বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ অভিযান(৪১৩) তারিখঃ—২৩/
০৯/ ২০১৮
আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ—[ বেদযজ্ঞ করে অর্জুনের ন্যায় ইন্দ্রিয়জয়ী হয়ে ত্রিভুবন
নির্ভয়ে ভ্রমণ করে কেবল সত্যজ্ঞান লাভ করো।]
আজ ১৪ দিন ধরে বেদযজ্ঞ আসরে বীরবর অর্জুনের
চরিত্র নিয়েই আলোচনা চলছে। বিশাল এই মহাভারতের একটা বিরাট অংশ নিয়েই রয়েছেন ভগবান
শ্রীকৃষ্ণ ভক্ত- সখা- শিষ্য অর্জুন। অর্জুন যখন ইন্দ্রপুরীতে থেকে অস্ত্রবিদ্যা ও
গান্ধর্ববিদ্যা শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন, সেই সময় এক রাত্রে ইন্দ্র তাঁর সেবার জন্য
সেখানকার সর্বশ্রেষ্ঠ অপ্সরা উর্বশীকে তাঁর কাছে পাঠান। সেই দিন ইন্দ্র সভাস্থলে অর্জুনকে উর্বশীর দিকে অপলক চোখে
তাকিয়ে থাকতে দেখেছিলেন। উর্বশী অর্জুনের রূপ ও গুণে মুগ্ধ ছিলেন। তিনি ইন্দ্রের
নির্দেশে উত্তম সাজগোজ করে অর্জুনের কাজে গেলেন। অর্জুন রাত্রিকালে উর্বশীকে একাকী
তাঁর ঘরে নিঃসঙ্কোচে আসতে দেখে চমকে গেলেন। তিনি ভদ্রতাবশতঃ চোখ বন্ধ করে উর্বশীকে মাতার মতো প্রণাম করলেন। উর্বশী এই
ব্যবহারে আশ্চর্যান্বিত হলেন। তিনি অর্জুনের কাছে এই
ব্যবহার আশা করেননি। তিনি সোজাসুজি অর্জুনের প্রতি কামভাব প্রকট করেন। অর্জুন
সঙ্কোচে যেন মাটিতে ঢুকে গেলেন। তিনি দুই হাতে কান বন্ধ করে বললেন—‘ মাতা! আপনি এ
কী বলছেন? দেবি! নিঃসন্দেহে আপনি আমার গুরুপত্নীর ন্যায়। দেবসভায় আমি অবশ্যই
আপনাকে একদৃষ্টে দেখছিলাম, কিন্তু আমার মনে কোনো মন্দচিন্তা ছিল না। আমি ভাবছিলাম
যে ইনিই পুরুবংশের মাতা। তাই আমি আপনার দিকে তাকিয়েছিলাম। দেবি! আমার সম্বন্ধে
আপনার আর কিছু চিন্তা করা উচিত নয়। হে নিষ্পাপা! আপনি আমার কাছে বড়োদের থেকেও বড়ো
এবং আমার পূর্বপুরুষদের জননী। কুন্তী, মাদ্রী, ইন্দ্রপত্নী শচী যেমন আমার মাতা,
তেমনিই আপনিও পুরুবংশের জননী হওয়ায়, আমার পূজনীয়া মাতা। হে সুন্দর বর্ণবিশিষ্টা
দেবি! আমি আপনার পায়ে মস্তক নত করে প্রণাম করছি, আপনি আমার মাতার ন্যায় পূজনীয়া,
আমি আপনার পুত্রের ন্যায় রক্ষণীয় । উর্বশী তখন অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি
অর্জুনকে অভিশাপ দিলেন—‘ আমি ইন্দ্রের নির্দেশে কামাতুর হয়ে তোমার কাছে এসেছিলাম,
কিন্তু তুমি আমার প্রেম অগ্রাহ্য করেছ। যাও, তোমাকেও নারীদের মধ্যে নর্তকী হয়ে
থাকতে হবে। লোকে তোমাকে হিজড়ে বলে ডাকবে’। অর্জুন উর্বশীর অভিশাপ সানন্দে স্বীকার করলেন, কিন্তু ধর্মত্যাগ করলেন
না। স্বেচ্ছায় নির্জনস্থানে আসা উর্বশীর ন্যায় অসামান্যা সুন্দরীকে পরিত্যাগ করা
অর্জুনের পক্ষেই সম্ভব ছিল। ধন্য ইন্দ্রিয়জয়! ইন্দ্র একথা জানতে পেরে অর্জুনকে
ডেকে তাঁকে পিঠ চাপড়ে আদর করে বললেন—‘ পুত্র! তোমার মতো পুত্র পেয়ে তোমার মাতা
ধন্য হয়েছেন। তুমি তোমার ধৈর্যের দ্বারা ঋষিদেরও জয় করেছ। তুমি আর কোনো চিন্তা
কোরো না। উর্বশী তোমাকে যে অভিশাপ দিয়েছেন, তা তোমার বরদানের মতো কাজ করবে। তুমি
যখন ত্রয়োদশতম বর্ষে অজ্ঞাতবাসে যাবে, সেই সময় এই শাপ তোমার ছদ্মবেশের সহায়ক হবে।
তারপরে তুমি তোমার পৌরুষ ফিরে পাবে’। সত্যই –‘ ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ’। জয় বেদভগবান
শ্রীকৃষ্ণের জয়।
No comments:
Post a Comment