[ দ্বিতীয় অধ্যায়ে অর্জ্জুন যখন ভগবান
শ্রীকৃষ্ণের সামনে প্রতিজ্ঞা করলেন, তিনি যুদ্ধ করবেন না, তখনি গীতা শেষ হয়ে যাবার
কথা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বীরপুরুষ অর্জ্জুনের অন্তর দ্বন্ধের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত
দেখে ও তাঁকে বিষাদগ্রস্ত দেখে আত্মতত্ত্বের কথা শুরু করলেন ভারতীয় ঋষিদের পথ ধরে।
দুর্বল মানুষকে সবল করতে হলে যা চিরন্তন সত্য সেই কথায় উপস্থাপন করতে হয়। জাতিতে
জাতিতে, আত্মীয়ে আত্মীয়ে দ্বন্ধ, এই দ্বন্ধের তো শেষ করতেই হবে। দ্বন্ধ শেষ না হলে
কখনো সমাজের বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। এই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই ধর্ম্মযুদ্ধ,
আর এই যুদ্ধ যদি অর্জুন না করেন তবে তো রাষ্ট্রের বুকে সেই দুর্যোধন – দুঃশাসনের
অশান্তিময় যুগের অবসান হবে না। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ
পথের সন্ধান দিতে শুরু করলেন। আজকে সকলের জন্য গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাংখ্যযোগের
১৬ থেকে ২৪ শ্লোক প্রদত্ত হলো।]
১৬) অসৎ বস্তুর সত্তা নাই আবার সৎ বস্তুর
বিনাশ নাই। তত্ত্বদর্শিগণ এই সদসৎ উভয়ের চরম বা প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করেছেন।
১৭) যিনি এই সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত করে আছেন
তাঁকে অবিনশ্বর বলে জেনো। কেউই এই অব্যয়স্বরূপের বিনাশ করতে পারে না।
১৮) আত্মা যে দেহকে আশ্রয় করে অবস্থান করেন,
সেই দেহ নশ্বর বলে কথিত হয়েছে। কিন্তু আত্মা নিত্য, বিনাশরহিত ও প্রমাণের অতীত। অতএব হে অর্জ্জুন যুদ্ধ কর।
১৯) যে মনে করে যে, আত্মা কাকেও বধ করেন বা
কারও দ্বারা নিহত হন, তারা উভয়ই কিছু জানে না। ইনি বধও করেন না, হতও হন না।
২০) এই আত্মা কখনো জন্মেন না বা কদাচ মরেন
না। অন্যান্য জাত বস্তুর ন্যায় তিনি যে জন্ম লাভে অস্তিত্ব লাভ করেন, তাও নয়। তিনি
জন্মরহিত, সর্ব্বদা একরূপ, বিনাশরহিত এবং পুরাণ। শরীর হত হলে তিনি হত হন না।
২১) যিনি ইহাকে অবিনাশী, নিত্য, জন্মহীন,
ক্ষয়হীন বলে জানেন, হে পার্থ, সে পুরুষ কি প্রকারে কাউকে হত্যা করতে বা করাতে
পারেন?
২২) মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে
আবার নূতন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ আত্মাও জীর্ণ শরীর পরিত্যাগ করে অন্য নূতন দেহ
আশ্রয় করেন।
২৩) শস্ত্র এঁকে ছেদন করতে পারে না, অগ্নি
এঁকে দগ্ধ করতে পারে না, জল এঁকে সিক্ত করতে পারে না, বায়ু এঁকে শুষ্ক করতে পারে
না।
২৪) এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য ও
অশোষ্য; ইনি নিত্য, সর্ব্ব্যাপী, স্থিরভাব, অচল ও চিরন্তন।
[ আমরা ভগবানের মুখ থেকেই জানতে পারলাম,
আমাদের জন্ম- মৃত্যু বলে কিছু নেই। কেবল কর্তব্য কর্ম করে আত্মার উন্নতি করার
জন্যই আমাদেরকে বার বার দেহ ধারণ করতে হয়। অর্জুন অনেক জন্ম অতিবাহিত করে ভগবানের
সখা হবার সৌভাগ্য লাভ করেছেন এবং সরাসরি তাঁর মুখ থেকে গীতা শোনার সৌভাগ্য লাভও
করলেন। এই বিশ্ববাসী মহামুনি বেদব্যাসের কৃপায় সেই গীতার বাণী এই কলিযুগে পাঠ করার
ও শোনার সৌভাগ্য লাভ করছেন। এই গীতার দুর্লভ বাণী যারা পাঠ করার সুযোগ পেয়েও পাঠ
করেন না, তাঁদের মতো অধম জীব আর জগতে কেউ নেই। জয় বেদভগবান শ্রীকৃষ্ণের জয়।]

No comments:
Post a Comment