[ গীতা
মানবজীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার পথপ্রদর্শক। যারা মনে করেন গীতা মানুষের মধ্যে
শ্রেণিবিভাগ তৈরী করতে চেয়েছেন তাঁরা গীতার মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চিন্তাভাবনা
করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে উপলক্ষ্য করে মানব জাতিকে বলেছেন—যিনি
অনন্যচিত্ত হয়ে আমাকে প্রত্যহ সর্ব্বদা স্মরণ করেন, সেই নিত্যযোগীর পক্ষে আমি
অনায়াসলভ্য। মানুষের সমগ্র জীবনটাই একটি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি। বিদ্যালয়ের ভাল
ছাত্র যেমন সমস্ত বৎসর ধরেই পরীক্ষার জন্য ভাবে ও প্রস্তুত হয়, সজ্জনেরাও সেইরূপ
সারা জীবন ধরে মরণের জন্য তৈরী হন। জীবন- যাত্রাপথে মরণ-ভাবনা একটি শ্রেষ্ঠ পাথেয়।
যারা ভাবেন মৃত্যুকালে একটু ঈশ্বর- চিন্তায় ডুবে থাকতে পারলেই তো সহজে সিদ্ধিলাভ
হতে পারে। সারা জীবন ধরে যথেচ্ছ আচরণ করে শেষকালে ঈশ্বরের ভাবনা করলেই ঈশ্বরলাভ
হবে--- এই ভাবনা একেবারেই ভুল। এই সব লোকের কথার উত্তর গীতা দিয়েছেন—সারা জীবন যে-
সে ভাবে থাকলে মৃত্যুকালে তার ঈশ্বর- চিন্তা আসবেই না। তাই মৃত্যুকালে যাতে স্মরণে
থাকে সেজন্য সদাকাল ঈশ্বর- স্মরণে মানুষকে থাকার উপদেশ দিয়েছেন—শুভ ইচ্ছাশক্তি—শুভ
কর্ম্মশক্তি ও শুভজ্ঞানশক্তির মাধ্যমে। আজকে অক্ষরব্রহ্মযোগঃ অধ্যায়ের ১১ থেকে ২১
পর্যন্ত মন্ত্র সকলের উচ্চারণের জন্য প্রদত্ত হলো।]
১১) বেদবিদগণ
যে অবিনাশী বস্তুর বর্ণনা করে থাকেন, সংসারবিরাগী সন্ন্যাসীগণ যাতে প্রবিষ্ট হন,
যাকে পাওয়ার জন্য সাধকগণ ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করেন, সেই পরম বস্তু সম্পর্কে
তোমাকে সংক্ষেপে বলছি।
১২—১৩) সকল ইন্দ্রিয়দ্বার সংযত করে, মনকে হৃদয়ে নিরুদ্ধ করে, আপনার
প্রাণবায়ু মস্তকে স্থাপন করে, সমাধিযোগে স্থিত ব্যক্তি যদি ‘ ওম’ এই একাক্ষর
মন্ত্র জপ করতে করতে এবং আমাকে স্মরণ করতে করতে দেহত্যাগ করেন তবে তিনি পরমাগতি
লাভ করেন।
১৪) হে পার্থ, যিনি অনন্যচিত্ত হয়ে আমাকে প্রত্যহ সর্ব্বদা স্মরণ করেন, সেই
নিত্যযুক্ত যোগীর পক্ষে আমি অনায়াসলভ্য।
১৫) পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত মহাত্মগণ আমাকে পাওয়ার পর এই দুঃখপূর্ণ অনিত্য জন্ম
আর লাভ করেন না।
১৬) হে অর্জ্জুন, ব্রহ্মলোক থেকে আরম্ভ করে অন্যান্য সকল লোকের অধিবাসী
ব্যক্তিগণ এ সংসারে পুনরায় ফিরে আসে। কিন্তু হে কুন্তীনন্দন, আমাকে পেলে আর
পুনর্জন্ম হয় না।
১৭) এক হাজার যুগ যে ব্রহ্মার একদিন এবং এক হাজার যুগ তাঁর এক রাত্রি, এ
যারা জানেন, তাঁরাই দিন রাত্রির প্রকৃত তত্ত্ব জানেন।
১৮) ব্রহ্মার দিন আরম্ভ হলে অপ্রকাশিত অবস্থা হতে সমস্ত জীবজগৎ উৎপন্ন হয়।
তাঁর রাত্রি আরম্ভ হলে পুনরায় সেই অব্যক্ত অবস্থায় চলে যায়।
১৯) হে অর্জ্জুন, সেই প্রাণীগণ বারবার জন্মলাভ করে ব্রহ্মার রাত্রি এলে
বিলীন হয়ে যায়। আবার তাঁর দিন এলে তারা নিজ নিজ কর্ম্ম বশে জন্মে।
২০) পূর্ব্বে যে অব্যক্তের কথা বলা হয়েছ, তা থেকে পৃথক এক অব্যক্ত নিত্য
বস্তু আছেন। সমস্ত কিছুর বিনাশ হলেও তাঁর বিনাশ নাই।
২১) সেই অব্যক্ত অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের অতীত বস্তুই অক্ষর নামে অভিহিত। তাঁকেই
পরমগতি বলা হয়। যাকে পেলে পুনর্জন্ম হয় না, তাই আমার প্রকৃষ্ট স্বরূপ।
[ জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞের জয়। জয় ভারতমাতা ও বিশ্বমাতার জয়। জয়
শ্রীভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীশ্রীগীতামাতার জয়।]

No comments:
Post a Comment