত দাও। অতঃপর যখন তাদেরকে জেহাদের বিধান দেয়া হল তখন তাদের
একদল আল্লাহ্কে ভয় করার মত মানুষকে ভয় করছিল অথবা তদপেক্ষা অধিক, এবং তারা
বলেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য জিহাদের বিধান কেন দিলে? আমাদের
কিছুদিনের অবকাশ দাও না? বল, পার্থিব ভোগ সামান্য! এবং যে সংযমী তার জন্য পরকালই
উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না।
মর্মার্থঃ—পার্থিব জগতের সুখ
ভোগের আশায় অনেকে আল্লাহ্র পথে সংগ্রাম থেকে বিরত থাকে। তারা জানে না এই সুখ
ক্ষণিকের স্বপ্ন মাত্র। আর যারা আল্লাহ্কে ভয় করে নিজের অন্তর্জগতকে নিয়ন্ত্রণে
রাখে তাদের চিত্ত সদায় স্থির থাকে নিজ আত্মার সাথে এবং মন আলোকিত হয়ে আলো ছড়াতে
থাকে বিশ্বভুবনে। তারা যথাযথভাবে সদায় নামায আদায় যেমন করতে থাকে তেমনি যাকাত দিতে
থাকে কোনরূপ কৃপণতা না করে। মানুষ কেনো মানুষকে ভয় করে? এর পিছনে মানুষের কামনা-
বাসনার লোভ এমনভাবে যুক্ত থাকে যে শয়তানী বুদ্ধি দিয়ে মানুষ মানুষের সদায় ক্ষতি
করতে পারে, এই ক্ষতির ভয় আল্লাহ্র দিক থেকে নেই, তাঁকে ভয় করলে মানুষের অন্তর
নির্মল হয় ও চিত্ত স্থির থাকে।
৭৮) তোমরা যেখানেই থাক না
কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমন কি সুউচ্চ, সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করলেও। আর
যদি তাদের কোন কল্যাণ হয় তবে তারা বলে, এ তো আল্লাহ্র নিকট থেকে, আর যদি তাদের
কোন অকল্যাণ হয় তবে তারা বলে, এ তো তোমার নিকট থেকে। বল, সব কিছুই আল্লাহ্র নিকট
থেকে। এ সম্প্রদায়ের কী হয়েছে যে, এরা একেবারেই কোন কথা বোঝে না।
মর্মার্থঃ—মানব সম্প্রদায়
এমনি এক সম্প্রদায় যারা নিজের জ্ঞান- বুদ্ধি- বিবেক থাকতেও তাদের কাজে লাগায় না।
তারা ভালভাবেই জানে যার যখন মৃত্যু লেখা আছে, সে যেখানেই থাক মৃত্যু তাকে খুঁজে
বের করে নিয়ে যাবে, সুদৃঢ় দুর্গে লুকিয়ে থেকেও রেহায় পাবে না। তবু মৃত্যু ভয়ে তারা
অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ করে না, ফলস্বরূপ দিন দিন মানব সমাজে অন্যায় কাজকর্ম
বৃদ্ধি পেতেই থাকে। কল্যাণ ও অকল্যাণ মানব জীবনে সৎ ও অসৎ কর্মের প্রভাবে
স্বাভাবিকভাবেই আসে, জ্ঞানীরা তা জ্ঞানচক্ষুতে দেখতে পায়, অজ্ঞানীরা তা পায় না।
৭৯) তোমার যা কল্যাণ হয় তা
আল্লাহ্র নিকট থেকে এবং যা অকল্যাণ হয় তা তোমার নিজের কারণে, আর আমি তোমাকে
মানুষের জন্য রসূলরূপে প্রেরণ করেছি, সাক্ষী হিসাবে আল্লাহ্ই যথেষ্ট।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্
কল্যাণময়, তাই তাঁর দিক থেকে কোন অকল্যাণ আসতে পারে না, যা অকল্যাণ মানব জীবনে আসে
তা তাদের নিজেদের কর্মদোষের কারণে।
মানুষকে মানুষের কল্যাণের জন্য আলোর বর্তিকারূপে আল্লাহ্ এই পৃথিবীর বুকে প্রেরণ
করেন। যারা আল্লাহ্কে সাক্ষী রেখে তাঁর আশ্রয়ে থেকে আলোর বর্তিকা হয়ে জনকল্যাণে
নিজেকে নিয়োজিত করে রাখে তারাই সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।
৮০) যে রসূলের অনুসরণ করে সে তো আল্লাহ্রই
আনুগত্য করল এবং যে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তোমাকে আমি তাদের উপর প্রহরী রূপে প্রেরণ
করিনি।
মর্মার্থঃ—যারা আল্লাহ্র
রসূলকে বা তাঁর আলোর বর্তিকাকে অনুসরণ করে তাঁরা তো নিজের আল্লাহ্র আনুগত্য করে
চলে। কে ভাল আর কে মন্দ, কে আল্লাহ্র বিধান মান্য করে জীবন অতিবাহিত করছে আর কে
করছে না, তা দেখার দায়িত্ব আল্লাহ্ কাউকে দেন না, তিনি কেবল তাঁর সত্য বার্তা
পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেন, তিনি কাউকে কারো প্রহরী রূপেও প্রেরণ করেন না। তিনি
প্রত্যেকের অন্তরে বিবেকরূপ প্রহরী নিয়োগ করেই পাঠান।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র
কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment