[ সমগ্র গীতা গ্রন্থে যা শুনবো বা জানবো,
সেই কথারই বীজ বপন হয়ে চলেছে সাংখ্যযোগের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। এই সংসারে যখন হৃদয়ের
কামনাগ্রন্থিসকল নাশপ্রাপ্ত হয় তখনই মরণশীল মানুষ অমরত্ব লাভ করে। নিখিল
বেদান্তশাস্ত্র ও গীতার বিসয়ের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। এখানে বক্তা স্বয়ং ভগবান
শ্রীকৃষ্ণ এবং বেদান্ত শাস্ত্রে বক্তা সত্যদ্রষ্টা ঋষিগণ। আমরা গীতা বা বেদান্ত
শাস্ত্র পাঠ করে কোন মনঃকল্পিত কথা পায় না, যা সত্য চিরন্তন সেই কথায় প্রমাণ
স্বরূপ লাভ করে থাকি। অবৈজ্ঞানিক কোন বার্তার স্থান গীতা বা বেদান্তশাস্ত্রে স্থান
পায় নি। আজকের পাঠ গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৬ থেকে ৪৮ পর্যন্ত সকলের জন্য প্রদত্ত
হলো। আপনারা সকলে মনোযোগ সহকারে পাঠ করবেন, কারণ এই সুযোগ জীবনে বার বার আসবে
না।।]
৩৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে বললেন--- তা
ছাড়া, তোমার শত্রুগণ তোমার সামর্থ্যের নিন্দা ও অনেক অবাচ্য কথা বলবে। তার চেয়ে
অধিক দুঃখের আর কি আছে?
৩৭) যুদ্ধে যদি নিহত হও তবে স্বর্গলাভ করবে।
আর যদি জয়লাভ কর, তবে পৃথিবী ভোগ করবে। সুতরাং, হে কৌন্তেয়, যুদ্ধ করার জন্য স্থির
সংকল্প গ্রহণ করে উত্থিত ( যুদ্ধার্থ প্রস্তুত) হও।
৩৮) সুখ- দুঃখ, লাভ- ক্ষতি, জয়- পরাজয় এ সব
সমান জ্ঞান করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। এরূপ করলে আর তুমি পাপভাগী হবে না।
৩৯) হে পার্থ, তোমাকে এতক্ষণ সাংখ্যনিষ্ঠা
বিষয়ক উপদেশ দিলাম। এখন যোগবিষয়ক উপদেশও শ্রবণ কর। এই জ্ঞান লাভ করলে তোমার কর্ম্মবন্ধন
ছিন্ন হয়ে যাবে।
৪০) এতে ( এই নিষ্কাম কর্ম্মযোগে) আরদ্ধ
নিষ্ফল হয় না এবং ত্রুটি –বিচ্যুতি জনিত পাপও এতে নেই। এই ধর্ম্মের স্বল্প আচরণও
মহাভয় থেকে ত্রাণ করে।
৪১) হে অর্জ্জুন, এই নিষ্কাম কর্ম্মযোগ
নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি এক নিষ্ঠই থাকে কিন্তু অব্যবসায়ী অর্থাৎ কামনাপরায়ণ
ব্যক্তিদিগের বুদ্ধি অনন্ত কামনাবশতঃ বহুশাখাবিশিষ্ট হয়ে যায়।
৪২) হে পার্থ, অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ বেদের
কর্ম্মকাণ্ডের স্বর্গফলাদি প্রকাশক মধুর বাক্যে অনুরক্ত হয়।
৪৩) তারা ভোগৈশ্বর্য্য লাভের উপায়স্বরূপ
বিবিধ ক্রিয়া কল্যাণের প্রশংসাসূচক আপাত মনোরম বেদবাক্য বলে থাকে।
৪৪) এই সমস্ত শ্রুতিসুখকর বাক্য দ্বারা
যাদের চিত্ত বিভ্রান্ত এবং ভোগৈশ্বর্য্যে যারা আসক্ত, সেই সকল ব্যক্তির কর্ত্তব্য-
অকর্ত্তব্য নির্ণয়কারী বুদ্ধি ঈশ্বরে একনিষ্ঠ হয় না।
৪৫) বেদসমূহ ত্রিগুণাত্মক। হে অর্জ্জুন,
তুমি ত্রিগুণের অতীত হও। তুমি নির্দ্বন্দ্ব হও,নিত্যসত্ত্বগুণাশ্রিত হও,
যোগক্ষেমরহিত ও আত্মবান হও।
৪৬) সকল স্থান জলে প্লাবিত হলে কূপাদি
ক্ষুদ্র জলাশয়ের যে প্রয়োজন, তত্ত্বদর্শী ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের বেদেও সেই প্রয়োজন।
৪৭) কর্ম্মেই তোমার অধিকার, কর্ম্মফলে কদাচ
তোমার অধিকার নেই। কর্ম্মফল লাভ করাই যেন তোমার কর্ম্মের উদ্দেশ্য না হয়, আবার
কর্ম্মত্যাগেও যেন প্রবৃত্তি না হয়।
[ আমরা ৩৬ থেকে ৪৭ শ্লোক পাঠ করলেই দেখতে
পাবো অর্জ্জুনকে ভগবান ত্রিগুণাতীত হয়ে কর্ম্ম করার উপদেশ দিচ্ছেন। বেদসহ বিশ্বের
বিভিন্ন ধর্ম্মগ্রন্থ ত্রিগুণাত্মক অর্থাৎ সত্ত্ব- রজ- তমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে
কেবল স্বর্গলাভের পথ দেখায় এবং স্বর্গের সুখ ভোগের কথায় বলে। গীতা স্বর্গীয় ভোগ
ঐশ্বর্যের ঊর্ধ্বে উঠে অমরত্ব লাভের পথ দেখায়। তাই গীতার উপদেশ লাভ করলে বিশ্বের
সমস্ত শাস্ত্রের জ্ঞান স্বাভাবিকভাবেই হয়ে যায়। জয় বেদভগবান শ্রীকৃষ্ণের জয়।]

No comments:
Post a Comment