[পবিত্র গীতা জাতীয়জ্ঞান, মানবিক মুল্যবোধ,
নৈতিকজ্ঞান ও আত্মিকজ্ঞানের এক মহামূল্যবান জাতীয় গ্রন্থ। এই গ্রন্থকে যারা
গুরুরূপে বরণ করে নিয়ে সংসার, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংগ্রাম মঞ্চে অবতীর্ণ হন,
তাঁরা ঘোর বিপদেও নিজের জ্ঞান হারান না। তাই অর্জ্জুনের চরিত্রে মানবিক মূল্যবোধ
ফুটে উঠেছে যুদ্ধক্ষেত্রেও। তাঁর সামনে অত্যাচারী দুর্যোধনের দল দাঁড়িয়ে রয়েছেন
তাঁকে বধ করার আনন্দে কিন্তু তিনি সেই সব শক্রদের দেখেও অনুতপ্ত হচ্ছেন এবং
তাদেরকে বধ করাতে কোন প্রকার মহত্ত ও সুখ খুঁজে পাচ্ছেন না। বর্তমান রাজনীতিতে
মানবিক মুল্যবোধ খুঁজে পাওয়া যায় না। শ্রীগীতায় মানবিক মূল্যবোধের উপরই বেশী গুরুত্ব দেওয়ায় তা
সার্ব্বজনীন হয়ে উঠেছে জাতীয় জীবনে। আজকে গীতার প্রথম অধ্যায়ের ২৯ থেকে ৩৬ শ্লোক সকলের
পাঠের জন্য প্রদত্ত হলো।]
২৯)বেপথুশ্চ
শরীরে মে রোমহর্ষশ্চ জায়তে। গাণ্ডীবং স্রংসতে হস্তাং ত্বক চৈব পরিদহ্যতে।।
অনুবাদঃ-- অর্জ্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন---- আমার দেহে কম্প আর সর্ব্বাঙ্গে
রোমাঞ্চের উদয় হচ্ছে। আমার হাত থেকে গাণ্ডীব খসে পড়ছে। আমার গায়ের চামড়া পুড়ে
যাচ্ছে।
৩০)ন চ
শক্লোম্যবস্থাতুং ভ্রমতীব চ মে মনঃ। নিমিত্তানি চ পশ্যামি বিপরীতানি কেশব।। অনুবাদঃ--
হে কেশব, আমি স্থির থাকতে পারছি না, আমার মন যেন চাকার মত ঘুরছে। আমি নানা প্রকার
দুর্নিমিত্তও দেখতে পাচ্ছি।
৩১)ন চ
শ্রেয়োহনুপশ্যামি হত্বা স্বজনমাহবে। ন কাঙ্ক্ষে বিজয়ং কৃষ্ণ ন চ রাজ্যং সুখানি চ।।
অনুবাদঃ-- যুদ্ধে আত্মীয়- স্বজনদিগকে বধ করার মধ্যে তো আমি কোন কল্যাণ দেখতে
পাচ্ছি না। হে কৃষ্ণ, আমি জয় চাই না, রাজ্য চাই না, সুখ চাই না।
৩২—৩৪) কিং নো
রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা। যেষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ
সুখানি চ।।৩২।। ত ইমেহবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্ত্বা ধনানি চ। আচার্য্যাঃ
পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ।। মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ
সম্বন্ধিনস্তথা।।৩৩।। এতান্ন হস্তুমিচ্ছামি ঘ্নতোহপি মধুসূদন। অপি ত্রৈলোক্যরাজস্য
হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে।।৩৪।। অনুবাদঃ-- হে
গোবিন্দ, আমাদের রাজ্যে কোন প্রয়োজন, সুখেই বা প্রয়োজন কী? এমন কী জীবনে কোনও
প্রয়োজন দেখছি না। যাদের জন্য রাজ্য, ভোগ সুখাদি আমরা কামনা করি সেই আচার্য্যগণ,
পিতৃপিতামহ স্থানীয় গুরুগণ, পুত্রগণ, মাতুল, শ্বশুর, শ্যালক ও অন্যান্য
কুটুম্ববর্গ ধনপ্রাণের মায়া ত্যাগ করে এখানে যুদ্ধের জন্য উপস্থিত হয়েছেন। এঁরা
যদি আমাকে বধও করেন তথাপি আমি এঁদের মারতে ইচ্ছা করি না—পৃথিবীর জন্য তো নয়ই,
ত্রৈলোক্যরাজ্যের নিমিত্তও এমন ইচ্ছা করি না।
৩৫)নিহত্য
ধার্ত্তরাষ্ট্রান নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দ্দন। পাপমেবাশ্রয়েদস্মান
হত্বৈতানাততায়িনঃ।। অনুবাদঃ-- হে জনার্দন! ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণকে বধ করে আমাদের
কী সুখ হতে পারে? যদিও এঁরা আততায়ী, তথাপি এঁদের বধ করলে আরো পাপভাগীই হবো।
৩৬) তস্মান্নার্হা
বয়ং হন্তুং ধার্ত্তরাষ্ট্রান সবান্ধবান। স্বজনং হি কথং হত্বা সুখিনঃ স্যাম মাধব।।
৩৬।। অনুবাদঃ--অতএব সবান্ধব ধৃতরাষ্ট্র পুত্রগণকে বধ করা আমাদের সমুচিত হবে না। হে
মাধব, আত্মীয়দিগকে বধ করে আমরা কি প্রকারে সুখী হব?
[ অর্জ্জুন কেবল বীর যোদ্ধায় ছিলেন না, তিনি ছিলেন তত্ত্বজ্ঞ জ্ঞানী। তিনি
জানতেন এই বসুধার সকলেই তাঁর আত্মীয়। আত্মীয়কে বধ করে কেউ সুখী হতে পারেন না।
পার্থিব জগতের সুখ ভোগের আশায় যারা তাঁদের চোখে আততায়ী হয়ে আছেন তাঁরাও সকলেই
তাঁদের আপনজন ও আত্মীয়। এই বোধ যাদের নেই তাঁরাই যুদ্ধ করতে চায়। অর্জ্জুনের ন্যায়
মহান উদার জ্ঞানী যোদ্ধা দেশপ্রমিক বিশ্ববোধে জাগ্রত আত্মা কিভাবে হত্যালীলা
চালাবেন দুর্যোধনের মতো এক অজ্ঞ বিচারহীন রাজার প্ররোচনায় পা রেখে? জয় বেদ্ভগবান
শ্রীকৃষ্ণের জয়।]

No comments:
Post a Comment