বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞ
অভিযান(২৬৭) তারিখঃ—২৯/ ০৪/ ২০১৮ আজকের
আলোচ্য বিষয়ঃ-- [ বেদযজ্ঞের
মাধ্যমে গৌতম বুদ্ধের সহজ সরল শিক্ষার দ্বারা সারা বিশ্বে সত্য-শান্তি-ঐক্য ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা করার পথে এগিয়ে চলো।]
আজকে বুদ্ধ
পূর্ণিমা, গৌতম বুদ্ধের জন্ম তিথি। তিনি সনাতন তথা হিন্দু ধর্মের ক্ষত্রিয় রাজবংশে
জন্ম গ্রহণ করেন। তাই বুদ্ধ পূর্ণিমা প্রত্যেক হিন্দুর কাছে রামনবমী, জন্মাষ্টমীর
ন্যায় এক পবিত্র তিথি। আজকে আমি বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞের আসরে গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করবো।
যে শিক্ষা বিশ্বমানবকে একদিন সৎ ও সত্যের পথ দেখাতে সক্ষম হয়েছিল। এই সনাতন শিক্ষার
আলোতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ আলোকিত হয়েছিলেই এবং এই শিক্ষা গ্রহন করার জন্য ফাইহিন-হিউয়েন সাং- ইবনবতুতা সহ কত মহান বিভিন্ন
দেশ থেকে এই ভারতে ছুটে এসেছিলেন। তিনি রাজপুত্র হয়েও মানুষের দুঃখ দেখে রাজপ্রাসাদে স্থির হয়ে
থাকতে পারেন নি। মাত্র ২৯ বছর বয়সে রাজপ্রাসাদ থেকে যুবতী স্ত্রী ও শিশু পুত্রকে
ত্যাগ করে বেড়িয়ে পড়েছিলেন অমৃতের সন্ধানে। কেন তিনি রাজপ্রাসাদের মায়া ত্যাগ করে
বহু কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছিলেন? এর পিছনে তাঁর একটাই কারণ ছিল প্রকৃত সত্যকে
জানা। তিনি সত্যকে জেনেছিলেন বহু সাধনার মাধ্যমে বহু তপস্যার দ্বারা। ৩৫ বছর বয়সে
তিনি সত্যকে জেনে দিব্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন। কি সত্য তিনি জেনেছিলেন? তিনি
জেনেছিলেন মানুষের ধর্ম হল, সত্যকে জেনে, তাকে দুঃখকে জয় করতে হবে। সত্যকে না জানলে মানুষ কোনদিন
দুঃখের জগত থেকে মুক্তি পেতে পারেনা। তিনি চারটি সত্যকে মানুষের কাছে তুলে
ধরেছিলেন—১) জগত দুঃখময় ২) কামনা, বাসনা ও আসক্তিই হল দুঃখের কারণ ৩) দুঃখের
কারণগুলি ধ্বংস করে দুঃখের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় ৪) এই কারণগুলির ধ্বংসেরও উপায় আছে। এই চারটি সত্যকে ‘আর্যসত্য’ বলা হয়।
মানুষের আসক্তি বিনাশের জন্য তিনি আটটি পথের
কথা বলেছেন। এই আটটি পথ অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামে পরিচিত। এগুলি হল-১) সৎ বাক্য ২) সৎ
কর্ম ৩) সৎ জীবন ৪) সৎ চেষ্টা ৫) সৎ চিন্তা ৬) সৎ সংকল্প ৭) সৎ দৃষ্টি ও ৮) সৎ
সমাধি। এই আটটি পথের অনুশীলন করলে যে কোন মানুষের অন্তরে প্রজ্ঞা বা পরমজ্ঞানের
