বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ অভিযান(৪০৫) তারিখঃ—১৫/
০৯/ ২০১৮
আজকের আলোচ্য বিসয়ঃ—[ বেদযজ্ঞভগবানের আশ্রয়
ছেড়ে যে ব্যক্তি অন্যত্র সাহায্যের জন্য যায়, তাঁর মতো মূর্খ আর কে আছে? তাই
অর্জুনের ন্যায় তাঁকেই আশ্রয় করে জীবন অতিবাহিত করো তাহলে কর্ণের ন্যায় যোদ্ধাও
তোমার কিছু করতে সক্ষম হবে না।]
কর্ণ প্রথম থেকেই
অর্জুনের প্রতি ঈর্ষাভাবাপন্ন ছিলেন। দুজনেই একে অপরের প্রাণ হরণের অপেক্ষায়
ছিলেন। ভীষ্মের মৃত্যুর পর কর্ণ থেকেই অর্জুনকে রক্ষার জন্য কৃষ্ণ সবচেয়ে বেশি
চিন্তিত ছিলেন। কর্ণের কাছে ইন্দ্রপ্রদত্ত এক অমোঘ শক্তি ছিল। সেটি তিনি অর্জুনকে
বধ করার জন্যই রেখেছিলেন। সেই শক্তিবলেই কর্ণ অর্জুনকে মৃত ভাবতেন। সেই শক্তি
একবারই মাত্র প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল। শ্রীকৃষ্ণ কর্ণের সেই শক্তিকে
ক্ষয় করার জন্য ভীমসেনের পুত্র ঘটোৎকচের সঙ্গে কর্ণের যুদ্ধ লাগিয়ে দিলেন।
ঘটোৎকচের অদ্ভুত পরাক্রমে কর্ণের প্রাণসংশয় হল, তিনি তখন বাধ্য হয়ে সেই
ইন্দ্রপ্রদত্ত শক্তি ঘটোৎকচের ওপর নিক্ষেপ করে তাঁকে বধ করেন। ঘটোৎকচের মৃত্যুতে
পাণ্ডব শিবিরে শোক ঘনিয়ে এল, সকলে তাঁর জন্য দুঃখ করতে লাগলেন। কিন্তু এই ঘটনায়
শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন, তিনি অর্জুনকে জড়িয়ে ধরে বারংবার তাঁর পিঠ
চাপড়াতে লাগলেন। অর্জুন তাঁর এই আনন্দের কারণ জানতে চাইলেন, কারণ তিনি জানতেন যে,
ভগবানের কোনো কাজই উদ্দেশ্যবিহীন হয় না। উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ যা বললেন, তাতে অর্জুনের
প্রতি তাঁর অগাধ প্রেমই প্রকাশিত হয়। তিনি বললেন—‘ অর্জুন-! আজ সত্যই আমার বড়ো
আনন্দের দিন। কারণ কি জান,তোমরা মনে করছ কর্ণ --------ঘটোৎকচকে বধ করেছে, কিন্তু
আমি বলছি, শোনো! ইন্দ্রপ্রদত্ত শক্তি নিষ্ফল করে ঘটোৎকচই কর্ণকে বধ করেছে। এখন
তুমি কর্ণকে মৃত বলে ভাবতে পারো। এমন কেউ নেই, যে কর্ণের হাতে সেই শক্তি থাকলে
তাঁর সম্মুখীন হতে সক্ষম’।
তিনি আরও জানালেন—‘আমি তোমার জন্যই একে একে জরাসন্ধ, শিশুপাল ইত্যাদিকে বধ
করেছি। এঁরা যদি আগে মারা না যেতেন, তাহলে এখন বড়ো ভয়ংকর হয়ে উঠতেন। আমাদের প্রতি
বিদ্বেষ থাকায় তাঁরা অবশ্যই কৌরব পক্ষে যোগদান করতেন এবং দুর্যোধনের সহায়তায় সমস্ত
পৃথিবী জয় করে নিতেন। তাঁদের মতো দেব- দ্রোহীদের বিনাশের জন্যই আমাকে অবতরণ করতে
হয়েছ’।
এই প্রসঙ্গে তিনি সাত্যকিকে বলেছেন—‘ কৌরবপক্ষের সকলেই কর্ণকে এই পরামর্শ
দিতেন যে তিনি যেন অর্জুন ব্যতীত অন্য কারো ওপর সেই শক্তিপ্রয়োগ না করেন, তিনিও
সেই সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। কিন্তু আমিই তাঁকে মোহগ্রস্ত করেছিলাম। সেইজন্যই তিনি
অর্জুনের ওপর শক্তিপ্রয়োগ করতে পারেননি। সাত্যকে! অর্জুনের জন্য সেই শক্তি সাক্ষাৎ
মৃত্যুরূপ ছিল—একথা চিন্তা করে আমার রাত্রে ঘুম হত না। আজ ঘটোৎকচের মৃত্যুতে সেই
শক্তি ব্যর্থ হয়ে গেল—তাই দেখে আমার মনে হচ্ছে অর্জুন মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছে।
আমি অর্জুনের প্রাণ রক্ষা করা যত প্রয়োজন বলে মনে করি, তত আমার মাতা-পিতা, তোমার
মতো ভ্রাতাদের এবং আমার নিজের প্রাণও তত আবশ্যক মনে করি না। ত্রিলোকের রাজ্যের
থেকেও যদি কোনো দুর্লভ বস্তু থাকে, তাও আমি অর্জুনের বিনিময়ে চাই না। তাই আজ যেন
অর্জুন মরে গিয়ে বেঁচে উঠেছে, এই কথা ভেবে আমার অত্যন্ত আনন্দ হচ্ছে। সেইজন্যই আমি
এই রাত্রে রাক্ষস ঘটোৎকচকে কর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছিলাম; ঘটোৎকচ ছাড়া কারো
সাধ্য --ছিল না কর্ণকে দমন
করার’। ভগবানের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অর্জুন ভগবানের কত প্রিয় ছিলেন এবং
তাঁকে তিনি কীভবে আগলিয়ে রাখতেন। যিনি নিজেকে ভগবানের হাতের যন্ত্র করে রাখেন,
ভগবান এইভাবে তাঁকে আগলিয়ে রাখেন, যাতে কেউ তাঁর কেশ স্পর্শ করতে না পারে। এমন
ভক্তবৎসল প্রভুর শরণ ছেড়ে যে ব্যক্তি অন্যত্র সাহায্যের জন্য যায়, তার মতো মূর্খ
আর কে আছে? জয় জয় জয় বেদভগবান শ্রীকৃষ্ণের জয়। ৬ষ্ঠ পর্ব। জয় বেদযজ্ঞের জয়।
No comments:
Post a Comment