বেদযজ্ঞ সম্মেলনঃ—১৫/
০৫/ ২০১৭ স্থানঃ—পাটিয়া* ভুবনেশ্বর* উড়িষ্যা*
আজকের আলোচ্য বিষয়ঃ—[ বেদযজ্ঞের আসরে সদায়
যুধিষ্ঠিরের ন্যায় ধর্মরাজ হয়ে দয়াশীল ও ক্ষমাশীল অবস্থায় নিজের মন- বুদ্ধি-
অহংকারকে ধরে রাখবে।]
এক সময়ের কথা,
পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীকে একাকী আশ্রমে রেখে বনে গিয়েছিলেন। দুর্যোধনের ভগ্নীপতি
সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ সেদিকে আসেন। দ্রৌপদীর অনুপম রূপলাবণ্য দেখে তাঁর মনে কু-বাসনা
জাগে, তিনি দ্রৌপদীর কাছে তাঁর কু- প্রস্তাব রাখেন, দ্রৌপদী তাঁকে অসম্মান করে
ফিরিয়ে দেন। তখন জয়দ্রথ বলপূর্বক দ্রৌপদীকে রথে তুলে পালিয়ে যান। পাণ্ডবগণ জানতে
পেরে তাঁর পশ্চাৎ ধাবন করে তাঁকে ধরে ফেলেন। পাণ্ডবগণ তাঁর সমস্ত সৈন্য তছনছ করে
দেন, পাপী জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে রথ থেকে নামিয়ে প্রাণ নিয়ে পলায়ন করেন। ভীমসেন তাঁর
অনুসরণ করে তাঁকে ধরে ফেলেন এবং ধর্মরাজের সামনে এনে হাজির করেন। ধর্মরাজ তাঁকে
কুটুম্ব বলে দয়া করে মুক্তি দেন। এইভাবে যুধিষ্ঠির তাঁর দয়াশীলতার ও ক্ষমাশীলতার
পরিচয় দেন।
মহারাজ যুধিষ্ঠির অত্যন্ত
বুদ্ধিমান, নীতিজ্ঞ এবং ধর্মজ্ঞ তো ছিলেনই তাঁর মধ্যে সমত্ববোধও ছিল অত্যন্ত
অদ্ভুত। কোনো এক সময়ে পাণ্ডবেরা যে বনে থাকতেন, সেখানে এক ব্রাহ্মণ অরণিসহ মন্থন-
কাষ্ঠ এক বৃক্ষের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলেন। এর মধ্যে একটি হরিণ শিং চুলকানোর সময় তার
শিং- এ সেই মন্থন- কাঠ আটকে যায়। হরিণটি মন্থন- কাঠটি নিয়ে পালিয়ে যায়। মন্থন- কাঠ
না থাকায় অগ্নিহোত্রে বাধা উপস্থিত হওয়ায় সেই ব্রাহ্মণ পাণ্ডবদের কাছে গিয়ে সেই
মন্থন- কাঠটি এনে দেবার প্রার্থনা জানান। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তাঁর চার ভাইদের নিয়ে
মৃগের পিছনে ধাবিত হলেন, কিন্তু সে চক্ষুর নিমেষে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। পাণ্ডবগণ
অত্যন্ত ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন। ধর্মরাজের আদেশে নকুল জলের উদ্দেশ্যে রওনা
হলেন। কিছুদূরে তিনি একটি সুন্দর জলাশয় দেখতে পেলেন। কাছে গিয়ে তিনি সেই জলপান
করতে গেলেন, তখন তিনি এক আকাশবাণী শুনতে পেলেন—‘ আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও,
তারপর জল পান করবে’। কিন্তু নকুল অত্যন্ত পিপাসার্ত ছিলেন, তিনি আকাশবাণীকে
গ্রাহ্য করলেন না। তাই জলপান করতেই তিনি নির্জীব হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর
ধর্মরাজ ক্রমশঃ সহদেব, অর্জুন ও ভীমসেনকে পাঠালেন, তাঁদেরও একই অবস্থা হল। শেষকালে
ধর্মরাজ স্বয়ং সেই জলাশয়ে গেলেন। তিনিও সেই আকাশবাণী শুনলেন এবং চার ভাইকে
