বিশ্বমানব
শিক্ষায় কুরআনের আলো। [ সুরা—২ আল- বাকারা ১০৯ থেকে ১১৩ আয়াত।]
১০৯)
তাদের নিকট সত্য প্রকাশিত হবার পরও, গ্রন্থধারীদের মধ্যে অনেকেই ঈর্ষামূলক মনোভাব
বশত বিশ্বাসের পর আবার তোমাদেরকে অবিশ্বাসী রূপে ফিরে পাবার আকাঙ্ক্ষা করে। তোমরা
ক্ষমা কর, উপেক্ষা কর, যতক্ষণ না আল্লাহ্ কোন নির্দেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সকল
বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
মর্মার্থঃ—প্রকৃত সত্য জানার পরেও শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতরাও ঈর্ষামূলক মনোভাব
ত্যাগ করতে পারে না। এর কারণ মানুষের চিত্ত চঞ্চল, পার্থিব জগতের চাকচিক্যতা দেখে
বিবেকসম্পন্ন মানুষও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। ইন্দ্রিয়গণকে সংযত করার জ্ঞান ও শক্তি না
থাকলে মানুষ নিজের চিত্তকে স্থির রাখতে সক্ষম হয় না। তাই এই জগত সংসারে বড় বড়
জ্ঞানীগুণীদেরও দেখা যায় তারা সত্যকে জেনেও মিথ্যাকে সমর্থন করে, অর্থাৎ অবিশ্বাসী
লোকদের নিজের দিকে দলভারী করার জন্য পাবার আকাঙ্ক্ষা করে। আল্লাহ বা ঈশ্বর এই সব
জ্ঞানীগুণীদের ক্ষমা করে, উপেক্ষা করার কথা বলেছেন সত্যমুখীদের। তার কারণ আল্লাহ্
বা ঈশ্বর সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান, তাঁর কাছে কোন ছলচাতুরী চলে না, সে যত বড়ই মহান
হোক কেন। মানুষ ঈশ্বরকে ফাঁকি দিতে পারে কিন্তু নিজের বিবেককে অর্থাৎ নিজেকে
ফাঁকি দিতে পারে না।
১১০) আর তোমরা নামাযকে যথাযথ ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত
কর এবং যাকাত দাও(দান কর)। উত্তম কাজের যা কিছু পূর্বে প্রেরণ করবে আল্লাহ্র নিকট
তা পাবে। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা দেখেন।
মর্মার্থঃ—নামায অর্থাৎ সত্যজ্ঞানকে যথাযথভাবে
অন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে কেউ সেই সম্পদ অন্যকে যাকাত বা দান করতে পারেন
না। জ্ঞান দানের থেকে মহৎ দান আর দ্বিতীয় নাই। জ্ঞান দানকেই আল্লাহ্ বা ঈশ্বর
যাকাত বলেছেন। এই উত্তম কাজ করেই মানুষকে আল্লাহ্র বা ঈশ্বরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের
ঘরের সাথে অগ্রিম যোগসূত্র স্থাপন করতে হয়, মানুষ এই বিশ্বে যা করেন তা তিনি সব
দেখেন, তিনি এমনি এক মহাশক্তি হয়ে সবার অন্তরে রয়েছেন, তাই তো তিনি
অন্তর্যামী।
১১১) এবং
তারা বলে, ইহুদী বা খৃষ্টান ছাড়া ছাড়া অন্য কেউ কখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এটা
তাদের মিথ্যা আশা। বল, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে প্রমাণ উপস্থিত কর।
মর্মার্থঃ—আল্লাহ্ বা ঈশ্বর নিজের সবকিছু দিয়ে
মানুষ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু মানুষের মধ্যে কোন জাতি তিনি সৃষ্টি করেন নি, এই
আয়াতে তিনি তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাই মানুষের জাতির ভিত্তিতে স্বর্গ- নরক বা
