[ গীতার সাংখ্য
দর্শন ও বেদান্তের দর্শনের লক্ষ্য একই। যে জ্ঞানভূমিতে সাংখ্য ও বেদান্ত অভিন্ন,
সেই ভূমিতেই গীতাশাস্ত্রের অবস্থিতি। উভয় শাস্ত্রের সার কথা—আত্মা অজড়, অমৃত এবং
অপরিবর্ত্তনীয় সত্য। আত্মা প্রকৃতির অতীত চৈতন্যস্বরূপ বস্তু, উভয় শাস্ত্রের এই
ঐক্যের স্থানটিতে বেদান্ত ও সাংখ্য যেন ঝিনুকের দুইটি কপাট। সেই দুই কপাটের আড়ালে
যে তত্ত্ব-জ্ঞানের মুক্তা গুপ্ত আছে, তা নিয়েই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতার মন্ত্রমালা
গাঁথতে বসেছেন। তাই সর্ব্বপ্রথমেই সেই সারাৎসার আত্মার কথাটি অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে
দিলেন, তাঁর সমস্ত দুর্বলতাকে নাশ করার জন্য। আজকে সকলের জন্য গীতার সাংখ্যযোগের
২৫ থেকে ৩৫ শ্লোক পাঠ প্রদত্ত হলো। গীতা পাঠ নিজে করুন এবং অন্যকে পাঠ করার সুযোগ
করে দিন—এতে সবার মঙ্গল হবে।
২৫)
অব্যক্তোহয়মচিন্ত্যোহয়মবিকার্যোহয়মুচ্যতে। তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং
নানুশোচিতুমর্হসি।। অনুবাদঃ-- ইনি অব্যক্ত, ইনি অচিন্ত্য, ইনি অবিকার্য্য এই রূপ
বলা হয়েছে। অতএব এঁকে এই প্রকার জেনে তোমার শোক করা উচিত নয়।
২৬) অথ চৈনং
নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্যসে মৃতম। তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈবং শোচিতুমর্হসি।।
অনুবাদঃ-- আর তুমি যদি মনে কর যে, দেহের সঙ্গে আত্মা নিত্যই জন্মে এবং নিত্যই
বিনষ্ট হয়, তথাপি হে মহাবাহো, তোমার শোক করা উচিত নয়।
২৭) জাতস্য হি
ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃত্যুস্য চ। তস্মাদপরিহার্যেহর্থে ন ত্বং
শোচিতুমর্হসি।। অনুবাদঃ-- কারণ, যে
জন্মগ্রহণ করেছে তার মৃত্যু নিশ্চিত। আবার যে মরে তার আবার জন্মও নিশ্চিত। সুতরাং
যা অবশ্যম্ভবী তার জন্য তোমার শোক করা উচিত নয়।
২৮)অব্যক্তাদীনি
ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত। অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা।। অনুবাদঃ-- হে
ভারত, আদিতে অব্যক্ত ছিল, মধ্যে ব্যক্ত, মরণের পর আবারও অব্যক্ত। কাজেই ইহাতে শোক
করার কি আছে?
২৯) আশ্চর্যবৎ
পশ্যতি কশ্চিদেনমাশ্চর্যবদ্বদতি তথৈব চান্যঃ। আশ্চর্যবচ্চৈনমন্যঃ শৃণোতি
শ্রুত্বাপ্যেনং বেদ ন চৈব কশ্চিৎ।। অনুবাদঃ-- কেউ কেউ আত্মাকে অদ্ভুত রূপে মনে
করেন, আবার কেউ এঁকে অদ্ভুত বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু শাস্ত্রগুরুবাক্য শুনেও কেউ
এঁদের স্বরূপ জানতে পারে না।
৩০) দেহী
নিত্যমবধ্যোহয়ং দেহে সর্বস্য ভারত। তস্মাৎ সর্বাণি ভূতানি ন ত্বং শোচিতুমর্হসি।।
অনুবাদঃ-- হে ভারত, সকলের দেহেই আত্মা সর্ব্বদায় অবধ্য। অতএব কোন প্রাণীর জন্যই
তোমার শোক করা উচিত নয়।
৩১)স্বধর্মমপি
চাবেক্ষ্য ন বিকম্পিতুমর্হসি। ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন
বিদ্যতে।। অনুবাদঃ-- স্বধর্ম্মের দিকে দৃষ্টি করলেও তোমার বিচলিত হওয়া উচিত নয়। কারণ, ক্ষত্রিয়ের
পক্ষে ধর্ম্মযুদ্ধের চেয়ে শ্রেয়ঃ আর কিছুই নেই।
৩২) যদৃচ্ছয়া চোপপন্নং স্বর্গদ্বারমপাবৃতম। সুখিনঃ
ক্ষত্রিয়াঃ পার্থ লভন্তে যুদ্ধমীদৃশম।। অনুবাদঃ-- হে পার্থ, এই যুদ্ধ মুক্ত
স্বর্গদ্বার স্বরূপ। এ আপনা থেকেই উপস্থিত হয়েছে। ভাগ্যবান ক্ষত্রিয়গণই এই
জাতীয় যুদ্ধ লাভ করে থাকেন।
৩৩) অথ চেৎ
ত্বমিমং ধর্ম্যং সংগ্রামং ন করিশষ্যসি। ততঃ স্বধর্মং কীর্তিঞ্চ হিত্বা
পাপমবাপ্স্যসি।। অনুবাদঃ—কিন্তু যদি তুমি এই ধর্মযুদ্ধ না করো তা হলে স্বধর্ম ও
কির্তি হতে চ্যুত হয়ে পাপভাগী হবে।
৩৪) অকীর্তিঞ্চাপি ভূতানি কথয়িষ্যন্তি
তেহব্যয়াম। সম্ভাবিতস্য চাকীর্তির্মরণা দতিরিচ্যতে।। অনুবাদঃ—এবং সকলেই তোমার এই
দীর্ঘকালস্থায়ী অকীর্তি (অখ্যাতি) নিয়ে আলোচনা করবে। মাননীয় ব্যক্তির পক্ষে এই
অকীর্তি মৃত্যুর চেয়েও পীড়াদায়ক।
৩৫)
ভয়াদ্রণাদুপরতং মংস্যন্তে ত্বাং মহারথাঃ। যেষাং চ ত্বং বহুমতো ভূত্বা যাস্যসি
লাঘবম।। অনুবাদঃ-- মহারথগণ মনে করবেন,
তুমি মৃত্যুভয়ে যুদ্ধ থেকে বিরত হয়েছ। তোমাকে সম্মানের চক্ষে যারা দেখতেন; তাঁদের
কাছে তুমি এখন ছোট হয়ে যাবে।
[ গীতার বাণী
আত্মার জাগরণের বাণী। মানুষ হয়ে যদি নিজ আত্মার জাগরণ ঘটাতে মানুষ সক্ষম না হয় তবে
এককথায় মানব জীবন বৃথা। অধিকাংশ মানুষ অনিত্য সুখের পিছনে ছুটে বৃথা সময় নষ্ট করে,
আত্মিক সুখের কথা কেউ চিন্তা করার সময় পায় না। শ্রীগীতা অর্জ্জুনের মাধ্যমে মানব
জাতিকে আত্মিক সুখের কথা বলেছেন। জয় বেদভগবান শ্রীকৃষ্ণের জয়।]

No comments:
Post a Comment