সঞ্চার হবে। জ্ঞানের সঞ্চার হলেই কামনা বাসনা শোক দুঃখ কষ্টের ঊর্ধ্বে উঠে এক অনাবিল আনন্দময় জগতে সেই ব্যাক্তি অবস্থান
করবে। সেই জগতে পৌঁছে সে অপার শান্তি ও অনন্ত সুখের আশ্রয় পাবে। এই পথ তিনি সকল
মানব জাতির জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এই সহজ সরল মধ্যপন্থা অবলম্বন করার জন্য
কৃচ্ছ্রসাধনা ও তপশ্চর্যার কোন প্রয়োজন নেই। জাতিভেদের কঠোরতা স্বর্গ নরক ঈশ্বর এসবের প্রতি তিনি কাউকে
কোন উপদেশ দিতেন না। তিনি সত্যকে জেনেছিলেন, তিনি সৎ- কে জেনেছিলেন, তিনি আনন্দময় সত্তাকে জেনেছিলেন, তিনি
সুন্দরকে জেনেছিলেন। মানুষের এই চারটি রূপ মানব হৃদয়ে অবস্থান করছে এক জ্যোতির্ময়
প্রজ্ঞারূপে, তাকে জানলেই সব জানা হয়ে যায়, এই সত্যের উপর ভিত্তি করে তিনি মানুষের
জন্য সহজ আটটি পথ আবিষ্কার করে দিলেন। এই আটটি যানে চেপে মানুষ পথ চললে আর দেশে
কোন অশান্তি আসতে পারেনা। এমন সহজ সরল উদার পথ তো বিশ্বমানব এর পথ। প্রেম, শান্তি,
করুণার প্রচার করে তিনি মানুষের সামাজিক জীবনে পরিবর্তন আনেন। ধনী-দরিদ্র,
উচ্চ-নীচ, নারীপুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যে তিনি জ্ঞানের জগতের দুয়ার খুলে দেন।
জানিনা পরবর্তীতে কেন বিশ্বমানব শিক্ষা বৌদ্ধ ধর্ম নামে মানুষের কাছে গণ্ডীতে
আবদ্ধ হয়ে পড়লো। তিনি ৮০ বছর বয়সে দেহত্যাগ করে চলে যান অমরধামে, তখন পর্যন্ত এই
শিক্ষা ধর্মের গণ্ডীতে বাধা পড়েনি। তিনি কোন বৌদ্ধ মঠ গড়ার উপদেশও দিয়ে যান নি।
ধর্মের বেড়া জালে আবদ্ধ করে তা দেশ বিদেশে ছড়িয়ে দিতে বলেননি। মানুষের সহজাত
প্রবৃত্তির দিকে তিনি লক্ষ্য করে প্রবৃত্তির বৃত্তিগুলিকে উন্নতমানের করার পথ প্রদর্শন
করেছিলেন মাত্র। যে আটটি পথের কথা বলা হয়েছে, মানুষ যদি তার বিপরীত দিকে যায়, তবে
তো সে পথভ্রষ্ট হবে। পথভ্রষ্ট লোকের কপালে কোন দিন সুখ থাকতে পারেনা। তাই গৌতম
বুদ্ধকে কোন ধর্মের প্রবর্তক রূপে দেখলে তাঁকে ছোট করা হবে। তিনি ছিলেন বিশ্বমানব
দরদী একজন মানুষের ত্রাণকর্তা। সতাতন শ্বাশতবাণী তিনি লোকমঙ্গলের জন্য প্রকাশ করেন
আপন হৃদয় বেদ খুলে। তাই পরিশেষে বলি------ ‘বৌদ্ধং শরণং গচ্ছামি। ধর্মং শরণং
গচ্ছামি। সংঘং শরণং গচ্ছামি। এস আমরা আমাদের জ্ঞান বুদ্ধিকে স্মরণ করে তাকে সাথে
নিয়ে চলতে শিখি। এস আমরা আমাদের মানবিক ধর্মকে স্মরণ করে তাকে সাথে নিয়ে একসাথে
চলতে শিখি। এস আমরা সকলে সংঘ বদ্ধ হয়ে সৎ পথে চলতে শিখি। জয় বিশ্বমানব শিক্ষা ও বেদযজ্ঞের জয়।

No comments:
Post a Comment