[ অর্জ্জুন সুশীল সুচতুর ও জ্ঞানী। তাঁর এই
ধর্ম্মযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও কোন অহংকার নেই। তিনি নীরবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ
শুনে যাচ্ছেন এবং তা অন্তরে আত্মস্থ করে ধরে রাখছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের
কোন ত্রুটি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না, তাই কোনরূপ তর্কে বা সেই উপদেশ নিয়ে কোন
মন্তব্য করার কিছুই খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি ভগবানের নিকট থেকে জানার জন্য প্রশ্ন
করলেন—“ স্থিতপ্রজ্ঞ বা সমাহিত ব্যক্তির লক্ষণটা কি? তিনি বলেন কি, করেন কি, চলেন
কোথায় কিরূপে ইত্যাদি। আজকে গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫৪ থেকে ৬৪ শ্লোক সকলের পাঠের
জন্য প্রদত্ত হল।]
৫৪) অর্জ্জুন বললেন, হে কেশব, সমাধিস্থ হয়ে
যিনি স্থিতপ্রজ্ঞ হয়েছেন, তাঁর লক্ষণ কি? স্থিতধী ব্যক্তি কিরূপ কথা বলেন, কিরূপে
অবস্থান করেন আর চলেনই বা কিরূপে?
৫৫) শ্রীভগবান বললেন—হে পার্থ,
যিনি মনোগত সমস্ত কামনা বিসর্জ্জন পুর্ব্বক পরমানন্দস্বরূপ আত্মাতে স্বয়ংই
পরিতুষ্ট থাকেন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলে কথিত হন।
৫৬) দুঃখ যাকে উদ্বিগ্ন করতে পারে না, সুখে
যার স্পৃহা নাই—যার আসক্তি নাই, ভয় নাই, ক্রোধ নাই, তাঁকেই স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি বলে।
৫৭) যিনি সকল বিষয়ে মমতাহীন, প্রিয় বস্তু
প্রাপ্তিতে যার সন্তোষ নাই, অপ্রাপ্তিতেও যার অসন্তোষ নাই, তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ।
৫৮) কুর্ম্ম যেমন করচরণাদি অঙ্গ সকল
সঙ্কুচিত করে রাখে, তেমনি যিনি রূপ রসাদি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় থেকে ইন্দ্রিয় সকল
সংবরণ করে নেন, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।
৫৯) যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয় দ্বারা বিষয় ভোগ
করেন না, তাঁর বিষয়ভোগ নিবৃত্ত হয় বটে কিন্তু বিষয়তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয় না। কিন্তু
সেই পরমাত্মা দর্শনে স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির বিষয়বাসনাও নিবৃত্ত হয়।
৬০) হে কৌন্তেয়, চিত্ত চঞ্চলকারী ইন্দ্রিয়গণ
সংযমে যত্নশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষেরও চিত্তকে বলপুর্বক হরণ করে।
৬১) যিনি আমার অনন্যভক্ত, তিনি সেই সকল
ইন্দ্রিয়কে সংযত করে আমাতে চিত্ত সমাহিতপুর্ব্বক অবস্থান করেন। যার ইন্দ্রিয় সকল
বশীভূত হয়েছে তাঁর প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৬২) বিষয়ের চিন্তা করতে করতে বিষয়ে আসক্তি
জন্মে। আসক্তি থেকে কামনা জন্মে এবং সেই কামনা বাধাপ্রাপ্ত হলে তা থেকে ক্রোধের উদ্ভব
হয়।
৬৩) ক্রোধ থেকে মোহের সঞ্চার হয় এবং মোহ
থেকে উৎপন্ন হয় স্মৃতিভ্রংশ। স্মৃতিভ্রংশ থেকে বুদ্ধিনাশ ঘটে এবং বুদ্ধিনাশ থেকেই
ঘটে বিনাশ।
৬৪) কিন্তু যার মন নিজের বশবর্তী, তিনি
রাগদ্বেষবর্জ্জিত আত্মবশীভূত ইন্দ্রিয়গণের দ্বারা বিষয় উপভোগ করে প্রসন্নতা লাভ
করে।
[ গীতার ন্যায় তত্ত্বজ্ঞান আর কোন
শাস্ত্রগ্রন্থে মানুষের হিতার্থে নেই। যিনি গীতার্থ শ্রবণ করেন অথবা কীর্ত্তন করেন
কিংবা অপরকে শ্রবণ করান, তিনি পরম পদ লাভ করেন। তাঁর যশঃ, সৌভাগ্য ও আরোগ্যের
দায়িত্ব স্বয়ং শ্রীভগবান নিজেই গ্রহণ করেন। জয় বেদভগবান শ্রীকৃষ্ণের জয়।]

No comments:
Post a Comment