Saturday, 29 September 2018

বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ অভিযান ৪১৯ তাং ২৯/ ০৯/ ২০১৮


   বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ অভিযান(৪১৯) তারিখঃ—২৯/ ০৯/ ২০১৮  
আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ- [বেদযজ্ঞই জীবনের সত্যরূপ, সেই সত্যকে পিতামহ ভীষ্ম যেভাবে রক্ষা করেছিলেন, ঠিক সেইভাবেই সত্যকে রক্ষা করে নিজের জন্ম সার্থক করো।]
 অম্বা বড় অহংকার করে শাল্বের কাছে হস্তিনাপুর থেকে চলে গেলেন, কিন্তু শাল্ব অম্বাকে স্বীকার করলেন না, তাই অম্বার একুল- ওকুল দুকুলই গেল। শাল্ব যখন তাঁকে গ্রহণ করলেন না, অম্বাও তখন লজ্জায় আর পিতৃগৃহে ফিরে যেতে পারলেন না। এই দুর্দশার জন্য তিনি মনে মনে ভীষ্মকে দায়ী করলেন এবং প্রতিশোধ নেবার উপায় চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি তাঁর মাতামহ রাজর্ষি হোত্রবাহনের পরামর্শে জামদগ্নির পুত্র পরশুরামের শরণাপন্ন হয়ে তাঁকে নিজের দুঃখের কথা নিবেদন করেন। ভীষ্ম পরশুরামের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখেছিলেন। তিনি ভীষ্মকে কুরুক্ষেত্রে ডেকে এনে অম্বাকে বিবাহ করতে বলেন। তিনি বললেন—‘ তুমি এই কন্যাকে বলপূর্বক স্পর্শ করে দুষিত করে দিয়েছ, সেজন্য শাল্ব এঁকে গ্রহণ করেননি। অতএব এখন তোমারই এঁকে বিধিমতো বিবাহ করা উচিত’। কিন্তু ভীষ্ম তাঁর কথা মেনে নিলেন না। তিনি বললেন—‘ এই কন্যা আমাকে বলেছেন, তিনি শাল্বকে বরণ করে নিয়েছেন, সেই অবস্থায় আমি কি করে এঁকে গৃহে স্থান দেব; যিনি অন্য পুরুষকে ভালোবাসেন, তাঁকে কোনো  ধার্মিক ব্যক্তি কী করে স্থান দেবেন? পরশুরাম এইকথা শুনে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন--- ‘ ভীষ্ম; তুমি কি জানো না যে আমি একুশবার এই পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়বিহীন করেছি’? ভীষ্ম বললেন—‘ গুরুদেব; তখন ভীষ্ম জন্মগ্রহণ করেনি’। একথা শুনে পরশুরাম ভীষ্মকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন। ভীষ্ম তাঁর আহ্বান স্বীকার করলেন, গুরু- শিষ্যে মহাসংগ্রাম শুরু হল। তেইশদিন ধরে একনাগাড়ে যুদ্ধ হতে থাকল, কিন্তু তাঁরা কেউই হার মানলেন না। শেষে দেবতা- মুনিগণ মধ্যস্থ হয়ে যুদ্ধের বিরতি টানেন। এইভাবে ভীষ্ম পরশুরামেরও কথা শুনলেন না এবং সত্য রক্ষার জন্য পরাক্রমে পরশুরামের মতো অদ্বিতীয় ধনুর্ধরকেও যুদ্ধে আহ্বান করতে ভয় পেলেন না। তিনি ছিলেন সত্যপ্রতিজ্ঞা ও বীরত্বের এক পরকাষ্টা।
  মহাভারতের যুদ্ধে ভীষ্মই ছিলেন কৌরবপক্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। তাই কৌরবপক্ষের প্রথম সেনাধ্যক্ষ হওয়ার গৌরব তিনিই লাভ করেছিলেন। পাণ্ডব ও কৌ্রব—উভয়েরই পিতামহ হওয়ার সুবাদে তাঁর উভয় পক্ষের প্রতি সমান স্নেহ ও সহানুভূতি ছিল এবং তিনি উভয়েরই সমানভাবে হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। কিন্তু ধর্ম এবং ন্যায় পাণ্ডবদের সঙ্গে থাকায় তিনি পাণ্ডবদের প্রতি বিশেষ সহানুভুতিপ্রবণ ছিলেন এবং তাঁদের বিজয় চাইতেন; মনে মনে পাণ্ডবদের পক্ষপাতী হলেও তিনি কিন্তু যুদ্ধে কখনও তাঁদের রেহাই দেননি এবং প্রাণপণে তাঁদের হারাবার চেষ্টায় করেছেন। আঠারো দিনের যুদ্ধে ভীষ্ম একাকী দশদিন ধরে সেনানায়ক থেকে পাণ্ডবপক্ষের বহু বীর সৈন্য সংহার করেছেন। বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধে যে পরাক্রম দেখিয়েছেন তাতে শ্রীকৃষ্ণের অস্ত্রধারণ না করার প্রতিজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অর্জুনকে রক্ষার জন্য দুবার তাঁকে ভীষ্মের সম্মুখীন হতে  হয়। একবার অর্জুন হতবল হয়ে পড়ায় শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র নিয়ে ভীষ্মের সামনে আসেন এবং অন্যবার চাবুক নিয়ে তিনি ভীষ্মকে আহ্বান করেন। এইভাবে ভক্তের প্রাণ রক্ষা করে তিনি অপর ভক্তের গৌরব বৃদ্ধি করে তাঁর উভয়মুখী ভক্তবৎসলতার পরিচয় দিয়েছেন। পাণ্ডবেরা যখন দেখলেন ভীষ্ম জীবিত থাকতে কৌরবদের পরাজয় করা অসম্ভব, তখন তাঁরা এসে পিতামহের কাছে তাঁর মৃত্যুর উপায় জিজ্ঞাসা করলেন। ভীষ্ম দয়াপরবশ হয়ে তাঁদের তাঁর মৃত্যুর উপায় জানালেন। তিনি বললেন—‘ দ্রুপদ পুত্র শিখণ্ডী পূর্বজন্মে নারী ছিলেন, তাই যদিও তিনি এখন পুরুষ হয়ে জন্মেছেন, কিন্তু তিনি আমার দৃষ্টিতে নারীই। এমতাবস্থায় আমি তাঁর ওপর শস্ত্রাঘাত করতে পারব না। তিনি যদি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসেন, তাহলে আমি অস্ত্রধারণ করব না। সেই সময় অর্জুন আমাকে বধ করতে পারবে’ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন এবং বীরত্বের উদাহরণ এর থেকে বেশি আর কি হতে পারে? জয় বেদযজ্ঞের জয়

No comments:

Post a Comment