বিশ্বমানব শিক্ষায় পবিত্র জ্ঞানের আলো। [
সুরা—৩ আলে—ইমরান- ১১৬ থেকে ১২০ আয়াত।]
১১৬) নিশ্চয় যারা অবিশ্বাস করে তাদের ধনঐশ্বর্য
ও সন্তান –সন্ততি আল্লাহ্র নিকট কখনও কোন কাজে লাগবে না। তারাই জাহান্নামী, সেখানে
তারা চিরস্থায়ী হবে।
ভাবার্থঃ--- অজ্ঞ, শ্রদ্ধাহীন, সংশয়ী চিত্ত
ও অবিশ্বাসী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের এজগতের ধন- ঐশ্বর্য ও সন্তান- সন্ততি অপবিত্র
অবস্থাতেই থেকে যায়, অপবিত্র দ্রব্য কোনদিন আল্লাহ্র ইবাদতে লাগে না। যারা নিজের
জীবন ও নিজের জীবনের সাথে যুক্ত বস্তু সমূহকে পবিত্র করতে জানে না তারাই অজ্ঞ ও
অবিশ্বাসী। এদের জীবন ও জীবনের সংস্পর্শও অপবিত্র। এরা এখানেও জাহান্নামী জীবনের
বোঝা বহে, পরকালে গিয়েও জাহান্নামী জীবনের বোঝা বইবে এবং তাদের সেই জীবনকেই
চিরস্থায়ীভাবে বেছে নিয়েই সেখানে যাবার প্রস্তুতি চলে এই পৃথিবীর বুকে। তাদেরকে
পবিত্র পথ দেখালেও দেখতে পায় না, পবিত্র কথা শুনালেও শুনতে পায় না, তাদের কাছে
পবিত্র জিনিষ যাওয়া মাত্র অপবিত্র হয়ে যায় তাদের স্বভাব দোষে।
১১৭) তারা যা কিছু পার্থিব জীবনে ব্যয় করে
তার দৃষ্টান্ত হিমশীতল বায়ুর মত, তা যে জাতি নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছে তাদের
শস্যক্ষেত্রকে আঘাত করে ও বিনষ্ট করে। আল্লাহ্ তাদের প্রতি কোন জুলুম করেননি,
তারাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।
ভাবার্থঃ—অবিশ্বাসী ও সংশয়ী চিত্তের
ব্যক্তিরা পার্থিব জীবনের বোঝা কিভাবে বইতে হয় তা জানে না এবং এই জীবন সম্পদকে
কিভাবে ব্যয় করতে হয় তাও জানে না, তাই তারা নিজের ক্ষেত্রকে অপবিত্র করেই রেখে
দেয়, এখানে হিমশীতল বায়ুর প্রভাবে কোন পবিত্র ফসল ফলতে পারে না। বর্ষণের উপযুক্ত
বায়ু প্রবাহিত না হলে সে ক্ষেত্রে কিভাবে বৃষ্টিপাত হবে? আর বৃষ্টিপাত না হলে সেই
ক্ষেত্রে ফসল ফলবেই বা কিরূপে? মানব জাতি মননশীল জাতি। তাদের দেহ হলো শস্যক্ষেত্র,
এই শস্যক্ষেত্রে যে যেমন শস্যবীজ বপন করে ফসল ফলাতে পারবে সে তত উন্নতমানের মানুষ
হবে। পবিত্র জ্ঞানরূপ ফসল ছাড়া অন্য ফসল আল্লাহ্র ইবাদতে লাগে না। এখন যারা নিজের
প্রতি জুলুম করে শস্যক্ষেত্র বিনষ্ট করে, তারা সকলেই অবিশ্বাসী অপবিত্র আত্মা হয়েই
চিরকাল থেকে যায়। আল্লাহ্ এসব জাতির প্রতি জুলুম করেন না, তারাই নিজেদের প্রতি
নিজেরাই জুলুম করে জাহান্নামবাসীর তালিকা বৃদ্ধি করে। মননশীল জাতিকে মনের দ্বারা
নিজের ক্ষেত্র চাষ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানময় ফসল ফলিয়ে তা নিজের প্রতিপালককে উৎসর্গ করে
জীবনক্ষেত্র পবিত্র রাখতে হয় ফিরে যাবার জন্য।
১১৮) হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের আপনজন ব্যতীত অন্য
কাকেও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের বিভ্রান্ত ( অনিষ্ট) করতে ত্রুটি
করবে না, যা তোমাদেরকে বিপন্ন করে তাই তারা কামনা করে। তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ
পায় এবং যা তাদের অন্তর গোপন রাখে তা আরও রুতর। তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে
বিবৃত করছি, যদি তোমরা অনুধাবন কর।
ভাবার্থঃ—স্বরূপবিজ্ঞানীরাই একমাত্র
বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল সত্তা, তাদের অন্তরে সদায় ভক্তির স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে
নিজের প্রতিপালকের প্রতি। তাই যারা এই পথের পথিক ও আপনজন কেবল তাদেরই সান্নিধ্যে
