বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ
অভিযান(৮৬)তারিখঃ- ২৩/ ১০/ ২০১৭
আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ-[ বেদ যজ্ঞ করেই যোগ দর্শনের আলোতে তোমারা আলোকিত হও ও বিশ্ববাসীকে আলোকিত করে একত্রিত করো।]
যোগ বলেই জীব শিব হয়। বেদ যজ্ঞ বলেই জীব
শিবের জ্ঞান লাভ করে। মানুষের শিবশক্তি আছে কিন্তু সে সেই শক্তি হারিয়ে ফেলেছে
প্রকৃতির মধ্যে। অসংখ্য চিত্তের বৃত্তি তার শিবশক্তিকে ঢেকে রেখেছে কিছুতেই সেই
শক্তি নিয়ে তাকে জেগে উঠতে দিচ্ছে না। পতঞ্জলি ঋষি মানুষকে প্রকৃতির মোহ থেকে
জাগিয়ে তোলার জন্য ও চিত্তের বৃত্তিকে নিরোধ করার জন্যে যোগের পথ প্রদর্শন করলেন।
যোগের আটটি অঙ্গ--- যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি।
সমাধিস্থ অবস্থায় পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদ জ্ঞান উজ্জ্বল হয়। পতঞ্জলি ঋষির মতে এই
ভেদ-জ্ঞানের পারিভাষিক নাম ‘বিবেক খ্যাতি’। বিবেক জাগ্রত হলে সত্যদর্শন হয়ে থাকে সমাধিস্থ অবস্থায়। অষ্টাঙ্গ
যোগের পথটি খুব কঠিন পথ হলেও মানুষের জন্য কল্যাণময়- বিশেষ করে রোগমুক্ত হয়ে জীবন
যাপন করার জন্যে এই প্রকৃতির বুকে। এই পৃথিবীর বুকে ৯৯ ভাগ মানুষ যোগের বিষয়টি
জানেন না এবং এর উপকারিতা বিষয়েও জানেন না। তাই এই সব মানুষ মানসিক রোগ বা মনোরোগে
ভুগছেন। পতঞ্জলি ঋষি অষ্টাঙ্গ যোগ ছাড়াও সহজ যোগের পথ সকলের জন্য দেখিয়ে গেছেন। এই
সহজতর উপায় হচ্ছে ঈশ্বরপ্রণিধান। ঈশ্বরকে গুরু বা আদি গুরু জেনে – তাঁর সাথে সংযোগ
সুত্র স্থাপন করলেই যোগের ফল লাভ করা যায়। তিনি সর্বজ্ঞ, এই জ্ঞানটিকে অন্তরে
নিরতিশয় ধরে রেখে- এই গুরুতে চিত্ত নিবিষ্ট
হলেই স্বরূপে স্থিত হয় মানুষের আত্মা। এই আত্মা ও পরমাত্মার মিলনে তখন প্রকৃতিও এক
হয়ে যায়। একমাত্র এই যোগ প্রক্রিয়া বলেই মানুষ নিজের শ্বাস- প্রশ্বাসকে ঈশ্বরের
শ্বাস- প্রশ্বাসের সাথে যুক্ত করে তাঁর সাথে সেতু বন্ধন করে এক হয়ে থাকতে পারেন ও
তাঁর লীলাসঙ্গী হয়ে আনন্দলোকে অবস্থান করার আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। মানুষ নিজের অজানতে যোগ প্রক্রিয়ায় সদায় অংশ গ্রহণ করেই এই প্রকৃতির বুকে
নিজের অস্তিত্বকে ধরে রাখে। দেহমধ্যে প্রাণবায়ু তার নাম মুখ্যপ্রাণ। এই
মুখ্যপ্রাণের সর্বদা উচ্চারিত ধ্বনিটি হচ্ছে ‘হংস’। এই ‘হংস’ মন্ত্রটি জপ করতে
করতেই সে সোহহং—আমিই সেই বা আমি জীবাত্মা, আমি সেই পরমাত্মা হতে অভিন্ন এই ভাবে
উপনীত হন এবং ঈশ্বরের সমস্ত ঐশ্বর্য ভোগ করার যোগ্যতা লাভ করেন, দেহে মুখ্যপ্রাণকে
ধরে রাখার জন্য। তাহলে দেহে ইঞ্জিন চলছে আপন গতিতে-- এখন সেই ইঞ্জিনের সাথে দেহের বগিগুলি
জুড়ে দিয়ে মানুষ এই যোগ বলে এই ব্রহ্মাণ্ডের যেখানে খুশী যেতে পারেন এই যানের চালক
হয়ে। যোগ করতে না শিখলে জীবনের গতি বাড়বে না এবং জীবনের অংকের হিসাব মিলবে না।
গীতায় ১৮টি অধ্যায় আছে সবটায় যোগ প্রক্রিয়া দ্বারা আলোকিত। অর্জুন যোগবলেই ভগবান
শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন। ভারতীয় মুনি- ঋষিরা কেবল সুস্থদেহে বেঁচে
থাকার জন্য যোগশিক্ষার ব্যবস্থা করতেন না – এই যোগের দ্বারাই মানুষকে অন্ধকার থেকে
আলোর দিকে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতেন। মানুষের মন ও অন্তরের রোগ সারাবার এক সুন্দর
ও শক্তিশালী প্রক্রিয়া হলো যোগ প্রক্রিয়া।
রোগ সারিয়ে এই যোগের দ্বারাই আমরা মনের ঐক্য ও মতের ঐক্যে একীভুত হতে সক্ষম
হবো এতে কোন দ্বিধা নেই। এই পৃথিবী সাতশো কোটি নরনারীর আবাসস্থল। এই যোগবলে সকলের
প্রাণ-মন যদি একাত্ম হয়, একমুখী হয়, সত্যমুখী হয়, একইভাবে ভাবিত হয়, তবে যোগ আমাদের সমাজসৃষ্টিতে সর্বোচ্চভুমিতে আরোহণ
করবে এতে কোন সন্দেহ নেই। ইহাই ভারতবাসীদের লক্ষ্য। মহান এক একত্বের ভূমিতে উন্নীত
হলে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এক কথায় জাগতিক শৃঙ্খলা রক্ষিত হবে সবদিকে।
বিশ্ব সংসার মধুময় ও শান্তির আগারে পরিণত হবে। বেদ বিশ্বমানবের পরম উদার এক মিলনক্ষেত্র,
আন্তর্জাতিক ঐক্য, সংহতি ও সাম্যের মহা বার্তাবাহী এতে কোন ভুল নেই—তা বিশ্বের
সমস্ত মহাপণ্ডিতরা জানেন। এই যোগ প্রক্রিয়া বা যোগশিক্ষা ভারতবাসীর গৌরবের বিষয় –
তার থেকে বড় গৌরব হলো সনাতন ধর্মের ও বেদের মানমর্যাদার বিষয়। জয় বেদ যজ্ঞের জয়।


No comments:
Post a Comment