বিশ্বমানব
শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ অভিযান(১৪৯) তারিখঃ—২৫/ ১২/ ২০১৭
আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ—[ গার্হস্থ্য জীবনে
থেকেই বেদযজ্ঞ করে নিজ আত্মসত্তার বিস্তৃতি ঘটিয়ে মানুষকে পূর্ণ মানুষ হতে হয়।]
ভগবান মনুর বক্তব্য হচ্ছে—পুরুষ, তার স্ত্রী
এবং সন্তান- সন্ততি মিলেই একজন “পূর্ণ মানুষে” পরিণত হয়। যতদিন এর অভাব থাকে ততদিন
সে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ না করলে কেউ যেমন কলেজে প্রবেশ
করতে পারে না তেমনি গার্হস্থ্যের শিক্ষালাভ না করা অবধি বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস
জীবনে প্রবেশ করাও কঠিন। মানুষের আত্মীয়তার সীমা ক্রমশই বাড়ে। মানুষ প্রথমে একলা
থাকে, পতিপত্নী হলে দুই, এর পর সন্তানের জন্ম হলে দুই থেকে তিন, তার পর ক্রমশঃ
আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ, রাজ্য, প্রদেশ, রাষ্ট্র এবং সারা বিশ্বে তার
আত্মীয়তার বিস্তার হয়ে যায়। পরবর্তীকালে সমগ্র মানবজাতির প্রতিই তার এই আত্মভাব
বিস্তৃত হয়ে থাকে। তারপর পশু পাখী থেকে শুরু করে কীট পতঙ্গ, জড় চেতন সমস্ত কিছুর
প্রতিই তার আত্মভাব বিকশিত হয়ে যায়। যে উন্নতি এক থেকে বেড়ে দুই, দুই থেকে তিন
হয়েছিল, সেটিই ক্রমশঃ বাড়তে থাকে এবং চরাচরের সমস্ত কিছুতেই সে আত্মসত্তার
বিস্তৃতি অনুভব করে। সর্বত্র সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মার দিব্যজ্যোতিকেই সে
সমুজ্জ্বল রূপে দর্শন করে। নিজের স্ত্রীর জন্য মন থেকে যতটা ত্যাগ স্বীকার করে ঠিক
ততটাই তাকে ব্যক্তিগত চাহিদা ত্যাগ করতে হয়। এর পর সন্তান সন্ততি হলে তার সেই
আত্মসংযমের মাত্রাও ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। এভাবেই জীব সম্পূর্ণরূপে আত্মসংযমী হয়ে
ওঠে। অপরের জন্য নিজেকে ভুলে থাকার অভ্যাস এতটাই পরিপক্ক হয়ে ওঠে, যার ফলে তার
নিজের বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, সবই অপরের জন্য সমর্পিত হয়ে যায়। ‘ আমার নিজের
বলতে কিছুই নেই, যা কিছু আছে সবই তোমার’ এই একটিই ধ্বনি তার মনে অনবরত জেগে ওঠে।
সে তখন নিজের ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে ক্রমশঃ ঈশ্বরের সাথে একরূপ হয়ে যায়। ‘আমি’
বোধটুকু মিটে গেলে কেবল ‘তুমি’ই অবশিষ্ট থেকে যায়। গৃহস্থ্যযোগের এই ছোট অথচ
সর্বসুলভ সাধনাটির যখন ক্রমবিকাশ ঘটে আত্মা তখন পরমাত্মার স্বরূপ লাভ করে।
অপূর্ণতা থেকে মুক্তিলাভ করে পূর্ণত্বের উপলব্ধি ঘটে, যোগের বাস্তবিক উদ্দেশ্য
পূরণ হয়। জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞের জয়।

No comments:
Post a Comment