Tuesday, 4 September 2018

কুরআন সুরা--৫ মায়িদাহ-- ১০৫ থেকে ১১০ আয়াত


       বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র কুরআনের আলো। [ সুরা—৫ মায়িদাহ—১০৬ থেকে ১১০ আয়াত।]
   ১০৬) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের কারও যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় তখন অসিয়ত করার সময় তোমাদের মধ্য হতে দুজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখবে, তোমরা সফরে থাকলে এবং তোমাদের মৃত্যুরূপ বিপদ উপস্থিত হলে তোমাদের ছাড়া অন্য লোকদের মধ্য হতে দুজন সাক্ষী মনোনীত করবে। তোমাদের সন্দেহ হলে নামাযের পর তাদের অপেক্ষমাণ রাখবে। অতঃপর তারা আল্লাহ্‌র নামে শপথ করে বলবে, আমরা ওর বিনিময়ে কোন মূল্য গ্রহণ করব না, যদি সে আত্মীয়ও হয় এবং আমরা আল্লাহ্‌র সাক্ষ্য গোপন করব না, করলে আমরা নিশ্চয় পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হব।
     মর্মার্থঃ—মানুষের মৃত্যু আসবেই। মৃত্যুকে সাথী করেই মানুষকে পরলোকে যেতে হয়। ইহলোকের কাজ তাই এমন পবিত্র পন্থা অবলম্বন করে মানুষকে করতে হয়, যাতে তার মৃত্যুর পর কেউ অসুবিধায় না পড়ে এবং তার ফেলে যাওয়া সম্পদ নিয়ে কোনরূপ বাতবিতণ্ডা না হয়। তাই নিজের বিবেক ও অন্তরের পবিত্র আল্লাহ্‌কে সাক্ষী রেখে এই কর্মভূমি, জ্ঞানপীঠ ও তীর্থভূমি ছেড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আগে- ভাগেই করে যেতে হয়। মৃত্যুর আগেই এই মায়া ত্যাগ না করতে পারলে সেই মানুষ পাপীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।
         ১০৭) তবে যদি এ প্রকাশ পায় যে, তারা দুজন অপরাধে লিপ্ত হয়েছে, তবে যাদের স্বার্থহানি ঘটেছে তাদের মধ্য হতে নিকটতম দু’জন তাদের স্থলবর্তী হবে এবং আল্লাহ্‌র নামে শপথ করে বলবে, আমাদের সাক্ষ্য অবশ্যই তাদের হতে অধিকতর সত্য এবং আমরা সীমালংঘন করিনি, করলে আমরা অবশ্যই যালিমদের (অনাচারীদের) দলভুক্ত হব।
         মর্মার্থঃ—মানুষ মৃত্যুর আগেই সৎ মানুষের সান্নিধ্যে গিয়ে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করে নিজেকে বিষয় –আশয়ের মিথ্যা মায়া থেকে মুক্ত করবে। জাগতিক সমস্ত মিথ্যা মায়া থেকে মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহ্‌র আশ্রয়ে থেকে তাঁর কাছে ফিরে যাবার আশায় বসে থাকবে এবং তাঁরই প্রেমে মশগুল হয়ে নিজেকে কেবল তাঁর বন্ধু ভেবে তাঁর জ্ঞানের দড়িকে শক্ত করে ধরে থাকবে।  এই ব্যবস্থা না করলে মানুষ যালিমদের দলভুক্ত হবে।
        ১০৮) এ পদ্ধতিতেই লোকের যথাযথ সাক্ষ্যদানের অধিকতর সম্ভাবনা আছে, অথবা শপথের পর আবার তাদের শপথ করান হবে এ ভয়ের। আর তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং শ্রবণ কর। আল্লাহ্‌ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
     মর্মার্থঃ—একবার শপথ গ্রহণের পর যদি আবার নিজের শপথ ত্যাগ করে মানুষ পুনঃ বিষয় – আশয় ভোগের ইচ্ছা করে অন্তর থেকে,  তবে সে অসৎ পথগামী হয়ে পড়বে। আল্লাহ্‌ সত্যত্যাগীদের সৎপথে পরিচালিত করেন না।  মৃত্যুর আগে সদায় আল্লাহ্‌কে পবিত্র অন্তরে ধরে রেখে, জাগ্রত অবস্থায় তাঁকে ভয় করে, নিজের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
       ১০৯) ( স্মরণ কর), যে দিন আল্লাহ্‌ রসূলগণকে একত্র করবেন, অতঃপর বলবেন, তোমরা কী সাড়া পেয়েছিলে? তারা বলবে, আমাদের কোন জ্ঞান নেই, নিশ্চয় তুমি অদৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত।
