বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র
কুরআনের আলো।[ সুরা—৩ আলে- ইমরান—১৫৬ থেকে ১৬০ আয়াত।]
১৫৬) হে বিশ্বাসীগণ! যারা
অবিশ্বাস করে তাদের মত হয়ো না, এবং যখন তাদের ভ্রাতাগণ দেশে বিদেশে ভ্রমণ করে অথবা
জেহাদে লিপ্ত হয় তখন তারা তাদের সম্পর্কে বলে, তারা যদি আমাদের কাছে থাকত, তবে
তারা মরত না। ফলত আল্লাহ্ এটিই মনস্তাপে পরিণত করেন। বস্তুত আল্লাহ্ই জীবন দান
করেন ও মৃত্যু ঘটান। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার দ্রষ্টা।
মর্মার্থঃ—প্রথমেই অন্তরে
আল্লাহ্র প্রতি অবিশ্বাস মুছে ফেলতে হবে তাঁর বিশালত্বে গিয়ে। আকাশ ও পৃথিবীতে যা
কিছু আছে সবই তাঁর, তাহলে প্রথমেই জানতে হবে তিনি কোন নাম ধাম গোত্রের মধ্যে আবদ্ধ
থাকেন না। তিনি নিজের নাম ধাম প্রতিষ্ঠা করার জন্যেও কাউকে ঠিকাদারি দেন না। তিনি
মানুষকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা হলো নিজে ভালো হয়ে অপরকে ভালো কর, নিজে জ্ঞানী হয়ে
অপরকে জ্ঞানী কর, নিজ সৎকর্মশীল হয়ে অপরকে সৎকর্মশীল রূপে গড়ে তোলার উৎসাহ দাও
ইত্যাদি। মানুষের এই কর্ম-ই হলো ধর্ম আর এটাই হল জীবন সংগ্রাম বা জেহাদ। ভ্রমণে
গিয়ে বা দেশ- বিদেশে জেহাদে গিয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটতেই পারে। এই জন্ম-
মৃত্যুর উপর কারো হাত নেই, এই বিশ্বাস নিয়েই সত্যকে জানতে হবে। যেমন কেউ ইচ্ছা
করলেই ভাল বংশে বা ধনী পরিবারে জন্ম নিতে পারে না, কে কোন বংশে বা কোন পরিবারে
জন্ম নিবে তা বিধাতায় নির্ধারণ করেন তেমনি কে কোথায় কিভাবে কবে মৃত্যু বরণ করবে
তাও তিনিই নির্ধারণ করেন। তাই নিজের জন্ম মৃত্যু নিয়ে চিন্তা না করে মানুষকে অন্তর
থেকে অবিশ্বাস- অজ্ঞান- সংশয় দূর করে উদার চিত্তের হতে হবে এবং নিজেকে হীনমন্যতা
থেকে মুক্ত করতে হবে। আল্লাহ্ সবার অন্তরের পরীক্ষা নেন অন্তর্যামী হয়ে।
১৫৭) যদি তোমরা আল্লাহ্র পথে নিহত হও অথবা
মৃত্যু বরণ কর, তবে তারা যা জমা করে তা থেকে আল্লাহ্র ক্ষমা এবং দয়া উত্তম।
মর্মার্থঃ—নিজের
অন্তরের পবিত্রতার পরীক্ষা দিতে গিয়ে আল্লাহ্র পথে অর্থাৎ পবিত্র পথে চলতে গিয়ে
যদি কেউ নিহত হয় বা মৃত্যু বরণ করে তবে তো তার উত্তম গতি কেউ রোধ করতে পারবে না।
এরা আল্লাহ্র দেওয়া ক্ষমা, দয়া, ধৈর্য ইত্যাদি গুণ নিয়েই তাঁর ঘরে চলে যায়।
১৫৮) এবং তোমাদের মৃত্যু
হলে অথবা তোমরা নিহত হলে তোমাদেরকে আল্লাহ্র নিকটেই একত্রিত করা হবে।
মর্মার্থ--- যারা নিজ
আত্মাকে পবিত্র করার পথে সংগ্রাম করতে গিয়ে মারা যায় তারা সকলেই সুক্ষ দেহে বা
আত্মিক দেহে আল্লাহ্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঘরে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে একত্রিত করা হয়
সেই ঘরে আরও উন্নত নব জীবন দান করার জন্যে।
