[ পবিত্র গীতা মানুষের ঐহিক ও পারমার্থিক
জীবনকে পূর্ণ করে তোলার জন্যই অবতীর্ণ হয় সংগ্রাম মঞ্চে। কাজেই আমাদের জীবনের
পারমার্থিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যা সমাধানের সংবিধান হচ্ছে এই পবিত্র গীতা
গ্রন্থ। মানব জীবনের এই সংবিধান গ্রন্থকে যারা অবহেলা করবে তারাই বিভিন্ন সমস্যাই
ভুগবে, মানব জীবনের আইনকে অমান্য করে চলার জন্য।
শ্রীমদ্ভগবদগীতার প্রথম অধ্যায়ের ২
থেকে ১১ শ্লোক যার মধ্যে ৩ থেকে ১১ শ্লোক রাজা দুর্যোধনের উক্তি গুরু
দ্রোণাচার্য্যকে। মনোযোগ সহকারে দুর্যোধনের উক্তি পাঠ করুন, তাহলেই গীতার রহস্য
উপলদ্ধি করতে পারবেন, কারণ গীতার একটি শ্লোকও বাদ দিলে গীতার রহস্য উপলব্ধি করা
যায় না। হরি ওঁ তৎ সৎ। ]
২) সঞ্জয় উবাচ—দৃষ্ট্বা
তু পাণ্ডবানীকং ব্যুঢ়ং দুর্য্যোধনস্তদা। আচার্য্যমুপসঙ্গম্য রাজা বচনমব্রবীৎ।।
অনুবাদ-- সঞ্জয় বললেন—তখন রাজা দুর্যোধন পাণ্ডবসেনা ব্যুহাকারে সজ্জিত দেখে
আচার্য্য দ্রোণের নিকট গমনপূর্ব্বক এই কথা বললেন।
৩) পশ্যৈতাং
পাণ্ডু পুত্রাণামাচার্য মহতীং চমূম। ব্যূঢ়াং দ্রুপদপুত্রেণ তব শিষ্যেণ ধীমাতা।। হে
আচার্য্য! আপনার বুদ্ধিমান শিষ্য দ্রুপদপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন কর্তৃক ব্যূহাকারে
সজ্জিত পাণ্ডবদের এই বিরাট সৈন্যদল দেখুন।
৪—৬)অত্র শূরা
মহেষ্বসা ভীমার্জুনসমা যুধি। যুযুধানো বিরাটশ্চ দ্রুপদশ্চ মহারথ।।৪।।
ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশিরাজশ্চ বীর্যবান। পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ
নরপুঙ্গবঃ।।৫।। যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্যবান। সৌভদ্রো
দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব এব মহারথাঃ।।৬।। এই
সেনাদলে ভীম ও অর্জ্জুনের সমকক্ষ মহাধনুর্দ্ধর অনেক বীর আছেন। এখানে আছেন সাত্যকি,
বিরাট, মহারথ দ্রুপদ, ধৃষ্টকেতু, চেকিতান, পরাক্রান্ত কাশীরাজ, পুরুজিৎ,
কুন্তিভোজ, নরশ্রেষ্ঠ শৈব্য, পরাক্রমশালী যুধামন্যু, বীর্য্যবান উত্তমৌজা,
সুভদ্রানন্দন অভিমন্যু এবং দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র। ইহারা সকলেই মহারথ।
৭) অস্মাকং তু যে
তান্নিবোধ দ্বিজোত্তম। নায়কা মম সৈনস্য সংজ্ঞার্থং তান ব্রবীমি তে।। হে দ্বিজবর!
আমাদের পক্ষে বিশিষ্ট যে সকল সেনাপতি আছেন, তাঁদের কথা শুনুন, আপনার অবগতির জন্য
তাঁদের নাম বলছি।
৮)ভবান ভীষ্মশ্চ
কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ। অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তিস্তথৈব চ।। আপনি নিজে ভীষ্ম কর্ণ রণজয়ী কৃপাচার্য্য
অশ্বত্থামা বিকর্ণ সোমদত্তপুত্র ভুরিশ্রবা ও জয়দ্রথ।
৯) অন্যে চ বহবঃ
শূরা মদর্থে ত্যক্তজীবিতাঃ। নানাশস্ত্রপ্রহরণাঃ সর্বে যুদ্ধবিশারদাঃ।। আমার জন্য
প্রাণ দিতে প্রস্তুত—এমন আরও বহু বীর আছেন। ইহারা সকলেই নানা অস্ত্রশস্ত্রে সুদক্ষ
ও যুদ্ধনিপুণ।
১০) অপর্যাপ্তং তদস্মাকং বলং ভীষ্মাভিরক্ষিতম।
পর্যাপ্তং ত্বিদমেতেষাং বলং ভীমাভিরক্ষিতম।। আমার মনে হয়, আমাদের সেনানায়ক ভীষ্ম
কর্তৃক রক্ষিত আমাদের সেনা অপর্য্যাপ্ত আর ভীম কর্তৃক রক্ষিত এদের (শত্রুর) সেনা
পর্য্যাপ্ত।
১১)অয়নেষু চ
সর্বেষু যথাভাগমবস্থিতাঃ। ভীষ্মমেবাভিরক্ষন্তু ভবন্তঃ সর্ব এব হি।। আপনারা সকলেই সৈন্যব্যূহ সমূহের প্রবেশদ্বারে
নিজ নিজ স্থানে অবস্থিত থেকে পিতামহ ভীষ্মকেই সর্ব্বপ্রকারে রক্ষা করতে থাকুন।
[ আমরা
দুর্যোধনের কথায় নিশ্চয় বুঝতে পারছি যে তাঁর অহংকার লোকবলের প্রতি। তাঁর দিকেই
জনসমর্থন অধিক থাকায় তাঁর বিশ্বাস তিনি ধর্মযুদ্ধেও জয়ী হবেন। পাণ্ডবপক্ষ ধর্মপথে
চলেন কিন্তু তাঁদের লোকবল নেই, তাঁরা কিভাবে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন? দুর্যোধনের
বিশ্বাস- আস্থা এই পার্থিব জগতের চাকচিক্যতা ও এই জগতের ধনদৌলত শক্তির প্রতি।
অপরদিকে পাণ্ডবপক্ষের লোকদের বিশ্বাস ও আস্থা ঈশ্বরের শক্তির প্রতি। পার্থিব জগতের
লোকবল- সম্পদ- অর্থের প্রাচুর্য্য মানুষকে অহংকারী করে তোলে এবং দেখা যায় অনেক
ধার্মিক মানুষও পদলোভে, মানসম্মানের ভয়ে, প্রাণের ভয়ে সেই অহংকারী- কদাচারী-
অত্যাচারী – মিথ্যাবাদী শাসককে মেনে নিতে বাধ্য হন। জয় বেদভগবান শ্রীকৃষ্ণের জয়।]

No comments:
Post a Comment