          মর্মার্থঃ—মৃত্যুর পর আল্লাহ্‌ রসূলগণকে একত্রিত করবেন এবং তোমাদের সবার বিষয়েই জিজ্ঞাসা করবেন, তোমাদের অন্তর থেকে কিছু সাড়া পেয়েছিলেন কিনা সে ব্যাপারে। রসূলগণ তোমাদের অন্তরের ভাল- মন্দ দেখার ব্যাপারে তাঁদের কোন জ্ঞান নেই, সেই কথা বলেই মুক্ত হবেন।  তোমাদের অন্তরের পবিত্রতা মাপার অদৃশ্য শক্তি কেবল তোমাদের অন্তরের আল্লাহ্‌রই রয়েছে। তাই তোমাদেরকে নিজের শাস্তি নিজেকেই মাপ করে নিতে হবে। এই মাপ যন্ত্র এমনি মাপ যন্ত্র যে কেউ নিজের শাস্তি সামান্যও কম-বেশী করতে পারবে না।
       ১১০) ( স্মরণ কর), যখন আল্লাহ্‌ বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ‘ঈশা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর, পবিত্র আত্মা (জিব্রাঈল ফিরিশতা) দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম এবং তুমি দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সাথে কথা বলতে, তোমাকে জ্ঞান- বিজ্ঞান, তত্ত্ব ও ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছিলাম। তুমি কাদা দিয়ে আমার অনুমতিক্রমে পাখী সদৃশ্য আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুঁ দিতে, ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখী হয়ে যেত, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতে এবং আমার অনুমতিক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে, আমি তোমার থেকে বনী ইস্রাঈলকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম। তুমি যখন তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে তখন তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাস করেছিল তারা বলেছিল, এ যাদু ছাড়া আর কিছুই না।
     মর্মার্থঃ—এই দুনিয়াটাই আল্লাহ্‌র যাদু বা মায়া মানুষকে সত্যজ্ঞানী করে তোলার জন্য। আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলেই নবী ঈশার ন্যায় যেকোন মানুষকে পবিত্র আত্মা দ্বারা শক্তিশালী করে তুলতে পারেন। তাঁর অনুগ্রহে যে কোন মানুষ শৈশবকালেও জ্ঞানীদের ন্যায় তও্বজ্ঞানের কথা বলতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলেই যে কোন মানুষের অন্তরে পবিত্র আত্মাকে যুক্ত করে দিয়ে বিভিন্ন ঐশীগ্রন্থের জ্ঞান- বিজ্ঞান- তত্ত্বজ্ঞান দান করতে পারেন। এ জগতের সকল জীবকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করে তিনিই প্রাণ দিচ্ছেন সেই দেহকে নির্ভর করে সৎ কাজ করার জন্যে, আবার তিনি সেই দেহ থেকে প্রাণকে যখন খুশী বের করে নিচ্ছেন। এ জগতের সকলেই জন্মান্ধ ও কুষ্ঠের ন্যায় ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত। এই রোগীদের একমাত্র মুক্ত করতে পারেন আল্লাহ্‌ মহাচিকিৎসক হয়ে। মানুষ জন্মান্ধ বলেই মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেই নিজের স্রষ্টা আল্লাহ্‌কে দেখতে পায় না অথচ তিনি সদায় তাঁর সাথেই থাকেন। মানুষ মাত্রই কুষ্ঠরোগী কারণ মানুষ এমনি রোগে আক্রান্ত যে, সে সেই রোগ থেকে মুক্ত হয়ে,  সে নিজের পরিবারের বাইরের লোকের মঙ্গলের কথা চিন্তা করতেই পারে না। এই মৃত্যুলোকে সবায় মৃত, এই মৃত লোকদের জ্ঞানসুধা পান করিয়ে কেবল আল্লাহ্‌ই জীবিত করে তুলতে পারেন। আল্লাহ্‌ মারাইয়াম পুত্র ঈশাকে দিয়ে এই কাজগুলি নিদর্শন স্বরূপ করিয়ে গেছেন মানুষকে সত্যজ্ঞানী করে তোলার জন্য।
  জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর জয়।

No comments:

Post a Comment