১৫৯) আল্লাহ্র দয়ায়
তুমি তাদের প্রতি হয়েছিলে কোমল হৃদয়; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর চিত্ত হতে তবে তারা
তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা
প্রার্থনা কর এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর এবং তুমি কোন সঙ্কল্প গ্রহণ
করলে আল্লাহ্র প্রতি নির্ভর করবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ (তাঁর প্রতি) নির্ভরশীলদের
ভালবাসেন।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্র
হৃদয় যেমন কোমল তেমনি তিনি মানব জাতির হৃদয়ও কোমল করে তৈরি করেছেন, এটা যদি তিনি
না করতেন তবে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারতো না, সবায় সমাজ- সংসার- রাষ্ট্র থেকে ছিন্ন
ভিন্ন হয়ে যেতো। তাই মানুষকে আগে নিজের হৃদয়কে কোমল করে তুলতে হবে সবার জন্য, “
আমি সবার” এই কথাটি অন্তর থেকে বলতে পারলেই আর সেই মানুষের কেউ প্রিয় ও অপ্রিয়
থাকবে না। সে সবার হয়ে উঠবে। স্বাভাবিক ভাবেই তার অন্তর সবার প্রতি ক্ষমাশীল হয়ে
থাকবে এবং তার অন্তর সদায় সবায়কে ক্ষমা করার জন্য আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করবে।
এদের অন্তর সদায় সবার সাথে সৎ পরামর্শ করে চলে আপন গতিতে নিজ অন্তরের আল্লাহ্র
প্রতি নির্ভরশীল হয়ে। তারা জানে নিজ
অন্তরের আল্লাহ্র সাথে পরামর্শ করলেই জগতের সবার সাথে পরামর্শ করা হয়ে যায়। আল্লাহ্
এই রূপ জ্ঞানী নির্ভরশীল মানুষদের খুব ভালবাসেন।
১৬০) আল্লাহ্
তোমাদেরকে সাহায্য করলে কেউই তোমাদের উপর জয়ী হবে না। আর তিনি তোমাদেরকে সাহায্য
না করলে, তিনি ছাড়া আর কে এমন আছে, যে তোমাদের সাহায্য করবে? বিশ্বাসীগণের আল্লাহ্রই
উপর নির্ভর করা উচিত।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্র
বিশালত্বের উপর বিশ্বাসী হয়ে তাঁকে নিজের করে পবিত্র হৃদয়ের বেদীতে বসাতে হয়,
তাহলেই মানুষের হৃদয় বিশাল হয়ে যায়। বিশাল ক্ষেত্র ছাড়া আল্লাহ্র সাহায্য বর্ষণ
হয় না, কারণ তাঁর সাহায্য ধারণের ক্ষমতা আছে কিনা তা পরীক্ষা করেই তিনি তা বর্ষণ
করেন। তাই মানুষকে আল্লাহ্র সাহায্য নেওয়ার জন্য পবিত্র বেদী বা পবিত্র সংগঠন
তৈরী করতে হয় পবিত্র হৃদয়ের মানব সত্তাদের নিয়ে। তিনি সাহায্য না করলে কেউ
সংগ্রামে জয়ী হতে পারে না। তাহলে তাঁর সাহায্য নেওয়ার জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র
প্রস্তুত করতে হবে মানব জাতিকে জীবন সংগ্রামের মাধ্যম দিয়ে। বিশ্বাসীগণের পবিত্র
আশ্রয় একমাত্র আল্লাহ্, তাই তাঁর উপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকা উচিত মানব জাতির।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও
পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:
Post a Comment