জান্নাত- জাহান্নামের কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা আশা। সৎ কর্ম, সৎ বুদ্ধি, সৎ জ্ঞান, সৎ
চিন্তার ভিত্তিতে মানুষের উত্থান – পতন হয়। মিথ্যা আশা নিয়ে কেউ সত্যবাদী হতে পারে
না ও সত্যের প্রমাণ দরবারে দাখিল করতে পারে না।
১১২) হাঁ, যে সৎ কাজ করে এবং আল্লাহ্র নিকট
সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে, তার পুরষ্কার তার প্রতিপালকের কাছে রয়েছে এবং তাদের
কোন ভয় নেই ও তারা দুঃখিত হবে না।
মর্মার্থঃ—এই পৃথিবী
কর্মভূমি ও জ্ঞানপীঠ মানুষের জন্য। তাই মানুষকে কর্ম ও গুণের উপর ভিত্তি করে
মর্যাদা দেওয়া হয় সর্বত্র। তাই আল্লাহ্ বা ঈশ্বরের রাজত্বে যে সৎ কাজ করবে এবং
নিজেকে তাঁর চরণতলে সমর্পণ করবে সেই
পুরষ্কার পাবে বিভিন্ন দিক থেকে। তাদের ক্ষেত্রে কোথাও কোন ভয় নেই এবং তারা
কোথাও দুঃখিতও হবে না।
১১৩) ইহুদীরা বলে, খৃষ্টানদের কোন ভিত্তি নেই,
এবং খৃষ্টানগণ বলে, ইহুদীদের কোন ভিত্তি নেই, অথচ তারা কিতাব (আসমানীগ্রন্থ) পাঠ
করে। এভাবে যারা কিছুই জানে না তারাও অনুরূপ কথা বলে। সুতরাং যে বিষয়ে তাদের মতভেদ
আছে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ্ তার মীমাংসা করবেন।
মর্মার্থঃ—এই বিশ্বে মানুষের যে জাত-পাতের কোন ভিত্তি নেই, তা
আল্লাহ্ ইহুদী, খৃষ্টানদের প্রসঙ্গ টেনে পরিষ্কার এই আয়াতে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
আসমানীগ্রন্থ যারা পাঠ করে তাদের কিভাবে জাতের অহংকার আসতে পারে? ঐশীগ্রন্থের
সূত্র বা আয়াত তো প্রত্যেকের হৃদয়াকাশের সাথে যুক্ত। তাই মানুষের অন্তরের যে
সত্যজ্ঞান তা সবার ক্ষেত্রে এক। যারা সত্য জানে না তারা অজ্ঞতার অন্ধকারে থেকে নিজেকে
অন্যের থেকে আলাদা ভাবে এবং জাত-পাতের সৃষ্টি করে। এই মতভেদ শেষ বিচারের দিন নাশ
হয়ে যায়। শেষ বিচারের দিন বলতে কি বুঝায়? অনেকেই ভাবেন প্রলয়ের দিনকে শেষ বিচারের
দিন বলা হয়, তিনি এই দিন পৃথিবীর সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে বিচার সভা বসাবেন সবার
বিচারের জন্যে। শেষ বিচারের দিন বলতে জীবের জন্য বুঝায় একটা ধার্য সময় পর্যন্ত
কর্ম করার সুযোগ পাওয়ার পরে বিচারের দিন। জীবাত্মাকে কতবার তাঁর বিচার সভায় হাজিরা
দিতে হয় ও অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হয় ক্ষমা চেয়ে তার হিসেব কেউ রাখে না, কিন্তু তিনি সব
রাখেন। এইভাবে শেষে একদিন আসে সেই জীবাত্মার শেষ বিচারের দিন। এই দিন আর সেই
জীবাত্মা কোন সুযোগ পায় না শাস্তি থেকে মুকুবের। আর যারা তাঁর নির্দেশ পালন করে
কর্ম করেন তাদেরকে কেনো বিচার সভায় যেতে হবে? তারা তো পুরষ্কার পেয়ে তাঁর মনোনীত
ঘরে স্থান পাবেই। জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও পবিত্র কুরআনের জ্যোতিঃর জয়।

No comments:
Post a Comment