বেদযজ্ঞ সম্মেলনঃ—১৮/ ০৫/ ২০১৭ স্থানঃ—পাটিয়া*
ভুবনেশ্বর* উড়িষ্যা*
আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ—[ বেদযজ্ঞ করে ধর্মরাজ
যুধিষ্ঠিরের ন্যায় শরণাগত বৎসলতা ও প্রেমকে সদায় একনিষ্ঠভাবে অন্তরে ধরে রাখবে।]
আজ সাতদিন থেকে বেদযজ্ঞের আসরে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জীবন- কর্ম ও চরিত্র
নিয়ে আলোচনা চলছে। সারা বছর ধরে আলোচনা করেও তাঁর মহৎ চরিত্রের পূর্ণরূপ তুলে ধরা
সম্ভব নয় এই ক্ষুদ্র অজ্ঞ নরের পক্ষে। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের শরণাগত বৎসলতা ও প্রেম
আরও বিশিস্ত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরমধামে গমন এবং যাদব সংহারের কথা শুনে তিনি
অত্যন্ত দুঃখিত হন। তিনি ভাবলেন –‘ যে শ্রীকৃষ্ণের পরম কৃপায় আমরা সবকিছু পেয়েছি,
আমাদের সেই পরম আত্মীয় যখন এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন, তখন এই রাজ্যসুখ আর জীবনের কী
প্রয়োজন?’ শ্রীকৃষ্ণের কথা তো আলাদা, তিনি পাণ্ডবদের জীবন- প্রাণ ও সর্বস্ব ছিলেন।
তাঁর ওপরই তো সবকিছু নির্ভরশীল ছিল। কৌরবদের বিনাশে কিন্তু যুধিষ্ঠির এত দুঃখিত
হয়েছিলেন যে রাজ্যপ্রাপ্তির উপরান্তে বিজয়োৎসবকালে তিনি ব্যথিত চিত্তে সবকিছু ছেড়ে
বনে চলে যাবার উপক্রম করেছিলেন। বহু কষ্টে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং মহর্ষি ব্যাস আদি
তাঁকে রাজ্যাভিষেকের জন্য রাজী করান। ভীষ্ম পিতামহও ধর্মোপদেশ দিয়ে তাঁর শোক দূর
করার চেষ্টা করেন। ভীষ্মের আদেশানুসারেই তিনি রাজা হন কিন্তু স্বজনবধের গ্লানি
তাঁর চিত্ত থেকে কখনোই দূর হয়নি।
শ্রীকৃষ্ণের পরমধাম গমনের সংবাদ
পেয়ে তিনি বনে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিৎ কে
রাজার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে, কৃপাচার্য এবং ধৃতরাষ্ট্র –পুত্র যুযুৎসুকে তাঁর
রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে তিনি দ্রৌপদী ও চার ভ্রাতাসহ রওনা হন। পৃথিবী
পরিভ্রমণের উদ্দেশ্যে বহু দেশ ঘুরে তাঁরা হিমালয় পেরিয়ে মেরু পর্বতের দিকে এগোলেন।
পথে দেবী দ্রৌপদী ও চার ভ্রাতা এক এক করে নিস্তেজ হয়ে ক্রমশঃ পড়ে যেতে লাগলেন।
তাঁদের দিকে দৃষ্টিপাত না করে যুধিষ্ঠির এগিয়ে চললেন। পথিমধ্যে দেবরাজ ইন্দ্র
স্বয়ং তাঁর রথ নিয়ে যুধিষ্ঠিরকে নিতে এলেন। যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইদের এবং পতিপ্রাণা
দ্রৌপদীকে ছাড়া রথে উঠতে সম্মত হলেন না। ইন্দ্র যখন তাঁকে জানালেন যে, ‘তাঁরা সকলে
তোমার আগেই স্বর্গে পৌঁছে গেছেন’। তখন তিনি রথে চড়তে রাজী হলেন। কিন্তু
যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে একটি কুকুরও শুরু থেকেই তাঁদের অনুসরণ করছিল। যুধিষ্ঠির তাকে
ছেড়ে রথে উঠতে রাজী হলেন না। ইন্দ্র আপত্তি করায় তিনি জানিয়ে দিলেন প্রভুভক্ত এই
জীবটিকে ছেড়ে তিনি স্বর্গেও যেতে রাজী নন। সেই কুকুরটি আর কেউ নয়, স্বয়ং ধর্মই
যুধিষ্ঠিরকে পরীক্ষা করার জন্য অনুসরণ করছিলেন।
যুধিষ্ঠিরের এই অনুপম শরণাগত বৎসলতা দেখে তিনি তাঁর নিজরূপ প্রকট করেন এবং
যুধিষ্ঠিরকে রথে নিয়ে ইন্দ্র ও অন্য দেবতা ও মহর্ষিগণ তাঁকে উর্ধ্বলোকে নিয়ে
গেলেন। সেই সময় দেবর্ষি নারদ তাঁর প্রশংসা করে বলেন—‘ যুধিষ্ঠিরের আগে কোনো মানুষ
এই পার্থিব দেহে স্বর্গে গমন করেছেন, এমন কথা শুনিনি’। যুধিষ্ঠির দেবরাজ ইন্দ্রকে
বলেন, ‘ যেখানে আমার ভ্রাতা- বন্ধু ও দ্রোপদী আছেন, আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন,
সেইখানে গেলেই আমি শান্তি পাব, অন্যত্র নয়। যেখানে আমার ভাই নেই, সেই স্বর্গে আমার
প্রয়োজন নেই’। ধন্য তার ভ্রাতৃপ্রেম।
যুধিষ্ঠিরের প্রবল ইচ্ছা জেনে দেবতারা তাঁকে
দেবদূতের সঙ্গে ভাইদের দর্শন করাবার জন্য পাঠালেন। দেবরাজ ইন্দ্রের মায়ায় তাঁকে
যখন প্রথমেই নরক দর্শন করতে হয় এবং সেখানে যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের বিলাপ ও
কান্নার আওয়াজ শোনেন আর সেই সঙ্গে সেখানকার লোকদের বলতে শোনেন যে –“ মহারাজ; একটু
দাঁড়িয়ে যান, আপনি থাকায় এই নরকের কষ্ট আমাদের তত কষ্ট দিচ্ছে না”, তখন তিনি
সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে -দেবদূতকে বললেন—‘ আমি এখানে থাকলে যদি এখানের জীবেরা এতটুকুও
সুখ পায়, তাহলে এই নরক আমার কাছে স্বর্গের থেকেও বড়। আমি এখানেই থাকব’। ধন্য তাঁর
এই দয়ালুভাব। ।। ৭ম পর্ব ।। জয় বেদযজ্ঞের জয়।


No comments:
Post a Comment