থাকা উচিত বিশ্বাসীদের। কারণ সঙ্গদোষ মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। পাপীর সাথে থাকলে যেমন
দিন দিন পাপ মনোবৃত্তি বৃদ্ধি পায় তেমনি পুণ্যবানের সাথে থাকলে পুণ্যের সংযোগের
দুয়ার দিন দিন খুলতেই থাকে। অজ্ঞ, অবিশ্বাসী ও সংশয়ী চিত্তের ব্যক্তিরা কোনদিন
ভাল- মন্দের বিচার করতে পারে না, তারা কোনটা জাহান্নামী বস্তু আর কোনটা জান্নাতের
বস্তু তাও চিনে না। বিদ্বেষ ও হিংসা প্রবণ মন তাদের চিরসাথী, তাই তাদের সান্নিধ্য
ত্যাগ করে চলায় বিশ্বাসীদের পক্ষে মঙ্গল। মানুষের স্বভাবই হচ্ছে মানুষের ধর্ম,
স্বভাবকে উন্নতমূখী করে ধরে রাখার জন্য মানুষকে কতভাবে সাধনা করতে হয়। সঙ্গদোষে
যদি সেই স্বভাবের একবার পতন হয় তবে তাকে ঊর্ধ্বমূখী করা বড়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
১১৯) দেখ! তোমরা বন্ধু ভেবে তাদের ভালবাস;
কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না এবং তোমরা সমস্ত কিতাবে বিশ্বাস কর। ( কিন্তু
তারা তোমাদের কিতাবে বিশ্বাস করে না) এবং যখন তারা তোমাদের সংস্পর্শে আসে তখন তারা
বলে, আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু যখন তারা একা হয় তখন তোমাদের প্রতি আক্রোশে তারা
নিজেদের আঙুল দাঁতে কাটে। বল, আক্রোশেই তোমরা মর। নিশ্চয় অন্তরে যা রয়েছে সে
সম্বন্ধে আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত।
ভাবার্থঃ—তোমরা বন্ধু ভেবে যাদের ভালবাস,
বিশ্বাস কর, তারা কি তোমাদেরকে বিশ্বাস করে, ভালবাসে? দেখবে সহজ – সরল- বিশ্বাসী-
সত্যজ্ঞানীদের বন্ধু জগতে খুবই দুর্লভ। এই সব বিশ্বাসী লোকদের একমাত্র বন্ধু নিজের
প্রতিপালক ও ফিরিশতাগণ, কারণ অধিকাংশ মানুষ সমস্ত ধর্মগ্রন্থের সত্যতাকে বিচার
করার শক্তি লাভ করে না। তাই তারা সংকীর্ণতার মধ্যেই আবদ্ধ থেকে যায়। সুযোগ সন্ধানী
বন্ধুরূপে তারা আসে এবং সুযোগ গ্রহণ করেই বিশ্বাসঘাতক হয়ে আবার সংকীর্ণতায় ডুবে
যায়। এরা তোমার সামনে তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তোমার মত কথা বলবে, আবার তোমার
কাছ থেকে ফিরে গেলেই ভিন্নরূপ ধরবে ও অন্যের কাছে সুযোগ নেওয়ার জন্যে তোমার ক্ষতি
করতে এতটুকুও দ্বিধা করবে না। যদিও উদার মহান বিশ্বাসী ব্যক্তিদের সাথে আল্লাহ্
সদায় থাকেন। তাই তাদের লাফালাফি দাপাদাপিই সার হয়, তারা কিছুই ক্ষতি করতে পারে না।
আল্লাহ্ সবার অন্তরের ভাব- ভাবনা জানেন এবং তিনিই সবায়কে যার যেমন ভাব –ভাবনা সেই
অনুযায়ী খেলিয়ে নিয়ে বেড়ান।
১২০)
যদি তোমাদের কোন কল্যাণ হয় তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ্ তা পরিবেষ্টন করে রয়েছেন।
ভাবার্থঃ--- যারা জগতের সবার কল্যাণ কামনায়
নিজের জীবন উৎসর্গ করে তাদেরকে আল্লাহ্ নিজের বিশাল বলয়ের মধ্যে পরিবেষ্টন করে
রাখেন, তাই তাদের যে ক্ষতি করতে যায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে
নিজের ভাবমূর্তি কালা করে। তাই কল্যাণমুখী মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র যত করবে ততই
তাদের এগিয়ে যাবার পথ সহজ – সরল হয়ে যাবে। কল্যাণমুখী বৃক্ষের মূল ঊর্ধ্বমুখী ও
তার ডালপালা নিম্নমুখী, তাই তার ডাল-পালা যত ছাঁটবে ততই নব নব পল্লব নিয়ে তা বের
হতে থাকবে। আর এর মূল উপড়ে ফেলার শক্তি কারো নেই, কারণ এই বৃক্ষের মূল যে কোথায় তা
ষড়যন্ত্রকারীরা কোনদিন-ই জানতে পারবে না।
জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের আলোর
জয়।

No comments:
Post a Comment