অচেতনভাবে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলেন। এর মধ্যে সেইখানে এক বিরাটাকার যক্ষ দেখা
দিলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে জানালেন—‘ আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জল পানের জন্যই
তোমার ভাইদের এই অবস্থা হয়েছে। তুমিও যদি এরূপ অনধিকার চেষ্টা করো, তাহলে তুমিও
মারা যাবে’। যুধিষ্ঠির তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তত হলেন। যক্ষ যেসব প্রশ্ন
করেন যুধিষ্ঠির সেই সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেন। তাঁর উত্তরে প্রসন্ন হয়ে যক্ষ
যুধিষ্ঠিরকে বললেন—‘ রাজন; তোমার ভাইদের মধ্যে যে কোনো একজনকে বাঁচাতে চাইলে তার
নাম বলো, আমি তাকে বাঁচিয়ে দেব’। ধর্মরাজ নকুলকে জীবিত দেখতে চাইলেন। যক্ষ কারণ
জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন—‘ আমার পিতার দুজন পত্নী ছিলেন—কুন্তী ও মাদ্রী। আমার
কাছে দুজনই সমান। কুন্তীর এক পুত্র হিসাবে আমি জীবিত আছি, মাদ্রীর পুত্র হিসাবে
নকুল জীবিত হৌক—দুই মাতার দুই পুত্র বেঁচে থাক, তাই আমি ভীম ও অর্জুনের পরিবর্তে
নকুলের প্রাণভিক্ষা করছি’। যুধিষ্ঠিরের বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মজ্ঞতার পরীক্ষা নেওয়ার
জন্য স্বয়ং ধর্মরাজই এই লীলা করেছিলেন। যুধিষ্ঠিরের এই সমত্ব--বোধে তিনি অত্যন্ত
প্রসন্ন হলেন এবং নিজের পরিচয় জানিয়ে যুধিষ্ঠিরের চার ভ্রাতারই জীবনদান করলেন।
ধর্মরাজ আরও জানালেন যে—‘ আমিই মৃগরূপে ব্রাহ্মণের মন্থন- কাষ্ঠ নিয়ে এসছি, এই নাও
সেই মন্থন- কাষ্ঠ’। যুধিষ্ঠির সেই মন্থন- কাষ্ঠ এনে ব্রাহ্মণকে ফিরিয়ে দেন।
যুধিষ্ঠির যেমন সদাচারসম্পন্ন
ছিলেন, তেমনিই বিনয়ী ছিলেন। তিনি সময়োচিত ব্যবহারে কুশল ছিলেন, গুরুজনদের মান-
মর্যাদা সর্বদা খেয়াল রাখতেন। অতি কঠিন সময়েও তিনি শিষ্টাচারের মর্যাদা ভুলতেন না।
মহাভারতের যুদ্ধের প্রারম্ভে যখন দু’পক্ষের যোদ্ধাগণ সন্নিবিষ্ট হয়েছিল, তখন সেই
রণক্ষেত্রে যুধিষ্ঠির সর্বপ্রথম সৈন্য মধ্যে উপস্থিত পিতামহ ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ ও
কৃপাচার্য এবং মাতুল শল্যকে প্রণাম করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। তাঁর এই বিনয়পুর্ন
ব্যবহার এবং শিষ্টাচারে তাঁর গুরুজন অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে অন্তর থেকে তাঁর বিজয়
কামনা করেন। এই চারজন অত্যাচারী কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ
করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের এই আদর্শ ব্যবহার অনুমোদন করেন। ।। ৪র্থ পর্ব।।
জয় বেদযজ্ঞের জয়।


No comments:
Post a Comment