বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ অভিযান(৪১৭)
তাং ২৭/ ০৯/ ২০১৮
আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ—[ মহাত্মা ভীষ্মপিতামহকে
অনুসরণ – অনুকরণ করে বেদযজ্ঞ করবে এবং নিজের চরিত্রকে মহৎ, প্রেমময় ও উদার করে গড়ে
তুলবে।]
মহাত্মা ভীষ্ম
ছিলেন কুরুবংশীয় মহারাজ শান্তনুর পুত্র। ইনি গঙ্গাদেবী থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন। বসু
নামক দেবতাদের মধ্যে ‘দ্যৌ’ নামক বসুই মহর্ষি বশিষ্ঠের শাপে ভীষ্মের রূপে অবতীর্ণ
হয়েছিলেন। তিনি কুমার অবস্থাতে সর্বাঙ্গ বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন এবং নানাপ্রকার
অস্ত্রশিক্ষা লাভ করেছিলেন। অস্ত্রাভ্যাস করার সময় তিনি –একবার তাঁর বাণের দ্বারা
গঙ্গার প্রবাহ রুদ্ধ করেছিলেন। বাল্যকালে তাঁকে সকলে ‘দেবব্রত’ বলে ডাকতেন।
রাজর্ষি শান্তনু
একদিন বনে বিচরণ করছিলেন। সেই সময় তাঁর দৃষ্টি এক কৈবর্তরাজের সুন্দরী কন্যার ওপর
পড়ে, তাঁর নাম ছিল সত্যবতী। রাজা শান্তনু তাঁকে দেখে মোহগ্রস্ত হয়ে তাঁকে
বিবাহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সত্যবতী রাজকন্যা ছিলেন, কিন্তু তিনি কৈবর্তরাজের
গৃহে পালিত হন। তাঁর পিতা কৈবর্তরাজ তাঁর বিবাহের জন্য রাজাকে এক শর্ত দেন যে,
সত্যবতীর গর্ভজাত পুত্রই রাজ্যের অধিকারী হবেন। রাজা শান্তনু এই শর্তে রাজী হলেন
না। কিন্তু তিনি সত্যবতীকে ভুলতেও পারলেন না। তিনি তাঁর চিন্তায় সর্বক্ষণ আনমনা
থাকতেন। দেবব্রত যখন পিতার এই অবস্থার কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি নিজে
কৈবর্তরাজের কাছে গিয়ে পিতার জন্য তাঁর কন্যাকে প্রার্থনা জানালেন। তিনি
কৈবর্তরাজের শর্ত মেনে নিয়ে সকলের সামনে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, ‘এঁর গর্ভে যে পুত্র হবে, সেই হবে আমাদের রাজা’।
কিন্তু কৈবর্তরাজ তাতেও সন্তুষ্ট হলেন না, তিনি বললেন—‘ আপনার কথার কখনও অন্যথা
হবে না; কিন্তু আপনার পুত্র রাজ্যলাভের অধিকারী হতে পারেন’। তখন দেবব্রত আর একটি
কঠিন প্রতিজ্ঞা করেন, ‘ আমি আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করবো’। কুমার দেবব্রতের এই ভীষণ
প্রতিজ্ঞা শুনে দেবতাগণ পুষ্পবর্ষণ করেন এবং তখন থেকে এই ভীষণ প্রতিজ্ঞা করায়,
তাঁকে সকলে ‘ভীষ্ম’ নামে অভিহিত করেন। ভীষ্ম সত্যবতীকে নিয়ে এসে পিতার কাছে সমর্পণ
করেন। পিতা শান্তনু পুত্রের এই দুরূহ কাজে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে তাঁকে ইচ্ছামৃত্যুর
বর প্রদান করেন। এইভাবে জীবনের প্রারম্ভেই পিতার ইচ্ছাপূরণ করার জন্য ভীষ্ম জগতের
সামনে এক অলৌকিক ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যে রাজ্যের জন্য দুই পুরুষ পরেই
পুত্র- পৌত্রদের মধ্যে এবং তাঁরই উপস্থিতিতে মহাসংগ্রাম হয়, সেই রাজ্য পিতার একটি
মাত্র ইচ্ছা পূরণের জন্য তিনি এককথায় ত্যাগ করেন। যে কামিনী- কাঞ্চনের জন্য
ইতিহাসে কত না- জানি হত্যালীলা সংঘটিত হয়েছে, কত রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, সেই রাজ্য
তৃণের মতো পরিত্যাগ করে তিনি এক বিরাগী মহাপুরুষের মতো জীবন কাটিয়েছেন। ধন্য তাঁর
পিতৃভক্তি। জয় –বেদযজ্ঞের জয়।
No comments:
Post a Comment