বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ
অভিযান(২৭০) তারিখঃ—০২/০৫/ ২০১৮ আজকের
আলোচ্য বিষয়ঃ-- [ বেদযজ্ঞ করে বিশ্বমানব শিক্ষার মঞ্চে আমাদেরকেই আদর্শ ছেলে মেয়ে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় জ্ঞান, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকজ্ঞান ও আত্মিকজ্ঞানের
দ্বারা।]
আমরা বাইরের জগতের শিক্ষা লাভ করে ডিগ্রি পাই এবং নিজেদের সুশিক্ষিত নাগরিক
বলে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে জাহির করি। আমরা কেউ অন্তর জগতের ডিগ্রির মূল্য দিতে চাই
না। বিশ্বমানব শিক্ষা হচ্ছে অন্তর্জগতের ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। আমরা জানি বর্তমানে শিক্ষা পঞ্চ র-কারে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। আমরা ছেলে মেয়েদের
শিক্ষালয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে পাঠাই কেন? কারণ আমাদের ছেলে মেয়েরা ভাল চাকুরী
পাবে, তারপরে ভাল বাড়ী করবে, তারপরে একটা গাড়ী কিনবে, তারপরে সুন্দরী নারীকে বিয়ে
করবে এবং বিয়ের পরেই ভিন্ন ভাতে হাড়ি করে বাপ মাকে ছেড়ে সুখে স্বামী-স্ত্রীর সংসার
গড়বে। এই কথাগুলি আমার বলা উচিত নয় তাসত্ত্বেও বলতে বাধ্য হলাম এই সমাজের
রুচিজ্ঞান দেখে। এখন আমি আমার বিষয় নিয়ে আলোচনায় আসছি, কিভাবে আদর্শ ছেলে মেয়ে গড়ে
তোলা যায়। আমরা আদর্শ ছেলে মেয়ে তাদেরকেই বলি যারা নিয়ম- শৃঙ্খলা মেনে চলে নিজেকে
সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আমরা নিশ্চয় একজন ছেলে বা মেয়েকে আদর্শ ছেলে বা
মেয়ে বলতে পারবো না—যে নিজের
ক্ষুদ্র স্বার্থে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে কেবল অর্থের ইমারত গড়ে তোলে। সরকারের
টাকা মানে জনগণের টাকা খরচ করে ডাক্তারি পাশ করে যারা নার্সিং হোম খুলে বা চেম্বার
খুলে, কেবল অর্থ উপার্জনকে জীবনের মূলধন করে নিয়েছেন তারা কখনো আদর্শ ডাক্তার বা
মানুষ নন। যে সমস্ত শিক্ষক কেবল চাকুরী করার উদ্দেশ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ দান
করেন, তারা কখনও আদর্শ শিক্ষক হতে পারেন না। তাই বর্তমানে দেশ সেবা- সমাজ সেবা
একটি ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে। তাই আদর্শ ছেলে মেয়ে বা মানুষ খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর
হয়ে পড়েছে। পরার্থে জীবন উৎসর্গ করার জন্য শিক্ষা আজ কাগজ কলমে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
আদর্শ ছেলে মেয়ে হও- প্রকৃত মানুষ হও – এসব কথা আজ বস্তাপচা কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ
আমরা আদর্শ ছেলে মেয়ে তাদের-ই বলি, যারা পরীক্ষায় ভাল ফল করে—ভবিষ্যতে ভাল চাকুরী
পাবার আশায়। চাকুরী পেয়ে যারা গুছিয়ে সংসার করতে পারে এবং বাড়ী-গাড়ি করতে পারে
তাদেরকেই আমরা আদর্শ ছেলে মেয়ে বলি—তারা বৃদ্ধ মা-বাবাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিলেও। আমরা আদর্শ পুলিশ অফিসার তাঁদের বলি যারা লাখ লাখ টাকা ঘুষ
খেয়ে দেশকে রসাতলে পাঠাতে পারে। আমরা আদর্শ শিক্ষক তাদেরকেই বলি যাদের হৃদয়ে জাতির
প্রতি কোন প্রেম নেই—প্রেম আছে নিজের স্ত্রী- পুত্র-কন্যার প্রতি। তাঁরা বলেন—
পরের ছেলে পরমানন্দ যত নিচে নামে ততই আনন্দ।
নিজের ছেলে দেবানন্দ সেই তো হবে আমার
জীবনানন্দ।।
তাই পিতা-মাতা আদর্শ মানুষ না হলে ছেলে- মেয়েকে আদর্শ মানুষ রূপে গড়ে তোলা যায় না। একশো জন শিক্ষক যে শিক্ষা দিতে না
পারেন, একজন মা তার সন্তানকে সেই শিক্ষা দিতে পারেন। তাই পিতা-মাতাকে আগে আদর্শ
মানুষ হয়ে নিজেদের রক্ত সংশোধন করে, তবেই সন্তানের জন্ম দেওয়া উচিত। নচেৎ রক্ত
বীজের সন্তানে পৃথিবী ভরে যাবে ও মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ মাতৃ গর্ভ থেকেই
সন্তানের শিক্ষা শুরু হয়ে যায়। তখন থেকেই সন্তান মা-বাবার আচরণ নকল করতে শুরু করে।
তাই আদর্শ সন্তান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভূমিকা সবথেকে বেশী। তারপরে
শিক্ষাগুরু, সমাজ, সরকার সকলের কিছু কিছু ভূমিকা আছে। এগুলি গেলো গৌণ দিক। মুখ্য
দিক হচ্ছে যে আদর্শ মানুষ হয়ে উঠতে চায় তার দিক। কেউ যদি মনে করে আমি নিজেকে
আদর্শ সৎ মানুষ রূপে গড়ে তুলবো – তবে তার কাছে কোন বাধায় বাধা হয়ে উঠতে পারে না।
সে একদিন সব বাধা অতিক্রম করে আদর্শ মানুষ হয়ে উঠবেই।
পরিশেষে আমি কুসুম কুমারী দাসের ‘আদর্শ ছেলে’
কবিতাটি আবৃতি করে শুনাচ্ছি---
আমাদের দেশে হবে সেই
ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে
বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল,
তেজে ভরা মন
মানুষ হইতে হবে এই যার
পণ।
বিপদ আসিলে কাছে হও
আগুয়ান
নাই কি শরীরে তব রক্ত,
মাংস প্রাণ?
হাত পা সবার-ই আছে,
মিছে কেন ভয়?
চেতনা রয়েছে যার, সে
কি পড়ে রয়?
সে ছেলে কে চায়
বল,কথায় কথায়
আসে যার চোখে জল, মাথা
ঘুরে যায়?
সদা প্রাণে হাসি মুখে
কর এই পণ-
মানুষ হইতে হবে মানুষ
যখন।
কৃষকের শিশু কিংবা
রাজার কুমার
সবারি রয়েছে কাজ, এ
বিশ্ব মাঝার-
মনে প্রাণে খাট সবে,
শক্তি কর দান
তোমরা ‘মানুষ’ হলে
দেশের কল্যাণ। জয় বিশ্বমানব
শিক্ষা ও বেদযজ্ঞের জয় ।

No comments:
Post a Comment